তাপস কুমার, আত্রাই (নওগাঁ) : নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলায় মাদুর শিল্পের প্রধান কাঁচামাল পাতি চাষ করে বহু পরিবার এখন স্বাবলম্বি হয়ে উঠছে। প্রতিটি ঘরে ঘরে মাদুর তৈরীর ক্ষুদ্র কুটির শিল্প গড়ে উঠেছে। সে সব শিল্পে কাজ করছেন পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরাও। মাদুর তৈরীর একমাত্র উপকরন এই পাতিচাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন এই এলাকার মানুষ।
উপজেলা কৃষি স¤প্রসারন কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, আত্রাই উপজেলার নওদুলী, বড়সাঁওতা, জামগ্রাম, বাঁকা, ধুলাউড়ি, নৈদিঘী সহ প্রায় ১৫টি গ্রামের কৃষকরা পাতি চাষ করে থাকেন। এসব এলাকার মানুষ সাধারণত দুই ধরনের পাতি চাষ করে থাকেন। বনপাতি এবং পানি পাতি। অধিকাংশ জমিই বছরের ৩ থেকে ৪ মাস বর্ষার পানিতে ডুবে থাকে। আত্রাই উপজেলার জামগ্রামের প্রবীন ব্যক্তি আফাজ আলী (৮০) জানিয়েছেন, এই এলাকায় বনপাতির চাষ শুরু হয়েছে এখন থেকে প্রায় ১৫ বছর পূর্বে। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর পরই সাধারণত অগ্রহায়ন পৌষ মাসে কৃষকরা তাঁদের জমিতে শুরু করেন পাতির চারা রোপন। কোন জমিতে একবার পাতির চারা রোপন করলে পর পর ৫ বছর সে জমি থেকে পাতি উৎপাদিত হয়। এক বিঘা জমি থেকে প্রতি বছর ৭০ থেকে ৮০ আঁটি পাতি উৎপাদিত হয়। বাজারে প্রতি আঁটি পাতি বিক্রি হয় ৮শ টাকা করে। সে হিসাবে প্রতি বছর এক বিঘা জমি থেকে পাতি বিক্রি মুল্য আসে কমপক্ষে ৬৪ থেকে ৭০ হাজার টাকা। আর প্রতি বিঘায় খরচ হয় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। সে হিসাবে পাতি চাষ অনেক লাভজনক। জমি থেকে কাটার পর পাতিগুলো কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে উপযোগী করে বিশেষ তাঁতের সাহায্যে তৈরী করা হয় মাদুর। এলাকার শত শত পরিবার মাদুর তৈরীর সাথে জড়িত। তাঁদের তৈরী মাদুর দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
আত্রাই উপজেলার বড়সাঁওতা গ্রামের ফাহিমা বেগম জানিয়েছেন, তাদের সংসারের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি মাদুর তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকেন। তার নিজের কোন বড়সড় পুঁজি না থাকায় প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি বিভিন্ন এনজিও সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তার এই মাদুর শিল্পকে দাঁড় করিয়েছেন। বর্তমানে তার এই মাদুর শিল্পের তাঁতে দৈনিক ৮-১০ জন মহিলারা মাদুর তৈরি করছে যারা আজ অনেকটাই স্বচ্ছল জীবন-যাপন করছে। এই মাদুর তৈরির লভাংশ থেকে মাদুর তৈরির প্রধান উপাদান পাতি উৎপাদন এবং কিছু জমিও বন্দক নিয়েছেন বলে তিনি জানান। তাঁদের উৎপাদিত পাতি দিয়ে নিজেরা মাদুর তৈরী করেন আবার অতিরিক্ত পাতি মাদুর তৈরীর উপযোগী করে বাজারে বিক্রি করে থাকেন। মাদুর ও পাতি বিক্রির জন্য বিখ্যাত হাট আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ হাট। প্রতি বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চলে এ হাটের বেচাকেনা।
চৈত্র থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত পাতির দাম কম থাকে। পাতির কোন সংকট থাকে না। লাভও বেশী হয়। এই সময় পাতির দাম বেশী এবং পাতি ঠিক মতো পাওয়া যায় না। লাভও কম। কারণ মাদুরের দাম একই থাকে। প্রতি আঁটি পাতি থেকে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫টি বড় আকারের মাদুর তৈরী করা যায়। এই আকারের প্রতিটি মাদুর ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। একটি পরিবার প্রতিদিন কমপক্ষে ৬-৭টি মাদুর তৈরী করে থাকেন। সে হিসাবে ১ আঁটি পাতি থেকে প্রতি ৫ দিনে পাতির দাম ৮০০ টাকা বাদ দিয়ে লাভ করে থাকেন ১৬০০ টাকা থেকে ২২০০ টাকা পর্যন্ত। এই এলাকার তৈরীকৃত মাদুর রাজধানী ঢাকাসহ সৈয়দপুর, রংপুর , খুলনা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এসে স্থানীয় বাজার থেকে মাদুর কিনে নিয়ে যান। তাঁরা দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব মাদুর সরবরাহ করে থাকেন।
আত্রাইয়ের জামগ্রাম এলাকার পাতি চাষী ও মাদুর কারিগর আব্দুল মান্নান, সোহেল রানা জানিয়েছেন, তারাও মাদুর তৈরি করে বর্তমানে স্বচ্ছল । তবে মাদুর তৈরির পাশাপাশি পাতি উৎপাদন করে আরও অনেক বেশি লাভবান হয়েছেন বলে জানান। তারা আরও জানান পাতি শুকানোর জন্য কৃষকদের কেবলমাত্র রোদের উপর নির্ভর করতে হয়। পাতি শুকানোর কোন কৃত্রিম উপায় এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে মাদুর বুনানোর ব্যবস্থা করতে পারলে এই এলাকার মাদুর শিল্পীরা আরও অধিক হারে মাদুর তৈরী করতে পারবেন এবং তা করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে। এসব সুবিধাদি পেলে আরো উন্নত মাদুর তৈরি করে বিদেশে রপ্তানী করতে পারবে বলে তাদের ধারনা।
এ বিষয়ে আত্রাই কৃষি স¤প্রসারন কর্মকর্তা ড. এমএ আজিজ জানান, এই এলাকার কৃষকদের জন্য উন্নত প্রজাতির পাতির বীজ, মাদুর তৈরীর প্রশিক্ষণ ও কৃষি ঋণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কৃষি স¤প্রসারন অধিদপ্তর । কিন্তু উত্তরাঞ্চলের মধ্যে একমাত্র নওগাঁর সদর, আত্রাই ও রাণীনগর ছাড়া অন্য কোথাও পাতি চাষ হয় না। তাই এসব সুবিধা দেয়া আমাদের জন্য বেশ দুরুহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে উন্নত প্রজাতির বীজ সরবরাহের ব্যাপারে মোটামুটি একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে। খুব শিঘ্রই উপজেলার কৃষকদের মাঝে উন্নত প্রজাতির পাতির বীজ সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।




