তাপস কুমার, আত্রাই (নওগাঁ) : “চির নতুনের দিল ডাক, পঁচিশে বৈশাখ”। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৩তম জন্মজয়ন্তী। বাঙালীর জাতীয় জীবনে এক স্মরণীয় দিন পঁচিশে বৈশাখ।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন উপলক্ষে প্রতিবছরই কবিগুরুর নিজস্ব জমিদারী তাঁর স্মৃতি বিজড়িত নওগাঁর পতিসর কাচারী বাড়ি প্রাঙ্গণে নামে রবীন্দ্রনাথভক্তের ঢল। পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়। এ মিলন মেলা চলে সপ্তাহজুড়ে । দূর-দূরান্ত থেকে কবিভক্তরা ছুটে আসেন তাঁদের প্রিয় কবির পতিসর কাচারী বাড়ি প্রাঙ্গণে। একে অপরের সান্নিধ্যে এসে স্মৃতি চারণে লিপ্ত হন কবিভক্তরা। কবিগুরুর ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে এবার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহন করা হয়েছে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য কবির নিজস্ব জমিদারী নওগাঁর পতিসর যেন পর্যটনের অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। কবিগুরুর ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষে পতিসরকে সাজানো হয়েছে অপরূপ সাজে। কাচারী বাড়িতেই কবিগুরুর ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। পতিসরে নাগর নদের পাড়কে মনমুগ্ধকর করে তোলা হয়েছে। দীর্ঘদিনে পতিসরের তেমন উল্লেখযোগ্য কোন উন্নয়ন না হলেও গতবছর থেকে যেন হাঁটি হাঁটি পা-পা করে উন্নয়নের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। তবে কবিগুরুর স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর আশীর্বাদবাণী, কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ও পুত্রবধূ প্রমীলা দেবীর স্বহস্তে লিখিত চিঠিগুলো আজও সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণের কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এসব প্রতœসামগ্রীগুলো অবহেলা আর অযতেœ পোকায় কাটছে।
কবিগুরুর নিজস্ব জমিদারী এলাকা কালিগ্রাম পরগনার সদর দফতর এই পতিসর। নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম এই পতিসর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ মাধুর্যঘেরা কবির স্মৃতি বিজড়িত পতিসর আজও সাহিত্যের অঙ্গনে সাড়ম্বরে বিরাজিত। কবির যখন ভরা যৌবন এবং কাব্য সৃষ্টির প্রকৃষ্ট সময়, তখনও তিনি বিরাজ করেছেন পতিসরে। প্রতিবছর কবির এই জন্মদিনে দূর-দূরান্ত থেকে কবিভক্তরা ছুটে আসেন পতিসরে। তাঁদের প্রিয় কবির স্মৃতিবিজড়িত পতিসর কাচারী বাড়ি প্রাঙ্গণে যেন কবিভক্তদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। নওগাঁ জেলা সদর থেকে ৩৫ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা অপ্রশস্ত পাকা সড়ক চলে গেছে নিঝুম-নিস্তব্ধ-নিভৃত পল্লীতে কবিগুরুর কাচারী বাড়ি নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার মনিয়ারি ইউনিয়নের পতিসর গ্রামে। আঁকাবাঁকা অপ্রশস্ত পাকা সড়ক হোক আর নিঝুম-নিস্তব্ধ-নিভৃত পল্লী হোক তাতে কি আসে যায়! তিনি যে আমাদের প্রাণের কবি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন উপলক্ষে প্রতিবছরই এখানে বসে মানুষের মিলনমেলা। সপ্তাহ জুড়ে চলে সেখানে রবীন্দ্রমেলা। এ সময় স্থানীয় ও এলাকাবাসীদের বাড়িতে ভিড় জমায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা কবিভক্ত, আত্মীয়স্বজন, অতিথিবৃন্দ। একে অপরের সান্নিধ্যে এসে স্মৃতিচারণে লিপ্ত হয় ফেলে আসা বিগত দিনের কথায়। গ্রামের মানুষ মেয়ে-জামাইকে নাইওরে আনে এই উৎসবে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত পতিসরে এবার কবির ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ইতোমধ্যে আত্রাই উপজেলায় নির্বাহী অফিসারের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত চুড়ান্ত প্রস্তুতিসভায় দিনব্যাপী কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। পতিসরে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে আলোচনাসভা, স্মৃতিচারণ, নাটক, আবৃত্তি, নাচ-গানসহ মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করবেন নওগাঁ, আত্রাই, রাণীনগর, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, বগুড়া, নাটোর, ঢাকা ও রাজশাহীর প্রথিতযশা শিল্পীরা। দেশী-বিদেশী পর্যটক ও রবীন্দ্র গবেষকদের নিরাপদে রাত্রি যাপন ও গবেষণার স্বার্থে পতিসরে ৫ কক্ষবিশিষ্ট অত্যাধুনিক “বঙ্গবন্ধু স্মৃতি নীড়” নামে দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। জানা গেছে, ১৯৩৭ সালে ২৭ জুলাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাজার হাজার প্রজাকে কাঁদিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে পতিসর তথা বাংলাদেশ থেকে শেষ বিদায় নিয়েছিলেন। শেষ বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য কবির ৭৬ বছর বয়সের একটি উন্মুক্ত ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। ভাস্কর্যটি জার্মানের কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসায় পদার্থবিদ রবীন্দ্র গবেষক প্রফেসর ড. গোলাম জাকারিয়ার আর্থিক সহযোগিতায় নির্মাণ করা হয়েছে। পরবর্তী ২০১১ সালের ৭ মে একটি রবীন্দ্র ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। এটিও প্রফেসর ড. গোলাম আবু জাকারিয়ার কোলন বিশ্ববিদ্যালয় জার্মান সার্বিক সহযোগিতায়।




