মোহসীন মাতুব্বর/মোস্তাফিজুর রহমান, বরগুনা : নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে বরগুনার দুটি আসনের নির্বাচনী প্রচার।
বরগুনা-১ : বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী এ ৩ উপজেলা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের বরগুনা-১ আসন। আসনটির মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত প্রমত্তা বুড়িশ্বর (পায়রা) নদী। এ নদীর পূর্ব পাড়ে রয়েছে আমতলী ও তালতলী উপজেলা। আর পশ্চিম পাড়ে বরগুনা সদর উপজেলা। ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে ছিল দুটি আসন। ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সরকারের আমলে একটি আসন কমানো হয়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ভৌগোলিক বিবেচনায় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হলে আঞ্চলিকতার টানে জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে অনেকটাই।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর বাড়ি বরগুনা সদরে অবস্থিত। আমতলী-তালতলীবাসীর অভিযোগ, তাঁরা গত ৫ বছর এমপির সান্নিধ্য পায়নি। যে কারণে এ দুই উপজেলার মানুষ তাঁদের এলাকার প্রার্থী চায়। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যে দলই আমতলী-তালতলী থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেবে সে দলই ভাল করবে, এমনটাই মনে করেন পর্যবেক্ষক মহল।
দশম জাতীয় নির্বাচনে বরগুনা-১ আসনে আওয়ামী লীগের ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে আওয়ামী লীগের নিষ্ক্রিয় নেতা সাবেক সাংসদ দেলোয়ার হোসেন এবং বিএনপির জাতীয় কমিটির সদস্য সাবেক সাংসদ মতিয়ার রহমান তালুকদার। দেলোয়ার হোসেনের রয়েছে ব্যক্তিগত ভোট ব্যাংক আর মতিয়ার রহমান তালুকদারের রয়েছে ব্যাপক আঞ্চলিকতার টান। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোট থেকে এ দু’জনকে মনোনয়ন দেয়া হলে হাড্ডহাড্ডি লড়াই হবে, এমন ধারণা এলাকাবাসীর। বরগুনা-১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও বিএনপিও বেশ সক্রিয় ও সুসংগঠিত হওয়ায় আ’লীগের দূর্গখ্যাত আসনটি হারানোর সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। স্বাধীনতাপূর্ব বা পরবর্তী সবকটি নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী অথবা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে। যে কারণে এ আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
বরগুনা-১ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে তাঁদের প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন। ঈদ-পূজা থেকে শুরু করে নির্বাচনী সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ভোটের রাজনীতিতে মাঠ ততই সরগরম হয়ে উঠছে। নানা রঙ্গের ব্যানার, ফেস্টুন আর পোস্টারে ছেয়ে গেছে গোটা এলাকা। এ আসনে প্রার্থী হিসেবে ইতোমধ্যে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁরা হচ্ছেন মহাজোট তথা আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর কবির, আওয়ামী লীগ নিষ্ক্রিয় নেতা সাবেক সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন, আ’লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক খলিলুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ার টুকু, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট গাজী শাহ্ আলম, আমতলী উপজেলা আ’লীগ নেতা গোলাম সরোয়ার ফোরকান, তরুণ ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক এসএম মশিউর রহমান শিহাব, সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত নিজাম উদ্দিন তালুকদারের ছেলে এলমান উদ্দিন আহম্মেদ সুহাদ ও সাবেক প্রয়াত সিদ্দিকুর রহমানের কন্যা সোহেলী পারভিন মনি। এ ছাড়াও রয়েছে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ও জেলা কমিটির সভাপতি শাহজাহান মানসুর।
অপরদিকে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন বরগুনা জেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লা, সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলহাজ মতিয়ার রহমান তালুকদার, সাবেক সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট মজিদ মল্লিক, বরগুনা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান কর্নেল (অব:) আবদুল খালেক, বরগুনা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রেজবুল কবির, তালতলী উপজেলা বিএনপি সভাপতি ও সাবেক পিপি এ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ তালুকদার ও ড্যাব নেতা ডা. খালেক নিজাম।
মহাজোটের প্রার্থীদের মধ্যে এ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ১৯৯১ সালে এ আসন থেকে প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য হন। ১৯৯৬ সালে তিনি পুননির্বাচিত হন এবং আ’লীগ সরকারের উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এ সময়ে তিনি বরগুনার ব্যাপক উন্নয়ন করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বরগুনার দৃশ্যমান উন্নয়ন তিনিই করেছেন। দল নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে তাঁর রয়েছে সুসম্পর্ক। তিনি সম্প্রীতির রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন। তাঁর সময়ে বরগুনায় তেমন কোন রাজনৈতিক হানাহানি হয়নি। ২০০১ সালে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনের কাছে হেরে যান তিনি। ২০০৮ সালে আবার নির্বাচিত হন। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, চলতি মেয়াদে তিনি আগের মতো উন্নয়ন কর্মকান্ডে ভূমিকা রাখতে পারেননি।
আলহাজ জাহাঙ্গীর কবির বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ। ছাত্রলীগ দিয়ে রাজনীতি শুরু। বর্তমানে জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক। দক্ষতার সঙ্গে র্দীর্ঘদিন ধরে এ সংগঠনটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
সাবেক সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি। ২০০১ সালে দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে এমপি নির্বাচিত হন। দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। নির্বাচিত হয়ে সংসদে তিনি আ’লীগের পক্ষে কথা বলে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার কৃপা লাভ করার চেষ্টা করেন। তাঁর রয়েছে নিবেদিত প্রাণ বেশকিছু কর্মী। তারা নিঃস্বার্থভাবে তার জন্য কাজ করেন। তার স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আবার আ’লীগে ফিরে যাওয়ায় বিষয়টি অনেক ভোটার সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। এবারও তিনি দলীয় মনোনয়ন না পেলে নির্বাচনে প্রার্থী হবেন বলে জানা গেছে। মহাজোটের অন্য প্রার্থীরা নবীন। তাদের রয়েছে ক্লিন ইমেজ।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লা। একজন সহনশীল রাজনীতিবিদ। তিনি স্পষ্টভাষী। সব সময় রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ পরিহার করার চেষ্টা করেন। তিনি দক্ষতার সঙ্গে সংগঠনের নেতৃত্ব দেয়ায় দ্বিতীয়বার তাকে সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি জোটের মনোনয়ন পেলে দলে কোন কোন্দল থাকবে না। দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী আওয়ামী লীগের আসনটি তাদের কব্জায় নিতে মরিয়া হয়ে কাজ করবেন। এমনটাই মনে করেন বিএনপির তৃণমূলের নেতৃবৃন্দ।
সাবেক সাংসদ সদস্য মতিয়ার রহমান তালুকদার জাতীয় পার্টি সরকারের সময়ে এবং পরবর্তীতে তৎকালীন বরগুনা-৩ (আমতলী-তালতলী) আসন থেকে সংদস সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানও মনোনীত হয়েছিলেন। আমতলী-তালতলীর রাস্তাঘাটের উন্নয়ন এবং তালতলী থানা প্রতিষ্ঠায় তার অবদান রয়েছে। তবে বয়সের ভারে তিনি অনেকটা ন্যুব্জ। এ আসনে বিএনপি জোটের শরিক জামায়াত অথবা খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিএনপি নেতাকর্মীরা দাবি জানিয়েছে, জেলার গুরুত্বপূর্ণ এ আসনটিতে বিএনপি থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার। তাদের দাবি জোটের শরিক দলের সাংগঠনিক কর্মকান্ড না থাকায় ওই সব দলের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলে আসনটি নিশ্চিত হাতছাড়া হয়ে যাবে।
সবকিছু মিলিয়ে আগামী নির্বাচনে এ আসনে চমক সৃষ্টি হতে পারে। আওয়ামী লীগের চেষ্টা থাকবে তাদের দীর্ঘদিনের দখলে থাকা আসনটি ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। অপরদিকে, বিএনপি প্রাণপণ চেষ্টা চালাবে আওয়ামী লীগের দুর্গে আঘাত হেনে তাঁদের প্রার্থীকে বিজয়ী করার।

বরগুনা-২ : জেলার পাথরঘাটা, বেতাগী ও বামনা উপজেলা নিয়ে জাতীয় সংসদের বরগুনা-২ আসন গঠিত। আসনটির মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত খরস্রোতা বিষখালী নদী। এ নদীটি আসনটিকে দু’ভাগে ভাগ করে রেখেছে। একপাশে পাথরঘাটা ও বামনা উপজেলা। অন্যপাশে বেতাগী উপজেলা। ভৌগোলিক কারণেই এ আসনে দলমতের পার্থক্য তেমনটা লক্ষ্যণীয় ছিল না। সবসময়ই আঞ্চলিকতার টানে বামনা-পাথরঘাটা থেকে প্রার্থীরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বারবার।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী গোলাম সবুর টুলু সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ২৬ জুলাই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। তাঁর শূন্যতায় উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শওকত হাচানুর রহমান রিমন নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী গোলাম সরোয়ার হিরুর সঙ্গে। তিনি রিমনের সঙ্গে আট হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে যান।
এ আসনে ইতোপূর্বে বিএনপি প্রার্থী নুরুল ইসলাম মনি, ইসলামী ঐক্যেজোটের প্রার্থী গোলাম সরোয়ার হিরু নির্বাচিত হয়েছেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে উপনির্বাচনে বিজয়ী শওকত হাচানুর রহমান রিমন আওয়ামী লীগের প্রার্থীতা প্রায় নিশ্চিত। বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোটের প্রার্থী কে হবেন এ নিয়ে এখনও সংশয় রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, সাবেক সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মনি ও জামায়াত নেতা ডা. সুলতান আহম্মেদ।
জানা যায়, এখানে একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মনির তৃণমূল মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। অন্যদিকে এ্যাডভোকেট মাহবুব হোসেনেরও রয়েছে ক্লিন ইমেজ। জাতীয় এ নেতা দাবি করেন, বিগত দিনের তুলনায় বর্তমানে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে অনেক শক্তিশালী ও তৃণমূলে রয়েছে তাদের ব্যাপক তৎপরতা। তিনি দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারেও শতভাগ আশাবাদী। নুরুল ইসলাম মনিও দাবি করেন জনপ্রিয়তা বিবেচনা করে দল তাকেই মনোনয়ন দেবে। অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়া হলে এ আসনটি বিএনপির আবারও হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অপরদিকে, মহাজোট তথা আওয়ামী লীগের একমাত্র সম্ভাব্য প্রার্থী শওকত হাসানুর রহমান রিমন পর্যায়ক্রমে ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এলাকায় তাঁর রয়েছে শক্ত ভিত। তাঁর নির্বাচনী ওয়াদা ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাথরঘাটায় এনে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার ঘোষণা দেয়া হবে। এটা করতে না পারলে আগামী নির্বাচনে তাঁকে জনতার তোপের মুখে পড়তে হবে। তবে যাই হোক তাঁকে মোকাবেলার জন্য আগামী নির্বাচনে বিএনপির শক্ত প্রার্থীর প্রয়োজন হবে। আওয়ামী লীগ চায় তাদের দীর্ঘদিন পরে ফিরে পাওয়া আসনটি ধরে রাখতে, আর বিএনপি চায় তাঁদের হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করতে।




