‘আমরা তরুণ উদ্যোক্তা। শহরে পড়ালেখা করে এই পাহাড়ি এলাকায় এসেছি। এখানে আট বন্ধু মিলে পাঁচ একর জমি ক্রয় করে কার্পাস তুলা আর মাল্টার চাষ করেছি। চার হাজার মাল্টার গাছ ছিল। এই ক্ষেত পাহারা দেওয়ার জন্য অনেক টাকা ব্যয় করে একটি ঘর ও সোলার লাগিয়েছি। এখানে দুজন পাহারাদারসহ ছয়জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে পাহাড় থেকে ২০ থেকে ২৫টি বন্য হাতির একটি দল হামলা করে ক্ষেতের পাহারা দেওয়া ঘরসহ সোলার প্যানেল ভেঙে তছনছ করেছে। ক্ষেত থেকে তুলে জমানো কার্পাস তুলার বস্তাগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে ফেলেছে। ক্ষেতের তুলা আর মাল্টার সব গাছ খেয়েছে। বন্য হাতির হামলায় আমাদের সব ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।’ কথাগুলো বলছিলেন শেরপুরের ঝিনাইগাতীর গারো পাহাড়ের ছোট গজনী গ্রামের ৫ একর জমিতে তুলা আর মাল্টার চাষ করা তরুণ উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান।

তিনি আরো বলেন, ‘বন্য হাতির হামলায় আমাদের ঘর ও মালামালসহ প্রায় সাত লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’ তার আরেক বন্ধু আওয়াল বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে পরিকল্পিতভাবে তুলা আর মাল্টার চাষ করেছি। আমাদের আরো অনেক পরিকল্পনা আছে। কিন্তু হাতি যেভাবে ক্ষতি করেছে। এটা পুষিয়ে নেওয়া আমাদের পক্ষে এখন অসম্ভব’। এ জন্য সরকারের কাছে বন্য হাতির হামলা থেকে রক্ষা পেতে এবং নতুন করে চাষাবাদে আর্থিক সহায়তার চান এই উদ্যোক্তারা।
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি শেরপুর শহরের গৌরীপুর এলাকার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান ঝিনাইগাতী উপজেলার ছোট গজনী এলাকায় পাঁচ একর জমিতে স্বদেশী অ্যাগ্রো প্রজেক্ট নামে একটি কৃষি প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করেন। এ প্রকল্পে মাল্টা ও কার্পাস তুলার বাগান রয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ২০–২৫টি বন্য হাতি খাদ্যের সন্ধানে পাহাড় থেকে লোকালয়ে নেমে আসে। এ সময় হাতির দল স্বদেশী অ্যাগ্রো প্রজেক্টের এলাকায় ঢুকে তাণ্ডব চালায়। হাতির দল শতাধিক মাল্টা ও তুলার গাছ, একটি দোতলা টিনের ঘরের আসবাব, আটটি সৌর প্যানেল ও ব্যাটারি এবং পানি তোলার পাম্প নষ্ট করে। সংবাদ পেয়ে বন বিভাগের রাংটিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মকরুল ইসলাম আকন্দসহ অন্য কর্মকর্তারা বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

শুধু এখানেই নয়, চলতি মাসে স্থানীয় চারটি গ্রামে কমপক্ষে অর্ধশত বাড়িঘর আর ফসলি জমিতে হামলা চালিয়েছে বন্য হাতি। এ সময় একটি বন্য হাতি মারাও গেছে। প্রতি রাতেই চামলা চালাচ্ছে বন্য হাতি। মঙ্গলবার সরেজমিনে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তুলে ধরেন বন্য হাতির তাণ্ডবের নানা চিত্র।
স্থানীয়রা জানায়, ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পোড়াকাশিয়া এলাকা থেকে নেমে আসা ২০ হতে ২৫টি বন্য হাতির একটি দল চলতি মাসেই এই পাহাড়ের ছোট গজনী, বড় গজনী, নওকোচি ও হালচাটি গ্রামে প্রবেশ করে অন্তত অর্ধশত বসতবাড়ি, ফসলের ক্ষেত, ড্রাগন ও আনারসের বাগানে হামলা করেছে। এতে ১৫-২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা। অন্যদিকে মারা গছে একটি বন্য হাতি। প্রতিদিন বিকেল হলেই লোকালয়ে নেমে আসছে বন্য হাতির দল। হাতির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে গ্রামবাসী দলবদ্ধভাবে লাঠিসোঁটা, লাইট, মশাল ও ঢাকঢোল পিটিয়ে হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে কিছুই কাজে আসছে না। বরং ক্রমেই বাড়ছে বন্য হাতির হামলা। এতে আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে পাহাড়ের গ্রামবাসী।
বন বিভাগের সহায়তায় গঠিত বন্য হাতি তাড়ানোর সংগঠন এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের (ইআরটি) স্থানীয় টিম লিডার আব্রাহাম সাংমা বলেন, ‘আমরা বন বিভাগ থেকে হাতি তাড়ানো জন্য প্রশিক্ষণ পেয়েছি। কিন্তু তেমন কোনো সরঞ্জাম পাই নাই। তা ছাড়া আমাদের লোকবলও কম। এটা দিয়ে হাতি তাড়ানো আমাদের পক্ষে সম্ভব না। এ জন্য প্রয়োজন প্রত্যেককে একটি করে জগ লাইট, মশাল জ্বালানো প্রয়োজনীয় কেরোসিন ও লোকবলসহ আর্থিক সহায়তা। ‘ স্থানীয় ইউপি সদস্য গোলাপ হোসেন বলেন, ‘রাত হলে পাহাড়ের ঝোপ-জঙ্গল থেকে ক্ষুধার্ত বন্য হাতি দল বেঁধে নেমে আসছে লোকালয়ে। হামলা চালাচ্ছে বাড়িঘরে। খেয়ে সাবাড় করছে গাছপালা। বাধা দিতে গেলে শুরু হয় হাতি ও মানুষের যুদ্ধ। ঢাকঢোল পিটিয়ে আর মশাল জ্বালিয়ে ঠেকানো যাচ্ছে না হাতির তাণ্ডব। এখন আমাদের এই চারটি গ্রামের তিন-চার হাজার মানুষ হাতি আতঙ্কে দিন পার করছে। ‘
এ ব্যাপারে রাংটিয়া রেঞ্জ অফিসার মকরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, বন্য হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে বন্য হাতি তাড়ানোর জন্য বন বিভাগ ও স্থানীয় ইআরটি নামের একটি সংগঠনের লোকজন চেষ্টা করছে। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় বন্য হাতি হামলা চালাচ্ছে। এ জন্য প্রয়োজন হাতির কবল থেকে গারো পাহাড়ের বাসিন্দাদের জানমাল ও ফসল রক্ষা করা। অন্যদিকে হাতি রক্ষায়ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দাসহ সচেতন মানুষেরা।




