রেজাউল করিম, শ্রীবরদী (শেরপুর) : শান বাধাঁনো ঘাট থেকে পালতোলা নৌকার চলাচল এখন কেবলই কল্পকাহিনী। মাঝি-মালাদের ভাটিয়ালি সুরে গান গেয়ে মহানন্দে নৌকা বেয়ে এক স্থান হতে অন্য স্থানে যাওয়া শুধুই স্মৃতি। রুই, কাতল, চিতল, গজার, শোল, বোয়াল, শিং, মাগুরসহ নানা জাতের দেশীয় মাছের ভরপুরের গল্পটাও যেন আজগুবি। ঠিক তেমনিভাবে মিরকি নদীতে শতশত জেলেদের কোলাহলও যেন এখন আদিকথা।

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার নয়াপাড়া, তাতিহাটি, বনপাড়া, গেরামার, ঝালুপাড়া, পুটল, কাকিলাকুড়া গ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মিরকি নদী । এটি কালের স্রোতে ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে ওইসব যেন নতুন প্রজন্মের কাছে শুধুমাত্র কল্পকাহিনী। ভারত থেকে নেমে আসা রাক্ষুসি সোমেশ্বরীর পাগলা আর ঢেউফা নদীর গতি পথ মিরকি নদীর বুকে জেগে ওঠেছে চর। স্বাধীনতার আগেও যে নদীর গভীরতা ছিল ২০/২৫ ফুট। আজ সে নদীতে হচ্ছে ইরি বোরো চাষাবাদ।
পাহাড়ি ঢলে প্রতি বছরই এ মিরকি নদীতে পড়ছে পলিমাটি। এতে ঐতিহ্যবাহী এ নদীর অস্তীত্ব বিলীন হতে চলেছে। মাত্র দু’ যুগে ১৩/১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে ৭/৮ বছর ধরে চলছে ইরি বোরো চাষাবাু । এর মধ্যে প্রায় ১২ কিলোমিটারের কোনো অস্তীত্বই এখন আর নেই। রয়েছে শুধু মিরকি নদী। এর পূর্বে শ্রীবরদী সদর বাজার, দক্ষিনে বনপাড়া, চককাউরিয়া, ঝালুপাড়া, পশ্চিমে পুটল, উত্তরে গেরামারা ও কাকিলাকুড়া এলাকা।
শ্রীবরদী উপজেলা সদর বাজার সংলগ্ন ছিল নৌকা রাখার শান বাঁধানো ঘাট। এ ছাড়াও নয়াপাড়া, গেরামারা, কাকিলাকুড়াসহ কয়েকটি স্থানে ছিল ছোট ছোট ঘাঁটি। এ নদীটি ঘিরে শ্রীবরদীর তৎকালীন শম্ভূগঞ্জ বাজার গড়ে ওঠে ছিল বিশাল পাটের বাজার। এ ঘাট হতে নৌকায় পাট বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হতো জামালপুরের জেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। কিন্তু ওই জৌলুস হারিয়েছে প্রায় ৩৫ বছর আগেই। ওই সব এখন শধু স্মৃতি।
জানা যায়, এ নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে তৎকালীন খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধনী ঘোষনা করেন এবং এ কর্মসূচিতে অংশ গ্রহন করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান। কিন্তু রহস্যজনক কারনে পরবর্তীতে এর বাস্তবায়ন না হয়নি। এ জন্য নদীটিতে জেগে ওঠেছে চর। ফলে আর নৌকা চলে না। এক সময় যেসব জেলে এ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। সেই সব জেলে স¤প্রদায়ের অনেকের জীবনে নেমেছে দুর্ভোগের অমানিষা। কেউবা পেশা বদল করে চলে গেছে অন্যত্র। ফলে মৎস এলাকাটি হয়েছে মৎসশূন্য।
মিরকি নদীর দু’পাড়ে কৃষকরা জানান, এ নদীর বুকে পলিমাটি পড়ে অধিক উর্বর হয়েছে। তাই এ জমিতে সারের প্রয়োজন হয়না। এমনকি সেচ সুবিধা থাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে চলছে ইরি বোরো চাষাবাদ। নদীর বুকে চাষাবাদ করে পার্শ্ববর্তী জমির মালিকরা বছরের ৫/৬ মাসের খাবার ধান ঘরে তুলছেন। এসব কৃষকের সংখ্যা পাচঁ শতাধিক। সচেতন মানুষ ও জেলেরা মনে করেন, এ নদীটি ড্রেজিং করা হলে বছরে কোটি কোটি টাকার মাছ উৎপাদন হতে পারে। এ নদীতে মৎস খামার গড়ে তোলা হলে এখানেই কর্মসংস্থানের পথ হতে পারে হাজারো বেকার যুবক ও মৎসজীবিদের। দেশে মেটাতে পারে মাছের চাহিদা।




