ভোলাহাট (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি : বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ ও অবহেলিত উপজেলাগুলোর মধ্যে ভোলাহাট অন্যতম। আম, রেশম, মাছ আর ধানে ধন্য ভোলাহাট উপজেলা দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির অঙ্গণে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার যুগেও এ উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা ততটা উন্নত না হওয়ায় বহুবিধ সমস্যার আবর্তে নিমজ্জিত থাকার কারণে অনেকে এ জনপদকে বলে থাকেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। চাকুরীজীবিরা বলে থাকেন “পানিষ্টম্যান্ট এরিয়া”।

উপজেলার আয়তন ৩০ হাজার ৬শ ২৩ একর, ৪ হাজার ৭শ ৬৪ বর্গমাইল। লোকসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার, ৫শ ৬৪ জন। এর মধ্যে মহিলা ৬৩ হাজার ৩শ ২ জন, পুরুষ ৫৭ হাজার ১শ ৬২ জন। বৃটিশ আমলে ১৮২৩ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এ উপজেলা তৎকালীন ভারতের মালদহ জেলার অধীন ছিলো। ৪৭ সালে দেশ বিভাজনের পর ৫টি থানা বেরিয়ে এসে তৎকালীন নবাবগঞ্জ মহুকুমায় ও রাজশাহী জেলায় যোগ দেয়। এর মধ্যে ভোলাহাট অন্যতম। বর্তমানে উপজেলার উত্তরে ভারতের মালদহ জেলার ওল্ড মালদহ, পূর্ব-পশ্চিমে যথাক্রমে একই জেলার হবিপুর ও ইংরেজ বাজার থানা অবস্থিত। দক্ষিণে ও দক্ষিণ-পূর্বে যথাক্রমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুর উপজেলা। চৈত্র থেকে জৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত এ উপজেলায় প্রচণ্ড গরম অনুভূত হয়। আষাঢ় মাস থেকে শুরু হয় বর্ষা। এ বর্ষা কোনবার হয় ফের কোনবার হয়না। অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুণ মাস পর্যন্ত শীতকাল। কোন কোন সময় অগ্রীমভাবে শীত চলে আসে। উপজেলার উত্তর-পূর্বদিক দিক দিয়ে পদ্মার উপনদী মহানন্দা বয়ে গেছে।
ভোলাহাট উপজেলা বিভিন্ন ধরণের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহণ করে আসছে, সেই মান্দাত্বা আমল থেকেই। এর মধ্যে অবহেলা আর অযত্নের ফলে কালের সাক্ষী হিসেবে উপজেলার থানা সংলগ্ন পুরাকীর্তি গুলো আজ একেবারেই বিলুপ্তির পথে। উপজেলার ভোলাহাট গ্রামে অতি প্রাচীন তিনটি শিব মন্দিরের অস্থিত্ব এখনো বিদ্যমাণ। ভোলাহাট থানা-পুলিশের কার্যালয়ে যেতে ডানদিকে যে গৌড়িয়া ইটের মন্দিরটি রয়েছে তা স্থানীয় জনগণ ‘চামচিকা মন্দির’ বলে থাকে। মন্দিরটির বিচিত্র কারুকার্য্য খচিত পোড়া মাটির মূর্তিগুলো মন্দিরের গা থেকে খসে খসে পড়ছে। চুরি হয়ে গেছে এর মূল্যমান প্রস্তর ও প্রস্তর খচিত মূর্তিগুলো। মন্দিরটির বিচিত্র গঠনপ্রণালী দর্শকদের সত্যিই বিমোহিত করে। এছাড়া এ মন্দিরটির পশ্চিমে রাস্তার অপর পাড়ে আরো দু’টি মন্দির এবং গিলাবাড়ী বিজিবি ক্যাম্পের সন্নিকটে প্রায় ভগ্ন মন্দিরের অস্থিত্ব এখনো বিদ্যমান। অনুমান করা হচ্ছে প্রায় ২/৩’শ বছর আগে ওই মন্দিরগুলি নির্মিত হয়েছে। মন্দিরগুলির মাথার উপর জন্মেছে অসংখ্য গুল্মলতা। ফাটল ধরেছে মন্দিরগুলির সর্বাঙ্গে। ‘চামচিকা’ মন্দিরটি দক্ষিণ দিকের একটি বিশালাকার দরজাও ধ্বসে পড়েছে অনেক আগেই। মন্দিরগুলির আশেপাশের জমি হয়ে গেছে বেদখল। পূজা-অর্চনা হয়না বলেই মন্দিরের গা ঘেষে গড়ে উঠেছে বসতী। মন্দিরের গায়ে এখন শুধু গোবর শুকানো আর গরু বাঁধা থাকে সকল সময়। প্রয়াত প্রাক্তন প্রতিরক্ষা সচিব কাজী জালাল উদ্দিনের আম বাগানে একটি প্রাচীন মসজিদ রয়েছে। মসজিদটির অবস্থাও আজ বিসন্ন। তবে বিভিন্ন সময় আসে আর যায় কিন্তু এ মসজিদগুলির ভাগ্যাকাশে আলোর ছাপ পড়েনা। কাজী জালাল সাহেবের মসজিদটির ছাদ ধ্বসে পড়লেও এর দেওয়াল ও মেহরাবগুলো ওটুট রয়েছে। চুন-সুরকী আর গৌড়িয়া ইটের সাহায্যে তৈরী এই মসজিদটির গায়ে রয়েছে বিচিত্র নক্সা আর কারুকার্য্য।
জানা গেছে, মসজিদটি ১২২১ হিজরী সালে প্রতিষ্ঠিত খোদিত কালো পাথরে এর সাল স্পষ্ট অক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এ ছাড়াও মসজিদের আশেপাশে বিভিন্ন স্থান বহু পূর্বের বসতীর আলামত পাওয়া যায়। আরো জানা যায়, এক সময় ঐ স্থানে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে লোকালয় ছিলো। এক ভয়াবহ মহামারীর কারণে লোকজন অন্ন্যত্র চলে যায়। ফিরে আসি মসজিদ ও মন্দিরের কথায়, কাজী জালাল সাহেবের বাগানের ঐ মসজিদটি এবং মন্দিরসহ থানা সংলগ্ন মন্দিরগুলির রক্ষনাবেক্ষণ করা উচিৎ। নচেৎ অবহেলা আর অযতেœ এই পুরাকীর্তি গুলি হয়তো আর কিছুদিনের মধ্যেই তাদের অস্থিত্বের ইতি টানবে এবং ধ্বংসস্তুপে পরিনত হবে। এখানে উলেখ্য, ভোলাহাট থানা সংলগ্ন রাস্তার দু’ধারে অবস্থিত মন্দিরগুলির অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে মেরামত বা সংস্কার প্রয়োজন। নতুবা যেকোন মূহুর্তে মারাত্বক ধরণের বিপদাপদে পড়তে পারে ঐ মন্দিরের সাথে বসবাসকারী জনগণ বলে এলাকাবাসী জোর দাবী করেছেন।
এছাড়াও এ উপজেলার যাদুনগর, গোপিনাথপুর ও বজরাটেক এলাকায় আরো তিনটি অতি প্রাচীন মসজিদ দেখা যায়। যা বর্তমানে কিছুটা হলেও তার পূর্বের দৃশ্য পাল্টে এলাকাবাসী পরিবর্তন এনেছে। মসজিদগুলি একই গঠন প্রকৃতির। তবে মসজিদগুলি কত সালে নির্মিত তা ঐতিহাসিক কোন দলিল-পত্র না থাকায় তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তবে এক কথায় বলা যায় মসজিদ তিনটির সু-প্রসস্থ ভিত ও গঠন শৈলী গৌড়ের বাদশাহের আমলের মত। গৌড়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মনে করা হচ্ছে মসজিদগুলি বাদশাহী আমলের বলে এ যুক্তি অগ্রাহ্য করা যায়না। দীর্ঘদিন ধরে মসজিদ তিনটি ব্যবহৃত হয়ে আসায় এর কোনপ্রকার অঙ্গহানী ঘটেনি।




