একদিকে ছিল না ড্রাইভিং লাইসেন্স। উপরন্তু চালক সাইফুলের বেপরোয়া গতিতে পিকআপ চালানোর খেসারত দিতে হয়েছে একটি পরিবারের ৫ সহোদরকে। লাইসেন্স ছাড়াই উন্মাদের মতো গত দু’বছর ধরেই তিনি পিকআপসহ বিভিন্ন যান চালিয়ে আসছেন। চকরিয়ার ওই দুর্ঘটনার পর থেকে পলাতক সাইফুলকে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে এ ধরনের তথ্য। র্যাব তাকে শুক্রবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে আটক করে।

র্যাব জানিয়েছে, ঘন কুয়াশা ও বেপরোয়া গতির কারণে পিকআপের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চকরিয়ায় একই পরিবারের ৮-৯ সদস্যকে চাপা দেন চালক সাইফুল। ওই ঘটনায় মারা যান পাঁচ সহোদর। বাবার শ্রাদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ধর্মীয় আচার পালন শেষে তারা স্থানীয় একটি মন্দির থেকে ফিরছিলেন। দুর্ঘটনার পর মালিকের নির্দেশনায় চালক আত্মগোপনে চলে যান। ঘাতক পিকআপের চালক সহিদুল ইসলাম ওরফে সাইফুলকে গ্রেফতারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
শনিবার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাট নামক স্থানে একটি পিকআপের চাপায় চার সহোদর অনুপম সুশীল (৪৬), নিরুপম সুশীল (৪০), দীপক সুশীল (৩৫) ও চম্পক সুশীল (৩০) ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেক সহোদর স্বরণ সুশীলের (২৪) মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় গুরুতর আহত হন আরেক ভাই রক্তিম সুশীল ও বোন হীরা সুশীল। বর্তমানে রক্তিম সুশীল চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে।

র্যাব জানিয়েছে, পিকআপের মালিক চকরিয়ার মাহামুদুল করিম সবজি পরিবহনের ব্যবসা করেন। তিনি চকরিয়ার সবজির আড়ৎ থেকে কক্সবাজার সদর ও মহেশখালী এলাকায় সবজি সরবরাহ করতেন। তার ছেলে তারেক সবজি সরবরাহের তদারকি করতেন এবং ভাগিনা রবিউল তারেকের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ২০১৬ সালে তিনি পিকআপটি কেনেন। চার বছর ধরে পিকআপের ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন এবং গত তিন বছর ধরে রুট পারমিট মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। দুর্ঘটনার পর পিকআপের মালিক, তার ছেলে তারেক ও ভাগিনা রবিউল আত্মগোপনে বলে জানিয়েছে র্যাব। এ ঘটনার সঙ্গে পূর্ব শত্রুতার কোন সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না জানতে চাইলে কমান্ডার মঈন বলেন- প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন কোন তথ্য মেলেনি। ঘন কুয়াশা ও অতিরিক্ত গতির কারণে চালক সাইফুল সামনের কাউকে দেখতে পারেননি। অধিক গতির কারণে কাছাকাছি এসেও ব্রেক করে পিকআপটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।
এদিকে, নিহত পাঁচ ভাইয়ের পরিবারকে নগদ এক লাখ টাকা, ১০ বস্তা চাল ও নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী অনুদান দিয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। শুক্রবার বিকেলে নিহতের পরিবারের হাতে অনুদান তুলে দেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ আমিন আল পারভেজ। এর আগে চকরিয়া-পেকুয়ার এমপি জাফর আলম ২০ হাজার টাকা, চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা, স্থানীয় চেয়ারম্যান হাসানুল ইসলাম আদর ২০ হাজার টাকা, পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য,গত ৩০ জানুয়ারি নিহতদের পিতা সুরেশ চন্দ্র সুশীল বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরেরদিকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অংশ হিসেবে পূজা শেষ করে নয় ভাই-বোন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মালুমঘাট বাজারের নিকট রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। ভোর ৫টার দিকে কক্সবাজারমুখী বেপরোয়া গতিতে আসা একটি পিকআপ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মূল সড়ক থেকে নেমে গিয়ে তাদের চাপা দেয়। ঘটনাস্থল থেকে চালক পালিয়ে যান। ওই ঘটনায় নিহতদের ভাই প্লাবন সুশীল (২২) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা পিকআপ চালককে আসামি করে কক্সবাজারের চকরিয়া থানায় সড়ক পরিবহন আইনের ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। র্যাব জড়িতদের গ্রেফতারে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে দেয়।




