এম লুত্ফর রহমান, নরসিংদী : সরকার তিতাসের উপড় থেকে সংযাগ নিষেজ্ঞা প্রত্যাহারের সাথে সাথেই নরসিংদীতে অবৈধভাবে সংযোগের হিড়িক পড়েছে। আর এই সংযোগের ফলে তিতাস কর্তৃপক্ষের নিরবতায় প্রশাসন থেকে শুরু করে সচেতন মহল পর্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। তিতাস কর্তৃপক্ষের এক হিসেবে অনুযায়ী নরসিংদী জেলায় ৫০ হাজার সংযোগই অবৈধ। আর বৈধ সংযোগকারীর সংখ্যা মাত্র ২০ হাজার। এবিষয়ে দেশের বিভিন্ন ইলেকট্রিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচারিত হলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ফলে নামে মাত্র ২/১ জন কর্মকর্তাকে বদলী করেই তাদের তৎপরতা শেষ করে ফেলেন । এছাড়া কয়েকদিন মোবোইল কোর্ট করলে নরসিংদী শহরে কিছুটা অবৈধ সংযোগ কমেছে কিন্তু নরসিংদী সদর ব্যতিত অন্যান্য এলাকায় কোনক্রমেই থেমে নেই গ্যাস সংযোগের এই প্রতিযোগিতা। স¤প্রতি নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগের যেন একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কার আগে কার বাড়িতে গ্যাস যাবে এই যেন এক প্রতিযোগিতা। সংযোগ না নিলে মনে হয় আর জীবনে পাওয়া যাবেনা। তার জন্য যত টাকা লাগে লাগুক তবুও গ্যাস সংযোগ চাই। আর এই সকল সংযোগের জন্য রাত দিন সমান তালে কাজ করছে একাদিক সিন্ডিকেট। এই সংযোগের জন্য প্রতিটি বাড়ি থেকে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত গ্রহন করছে সিন্ডিকেট সদস্যরা। এই সিন্ডেকেটে রাজনৈতিক শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা কলকাঠি নাড়ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জনগন জানান, পলাশ বাগপাড়া, দাড়হাওলাপাড়া, বাঙ্গালপাড়া, ভাড়ারিয়াপাড়া, পাইকসা, পলাশ নতুন বাজার এলাকায় পলাশের সাবেক এমপি পলাশ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব ডাঃ আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলীপ’র ব্যক্তিগত সহকারী মজনু সরকার নিয়ন্ত্রন করে থাকে। মজনু সরকারের অধিনে সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে অবৈধ সংযোগ দেয়ার জন্য জনগনের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন মোঃ মাসুম, আক্রাম হোসেন লিটন, জজ মিয়া, আওলাদ হোসেন ও সেলিম মিয়াসহ আরো কয়েকজন। তাদের নেতৃত্বে এলাকায় প্রায় ৫ শতাধিক বাড়িতে অবৈধভাবে সংযোগ দেয়া হয়েছে। অপরদিকে এ সকল এলাকায় বৈধভাবে আবেদনকৃত ব্যক্তিরা সংযোগ না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অপরদিকে ঘোড়াশাল এলাকার ঘাঘড়া, সান্তানপাড়া, ফুলদিরটেক, কর্তাতৈল, টেঙ্গরপাড়া, মিয়াপাড়া, আটিয়াগাঁওসহ আশ পাশের এলাকার নেতৃত্ব দিচ্ছেন পলাশ উপজেলার নব নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও পলাশ উপজেলা যুবলীগের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ জাবেদ হোসেন। তিনি এলাকার জনসাধারনকে গ্যাস সংযোগের প্রলোভন দেখিয়ে বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোট আদায় করেন। আর সেই মোতাবেক তিনি নির্বাচনের আগের দিন টেঙ্গড়পাড়া ও নতুনপাড়া এলাকায় তার বাহিনীর সহযোগিতায় অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়। আর নির্বাচনে জয় লাভের পরদিনই তিনি কর্তাতৈল, আটিয়াগাঁও ও সান্তানপাড়া এলাকায় এই অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেন। ঘোড়াশাল এলাকায় পোষ্ট অফিস গেইট থেকে অবৈধ সংযোগ দিয়ে এসকল এলাকায় বিতরণ করা হয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, আগে অবৈধ হলেও তিতাসের নিজস্ব মেশিনের মাধ্যমে কিছু অসাধু কর্মচারী সংযোগের চুরান্ত কাজটি শেষ করতেন। কিন্তু অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিষয়ে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি হলে ভিন্ন কৌশল অভলম্বন করে পুরান ঢাকার আলু বাজার এলাকা থেকে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শ্রমিকদের অধিক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে দিনরাত কাজ করে সংযোগ দিয়ে যাচ্ছে।
এলাকাবাসী আরো জানান, তিতাসের বৈধ ২ ইঞ্চি পাইপ লাইন থেকে ঢাকার অভিজ্ঞ শ্রমিকদের মাধ্যমে বাড়ির পাশে রাইজার সংযোগ পর্যন্ত কাজটি করে থাকে সিন্ডিকেটচক্র। আর এই রাইজার থেকে বাড়ির ভিতর পর্যন্ত সাধারন জনগন নিজস্ব অর্থে নিন্মমানের ১ইঞ্চি পাইপ দিয়ে গ্যাস সংযোগ দিচ্ছেন। অভিযোগে জানা যায়, মাত্র ১ইঞ্চি পাইপ দিয়ে পলাশ নতুন পাড়া থেকে ১৭শত ফুট পর্যন্ত নিয়ে বাড়িতে সংযোগ দেয়া হয়েছে।
পলাশ উপজেলায় এভাবে অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিষয়ে পলাশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা নাছিমা খানম’র কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, এবিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি শুধু মাঝে মধ্যে ফোনে খবর দেয়। আর আমরা পুলিশ নিয়ে গেলে তারা পালিয়ে যায়। তবু আমরা স¤প্রতি পলাশ বাঙ্গালপাড়া এলাকা থেকে এই অবৈধ সংযোগ দেয়ার সময় মুনসুর খা, শহিদুল্লাহ ও মাসুদ মিয়া নামের ৩ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিতাসকে খবর দিয়ে তাদের নামে মামলা দেয়া হয়েছে।
এভাবে অবৈধ সংযোগের বিষয়ে পলাশ থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আলমগীর হোসেন ভূইয়া জানান, কেউ যদি আমাদের কাছে কোন লিখিত অভিযোগ না দেয় তাহলে আমরা তেমন কিছু করতে পারিনা। এরপরও স¤প্রতি রাতের বেলা আমাদের থানা পুলিশ বাগপাড়া এলাকার ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় অবৈধ সংযোগকারীরা ১২টি গ্যাস পাইপ রেখেই দৌড়ে পালিয়ে যায়। যারফলে পাইপ গুলো থানা হাজতে রেখে দেয়া হয়েছে। এছাড়া স¤প্রতি বাঙ্গালপাড়া থেকে ৩ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে এবং তিতাস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মামলা দিয়ে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে তিতাসের পলাশ অফিসের টেলিফোনে বার বার ফোন করলেও কেউ ফোন রিসিপ্ট করেননি।
অবশেষে নরসিংদীর তিতাস কার্যালয়ের উপ-মহা ব্যবস্থাপকের সাথে আলাপ কালে তিনি জানান, আমরা চেষ্টা করছি অবৈধ সংযোগ রোধ করতে কিন্তু সম্ভব হচ্ছেনা এক শ্রেনির ঠিকাদার ও দালালদের কারনে। এ সকল অবৈধ সংযোগে আগে কিছু কর্মচারী জড়িত থাকলেও বর্তমানে কোন কর্মচারী জড়িত নয়। এলাকার দালালরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিজ্ঞ শ্রমিকদের এনে এ সকল সংযোগ দিয়ে যাচ্ছে। দালালদের দেয়া সংযোগে যে সকল পাইপ ব্যবহার করা হচ্ছে তা খুবই নিন্মমানের। যারফলে যে কোন সময় দূর্ঘটনা ঘটে প্রাণহানীর মতো ঘটনার সম্ভবনা রয়েছে। এখন এলাকাবাসী সচেতন না হলে এর বিরোদ্ধে তেমন কিছু করা সম্বব নয়।
এলাকার বৈধ ভাবে আবেদনকৃত জনগন জানান, আমরা ৮/১০ বছর যাবৎ টাকা পয়সা জমা দিয়ে অপেক্ষা করছি কিন্তু কোন সংযোগ পাইনি। আবার যারা পূর্ব থেকেই সংযোগ পেয়েছে তারা চুলার পরিমান বৃদ্ধির জন্য আবেদন করলেও কোন ফল হচ্ছেনা।




