ইসলামি ভাষ্য অনুযায়ি যে কয়টি অতি তাৎপর্যপূর্ণ ও পুণ্যময় রজনী রয়েছে তার মধ্যে পবিত্র শব-ই-মি’রাজের রজনী অন্যতম। ‘মি’রাজ’ আরবি শব্দ। এর অর্থ সিঁড়ি, ঊর্ধ্বগমন ইত্যাদি। মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.) মক্কা নগরী থেকে ফিলিস্তিনের মসজিদুল আকসা হয়ে প্রথম আসমান থেকে একে একে সপ্তম আসমান এবং সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত সশরীরে সজ্ঞানে জাগ্রত অবস্থায় হযরত জিবরাইল (আ.) ও হযরত মিকাইলের (আ.) সঙ্গে বিশেষ বাহন বুরাকের মাধ্যমে ভ্রমণ করানো এবং সেখান থেকে একাকী রফরফ বাহনে আরশে আজিম পর্যন্ত যাওয়া, মহান আল্লাহ্ তা’আলার সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ ও জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শন করে ফিরে আসার বিস্তারিত বিবরণ মি’রাজ নামে পরিচিত।

হিজরি নবম মাস তথা রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে এই মি’রাজ সংগঠিত হয়। কুরআন-হাদিসের দৃষ্টিতে রজব মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্রতম। এ মাসের অনেক ফজিলত রয়েছে। রজব অর্থ হলো সম্মানিত। হাদিস শরিফে রয়েছে, হযরত আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স.) বলেছেন, ১২ মাসে এক বছর; এর মধ্যে চারটি সম্মানিত। তিনটি ধারাবাহিক যথা- জিলকদ, জিলহজ্জ ও মুহাররম অপরটি রজব।
প্রিয়তম বন্ধু হযরত মুহাম্মদ (স.)কে চরম বিপদের মুহূর্তে শান্ত্বনা দেয়ার নিমিত্তে নবুয়তের সত্যতাকে সুনির্ধারিত করতে নবি (স.)কে মহান আল্লাহ্ পাক তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে ডেকে নেন। ইসলামের ইতিহাসে এ ঘটনাই মি’রাজ নামে প্রসিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনুল কারিমের সূরা বনি ইসরাঈলের প্রথম আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘পূত-পবিত্র ও মহিমময় তিনি (আল্লাহ্ তা’আলা) যিনি তাঁর বান্দাকে (মুহাম্মদ স.) রাত্রিকালে ভ্রমণ করিয়েছিলেন আল মসজিদুল হারাম থেকে আল মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারদিকে আমি (আল্লাহ্) করেছিলাম বরকতময়, তাঁকে (মুহাম্মদ স.) আমার কুদরতি নিদর্শন দেখাবার জন্য। নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ্) সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।’ এই রাতে মহান আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর প্রিয়নবিকে দেখিয়েছিলেন অনেক নিদর্শন। যার মধ্যে রয়েছে সাধারণ জ্ঞানের বাইরে ঐশ্বরিক অনেক ঘটনা ও ইতিহাস। এছাড়াও আল্লাহ্ তা’আলা পবিত্র কুরআনুল কারীমের সূরা আন নাজম এর ১৮ নং আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘তাঁর দৃষ্টিভ্রম হয়নি এবং তিনি সীমালঙ্ঘনও করেননি। নিশ্চয়ই তিনি তাঁর পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছেন।’

প্রখ্যাত সাহাবি হযরত ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি করিম (স.) ইরশাদ করেন, রজবের সাতাশ তারিখ রাতে হঠাৎ আমার কাছে জিবরাইল (আ.) একটি সাদা রঙের বুরাক নিয়ে উপস্থিত হলেন। (উল্লেখ্য যে, বুরাক হচ্ছে সাদা রঙের এক প্রকার বাহন, সে প্রতিটি কদম ফেলে দৃষ্টির শেষ সীমানায়) রাসূল (স.) বলেন, আমি এতে আরোহন করলাম, অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করলাম এবং সেখানে দু’রাকাত নামায আদায় করলাম। এরপর আমি মসজিদ থেকে বের হলাম। তখন জিবরাইল (আ.) একটি শরাব এবং একটি দুধের পাত্র নিয়ে আমার সামনে উপস্থিত হলেন। তখন আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। জিবরাইল (আ.) বললেন, আপনি ফিতরাতকেই গ্রহণ করেছেন। (মুসলিম শরীফ ১ম খণ্ড, পৃ.- ৯১)
পবিত্র কুরআনুল কারিমের পরিভাষা ‘ইসরা’ এবং হাদিসের পরিভাষা ‘উরজুন’ শব্দ দ্বারা মি’রাজের ঘটনার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আরবি ‘ইসরা’ মূলশব্দ থেকে ‘আসরা’ শব্দটি উৎসারিত। আভিধানিক অর্থে রাত্রে নিয়ে যাওয়া। সফরটি রাত্রের একাংশে সম্পাদিত হয়েছে বিধায় এ ঘটনাকে ইসরা বলা হয়। ‘উরজুন’ মূলশব্দ থেকে মি’রাজ শব্দ উদ্গত হয়েছে। যার শাব্দিক অর্থ সিঁড়ি। যেহেতু নবি করিম (স.) আল মসজিদুল আকসা থেকে বুরাকের মাধ্যমে আরোহন করে বায়তুল মামুর এবং সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন এবং সেখান থেকে রফরফ (সবুজ রঙের গদিবিশিষ্ট একটি পালকি বিশেষ) বাহনে সওয়ার হয়ে আল্লাহ্র সাথে সরাসরি সাক্ষাতে আরশে মুয়াল্লাকায় গিয়েছিলেন বিধায় উপরোক্ত সফরকে মি’রাজ বলা হয়।
নবি করিম (স.) এর নবুয়ত লাভের ১১তম বছরের রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে পবিত্র মি’রাজ সংগঠিত হয়। নবি (স.) এর সফর আত্মিক ছিল না; বরং সাধারণ মানুষের সফরের মতো স্বশরীরেই ছিল- এ কথা কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এ ভ্রমণে তিনি অবলোকন করেন সৃষ্টি জগতের সমস্ত কিছুর অপার রহস্য। মহানবি (স.) এর জীবনের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা মি’রাজ। মহানবি (স.) ছাড়া অন্য কোনো নবি এই পরম সৌভাগ্য লাভ করতে পারেননি; এ জন্যই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নবি।
ইবনে কাসির (রহ.) তাঁর তাফসীর গ্রন্থে মি’রাজ সম্পর্কে বলেন, সত্য কথা হলো, নবি (স.) মি’রাজ গমন করেন সশরীরে ও জাগ্রত অবস্থায়, স্বপ্নে নয়। একদিন রাত্রিবেলা রাসূল (স.) হযরত উম্মেহানি (রা.) এর ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন; রাসূল (স.) তখন তদ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় ছিলেন। এমন সময় বিস্ময়করভাবে ঘরের ছাদ ফেটে যায় এবং সে স্থান দিয়ে হযরত জিবরাইল (আ.) ঘরে প্রবেশ করেন। জিবরাইল (আ.) রাসূল (স.)কে জাগিয়ে হারাম শরিফে নিয়ে আসেন। রাসূল (স.) এখানে এসে হাতিমে কা’বায় ঘুমিয়ে পড়েন। হযরত জিবরাইল ও মিকাঈল (আ.) পুণরায় রাসূলকে জাগিয়ে দেন এবং যমযম কূপের পাশে তাকে নিয়ে আসেন। সেখানে রাসূলের(স.) বক্ষ বিদির্ণ করে পবিত্র যমযমের পানি দ্বারা তার বক্ষ মুবারক ধৌত করেন। যাত্রাপথে রাসূল (স.) ইয়াসরিব নগরীতে উপস্থিত হন। সেখানে অবতরণ করে দু’রাকাত নামায আদায় করেন। বুরাক চলতে থাকে দ্রুত গতিতে। একপর্যায়ে তুর পর্বতের সিনাই প্রান্তরে উপস্থিত হয়। এখানেও রাসূল (স.) অবতরণ করে দু’রাকাত নামায আদায় করেন। তারপর হযরত ঈসা (আ.) এর জন্মস্থান ফিলিস্তিনের বায়তু লাহাম উপস্থিত হন। এভাবে বিভিন্ন নবি-রাসূলদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ পরিদর্শন করে বায়তুল মুকাদ্দাসের দ্বারে উপনীত হয়ে তিনি বুরাক নামক বাহনটি অদূরে বেঁধে রাখেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদে প্রবেশ করে পূর্ববর্তী সকল নবি-রাসূলদের সাথে নিয়ে ক্বিবলামুখি হয়ে দুই রাকাত নামায আদায় করেন এবং এ নামাজের ইমামতি করেন। এরপর সিঁড়ির সাহায্যে প্রথম আকাশ, তারপর পর্যায়ক্রমে আরো ঊর্ধ আকাশগুলোতে আরোহন করেন। ওই সিঁড়িটির স্বরূপ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ই ভালো জানেন। যাহোক, প্রতিটি আকাশে সেখানকার ফেরেশতারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান এবং ষষ্ঠ আকাশে হযরত মূসা (আ.) ও সপ্তম আকাশে হযরত ইবরাহিম (আ.) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। এরপর তিনি সকল নবি-রাসূলগণের স্থানগুলোও অতিক্রম করে যান এবং এক বিশাল প্রান্তরে উপনীত হন। সেখানে ভাগ্যলিপি লেখার শব্দ শুনতে পান। তিনি সিদ্রাতুল মুন্তাহা অবলোকন করেন, সেখানে মহান আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি ও নানা রঙের প্রজাপতি ছুটাছুটি করছিল। ফেরেশতারা স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিল। সেখানেই তিনি একটি দিগন্তবেষ্টিত সবুজ রঙের পাল্কীর ন্যায় ‘রফ্রফ্’ ও বায়তুল মা’মুর দেখতে পান। বায়তুল মা’মুরের কাছেই কা’বার প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) প্রাচীরের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় ছিলেন। এই বায়তুল মা’মুরে দৈনিক ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন। ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাঁদের বারবার প্রবেশ করার সুযোগ আসবে না। সিদরাতুল মুনতাহার কাছাকাছি ছিল জান্নাত। নবি (স.) স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেন। আরশে মুয়াল্লায় মহান আল্লাহ্র সঙ্গে কথাবার্তা হয়। আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর প্রিয় রাসূলকে বিশেষভাবে অভিবাদন জানান। নবি (স.)ও আবেগ-কম্পিত কণ্ঠে সালাম পেশ করেন। মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সেই মহিমাময় আলাপচারিতার সারাংশই নামাযে তাশাহহুদে পাঠ করা হয়। সে সময় তাঁর উম্মতের জন্য প্রথমে ৫০ ওয়াক্তের নামায ফরয হওয়ার নির্দেশ হয়। এরপর তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করে দেয়া হয়। এরদ্বারা সব ইবাদাতের মধ্যে নামাযের বিশেষ গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। এরপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন আকাশে যেসব পয়গম্বরগণের সঙ্গে সাক্ষাত হয়েছিল। তাঁরাও তাঁর সঙ্গে বায়তুল মুকাদ্দাসে অবতরণ করেন। তাঁরা এখান থেকেই বিদায় নেন এবং রাসূল (স.) বুরাকে সওয়ার হয়ে রাতের অন্ধকার থাকতেই মক্কায় পৌঁছে যান।
হযরত উম্মে সালমা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স.) রমযান মাস ব্যতীত সবচেয়ে বেশি রোযা পালন করতেন শা’বান মাসে, অতঃপর রজব মাসে। হযরত আয়িশা (রা.) বলেন, যখন রজব মাস আসতো, তা আমরা নবিজির (স.) আমলের আধিক্য দেখে বুঝতে পারতাম। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, নবি (স.) রজব মাসে ১০টি রোযা পালন করতেন, শা’বান মাসে ২০টি রোযা রাখতেন আর রমযান মাসে ৩০টি রোযা পালন করতেন। (দারিমি)
রাসূলে পাক (স.) বলেছেন, রজব মাস হলো মহান আল্লাহ্র মাস, শা’বান মাস হলো আমার (নবিজির) মাস; রমযান হলো আমার উম্মতের মাস (তিরমিযি)। ‘যে ব্যক্তি রজব মাসে (ইবাদত দ্বারা) ক্ষেত চাষ দিলো না এবং শা’বান মাসে (ইবাদতের মাধ্যমে) ক্ষেত আগাছামুক্ত করল না; সে রমযান মাসে (ইবাদতের) ফসল তুলতে পারবে না।’(বায়হাকি)। রজব মাসের বিশেষ আ’মল হলো বেশি বেশি নফল রোযা পালন করা। বিশেষত প্রতি সোমবার, বৃহস্পতিবার, শুক্রবার এবং মাসের ১, ১০, ১৩, ১৪, ১৫, ২০, ২৯, ৩০ তারিখ রোযা পালন করা। বিশেষত অধিক হারে নফল নামায আদায় করা।
শবে মি’রাজের রাত মুসলিম উম্মাহ্র জন্য অনেক তাৎপর্যপূর্ণ একটি রাত। রজব মাসেই মি’রাজ সংঘটিত হয়েছিল এতে কোনো সন্দেহ নেই। রজব বরকতময় একটি মাস। রজব ও সাবান মাসদ্বয়কে রাসূল (স.) রমযানের প্রস্তুতি মাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। রজব মাসকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বেশি বেশি নফল আমল, নফল রোযা, নফল নামাযসহ অন্যান্য নেক আমলগুলোর প্রতি মনোনিবেশ বেশি দরকার। তবে শবে মি’রাজ উপলক্ষে শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত নির্দিষ্ট কোনো আ’মল নেই। তারপরও এ রাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ বিশেষ ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকতে পছন্দ করেন। বিশেষত এ রাতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মসজিদে কিংবা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে ওয়াজ ও দু’আ মাহফিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করার প্রথা দীর্ঘদিন যাবত চলে আসছে। অনেকে এ উপলক্ষে নফল রোযা পালন করেন এবং তাসবিহ্-তাহ্লিল পাঠ করেন। এছাড়াও নবি করিম (স.) রজব মাসে ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ও শা’বানা ওবাল্লিগনা রামাদান’ দু‘আটি বেশি বেশি পাঠ করতেন।
লেখক: কবি, শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও ইসলামি গবেষক।




