তাপস কুমার, আত্রাই (নওগাঁ) : নওগাঁর আত্রাইয়ে গরিব মানুষকে আত্মকর্মসংস্থানমুখী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তদানীন্তন ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ‘বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি’ গান্ধী আশ্রম’টি জরাজীর্ণ অবস্থায় আজো যেন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মহাত্মা গান্ধীর ব্যবহৃত বেশ কিছু আসবাবপত্র ও কুটির শিল্পে ব্যবহৃত ঐতিহাসিক সামগ্রীগুলো সংরক্ষণের নির্ধারিত ঘর না থাকায় সেগুলো অযতেœ আর অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারীভাবে রক্ষণাবেক্ষণের কোন উদ্যোগ না থাকায় গান্ধী আশ্রমের বিশাল জায়গা-জমি স্থানীয় প্রভাবশালীরা ইতেমধ্যেই জবরদখল করে নিয়েছে। দ্রুত সরকারী নজর দিয়ে কুটিশিল্প চালু ও মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক এই প্রতিষ্ঠানটির পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত ১৯২২ সালের দিকে তদানীন্তন ভারত উপমহাদেশের বেশ কিছু এলাকায় ব্যাপক বন্যা হয়। বন্যাকবলিত এলাকায় দুর্ভিক্ষের পাশাপালি বিভিন্ন রোগ-বালাই দেখা দেয়। সে সময় ব্রিটিশ বিরোধী নেতা ডা. প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পিসি রায়), মহাত্মা গান্ধী ও নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসুর সহযোগিতায় ১৯২২ সালে বর্তমান নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের পূর্বপাশসংলগ্ন ভরতেঁতুলিয়া গ্রামে ৯ একর জমির ওপর এলাকার গরিব ও সাধারণ মানুষদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন এই “রঙ্গীয় রিলিফ কমিটি (গান্ধী আশ্রম)”। এটি প্রতিষ্ঠার পর এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে চিকিৎসা সেবা, আর্থিক সাহায্য, শিক্ষা, গরু প্রতিপালন, মত্স্য চাষ, খাঁটি ঘি তৈরিসহ নানা কাজে নানাভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছিল। এলাকার সাধারণ মানুষের অভাব অনটন এভাবেই দূর করে যেখান থেকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করা হতো। মূলত প্রতিষ্ঠানটি দেখাশোনা করতেন ডা. প্রফুল্ল চন্দ্র (পিসি রায়) নিজেই। পরে মহাত্মা গান্ধী আত্রাইয়ের এই প্রতিষ্ঠানে আসেন এবং এখানে এলাকাবাসীর আত্মকর্মসংস্থানের জন্য প্রথমে খদ্দর কাপড় তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। ফলে পরবর্তীতে খাদি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি এলাকায় সমধিক পরিচিতি লাভ করে। ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত ভাগাভাগি হওয়ার পরও তার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধোর সময় পাকবাহিনীর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পর এই জনহিতকর প্রতিষ্ঠানটি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। অদ্যাবধি এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি সরকারী কোন নজর না থাকার সুযোগে এলাকার সুযোগ সন্ধানী ভূমিদস্যু প্রভাবশালীরা ইতোমধ্যেই জবরদখল করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু জায়গা-জমি।
আশ্রমটি দেখাগুনা করতেন এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুর রহমান জানান, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এই গান্ধী আশ্রমে চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা, গরু পালন, মৎস্য চাষ, খাঁটি ঘি তৈরিসহ নানান কাজ করা হতো। এতে এলাকার সাধারণ মানুষ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন অনায়াশেই। কিন্তু ওই বছর পাকবাহিনীরা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি সংযোগ, লুটপাট করলে বন্ধ হয়ে যায় এখানকার সকল কার্যক্রম। পরবর্তীতে স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও কোন সরকারের আমলেই এখানে উল্লেখযোগ্য কোন সহযোগিতা না থাকায় কারাখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এখানকার ঐতিহ্য আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় এলাকাবাসী ময়নুল ইসলাম ও সাদেকুল ইসলাম জানান, প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু সম্পত্তি স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। এসব অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করে সেই সম্পত্তি গুলো উদ্ধার করা জরুরী হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে পুরো এলাকা সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরাও করা প্রয়োজন। এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারী ভাবে উদ্যোগ নিয়ে দখলদার মুক্ত করে এবং নতুন করে চালু করার পাশাপাশি গান্ধীর স্মৃতি বিজরিত ঐতিহাসিক এই প্রতিষ্ঠানের পুরনো ঐতিহ্য পুনর্জীবিত করার দাবি জানান তারা।
রেশম চাষী খোরশেদ আলম জানান, এখানে ২০১১ মালে রেশম চাষ শুরু হয়েছে। সরকারী নজরদারি বৃদ্ধি পেলে এখানে রেশম চাষ আশাতীতভাবে সফল হবে। এতে অনেকেরই কর্মসংস্থান হবে, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সম্পাদক ডা. নিরাঞ্জন দাস জানান, মহাত্মা গান্ধী ও পিসি রায়ের ব্যবহৃত বেশ কিছু আসবাবপত্র ও কুটির শিল্পের ব্যবহৃত ঐতিহাসিক সামগ্রীগুলো সংরক্ষনের ব্যবস্থা না থাকায় সেগুলো অযত্মে আর অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অর্থ অভাবে স্মৃতি বিজরিত সামগ্রীগুলো সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। এছাড়া আশির দশকের দিকে পল্লীবিদ্যুত এই প্রতিষ্ঠানের তিন একর জমি ভুয়া দলিলের মাধ্যমে দখল করে নেয়। ঘটনাটি জানতে পেরে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি চলমান রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে তিনি প্রতিষ্ঠানটি সংরক্ষণের দাবি জানান বর্তমান উন্নয়নশীল সরকার প্রধানের কাছে।
প্রতিষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম জানান, প্রতিষ্ঠানটি একেবারে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে ছিল। সীমানা প্রাচীর না থাকার কারণে স্থানীয়রা এটিকে গোচারণভূমিতে পরিণত করেছে। তবে বর্তমান সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম ও সাবেক সংসদ সদস্য ওহিদুর রহমানের ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানের কিছুটা উন্নতি করা সম্ভব হয়েছে।
সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ওহিদুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সহযোগিতায় নতুন প্রকল্প গ্রহন করে এখানে রেশম শিল্প চালু করা হয়েছে। ভারতীয় বিভিন্ন কর্মকর্তা বিভিন্ন সময় পরিদর্শন করে গেছেন এই প্রতিষ্ঠানটি। এখন ভারতীয় অর্থে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা পরিষদ থেকে কিছু টাকা পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠান চালু হলে কুটির শিল্প আবারও চালু করার আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার হেমন্ত হেনরী কুবি জানান, ইতোমধ্যে ভারতীয় সরকারের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করা হয়েছে। আগামীতেও সরকারের সকল সহযোগিতা অব্যাহমত থাকবে বলে তিনি জানান।
নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) সংসদ সদস্য ইরাফিল আলম জানান, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসু ও ডা. প্রফুল্ল্য চন্দ্র রায়ের (পিসি রায়) প্রতিষ্ঠানের গৌরব ধরে রাখা আমাদের সকলের কর্তব্য। এটি চালু করে আবার কুটির শিল্পের মাধ্যমে এলাকার সাধারণ মানুষ কর্মসংস্থান ফিরে পাবে, সেই সঙ্গে ফিরে পাবে এখানকার ঐতিহ্য। ছাড়াও পল্লী বিদ্যুৎ যে সম্পত্তি দখল করেছে তা প্রতিষ্ঠানে ফিরে নেয়ার জন্য সব সময় চেষ্টা আছে। যা আগামীতেও থাকবে। আগামীতেও প্রতিষ্ঠানটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সকল সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। মহাত্মা গান্ধীর এ প্রতিষ্ঠানটি সংস্কার করে এখানে এলাকাবাসীর আত্মকর্মসংস্থানের জন্য বন্ধ কারাখানা চালু করে এবং হারিয়ে যাওয়া এখানকার সকল ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেয়ার পাশাপালি মহাত্মা গান্ধী ও পিসি রায়ের ব্যবহৃত স্মৃতি বিজড়িত বিভিন্ন সামগ্রী যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানান এলাকার সকল স্তরের মানুষ।




