ভোলা প্রতিনিধি : বৈশাখের কাঠফাটা রোদ। তরঙ্গায়িত উত্তাল মেঘনা। মাঝ নদীতে ছোট একটি ট্রলার। শতাধিক যাত্রী আর মালামাল বোঝাই করে পাড়ি দিচ্ছে এপাড় থেকে ওপাড়ে। রোদের প্রখরতায় যাত্রীরা নেয়ে ঘেমে একাকার। এত কষ্টের মাঝেও মনে প্রবোদ পায় এই ভেবে যে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ওপাড়ে পৌছাবে। কিন্তু কালবৈশাখীর কালো মেঘ কাঁপন ধড়িয়ে দেয় যাত্রীদের মনে। এই বুঝি অনাকাঙ্খিত কালবৈশাখী ঝড় তান্ডবলীলা শুরু করবে। সব কিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে যাবে এখনই। এটাই বাস্তবতা ভোলা জেলার মূল ভূ-খন্ড থেকে বিচ্ছেন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরার অবহেলিত জনগোষ্ঠীর। মনপুরা উপজেলাটি চারদিকে নদী বেষ্টিত হওয়ায় এখান থেকে দেশের যে কোন স্থানে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম নদীপথ। আর এই উত্তাল মেঘনা পাড়ি দেয়ার জন্য যাত্রীদের সুবিধার্থে মনপুরা-তজুমদ্দিন রুটে দেয়া হয় বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃক একটি সী- ট্রাক। যা দীর্ঘ ৯ দিন যাবত যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে বন্ধ রয়েছে। ফলে শত শত যাত্রী প্রয়োজনের তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট ট্রলার দিয়ে বিশাল মেঘনা নদী পাড়ি দিচ্ছে। কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে যে কোন সময় অনাকাঙ্খিত নৌ দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভবনা রয়েছে। যার কারনে প্রতিদিন অনেক সচেতন যাত্রীরা ঘাটে এসে ফিরে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় কার্যত বিভিন্ন উপজেলা ও জেলার সাথে নৌরুটের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এপ্রিল মাসে যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে সি-ট্রাকটি ১৭দিন বন্ধ থাকার পর ২২ এপ্রিল মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌ-রুটে সি-ট্রকটি চালু হয়। ১৪দিন সি-ট্রাকটি চলার পর ফের যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে বন্ধ হয়ে যায়। ৫ মে সকাল ১০টায় সী-ট্রাকটি হাজির হাট ঘাট হতে ছেড়ে তজুমদ্দিন উপজেলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলে মেঘনার মাঝনদীতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। সেই থেকে সী-ট্রকটি অদ্যাবদী বন্ধ রয়েছে। সী-ট্রাক বন্ধ থাকায় যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের প্রসাশনিক কার্যক্রম, ব্যাংকগুলোর লেনদেন, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সর্ব স্তরেই স্থবিরতা বিরাজ করছে। সী-ট্রাক বন্ধ থাকায় আসছেনা বিভিন্ন দপ্তরের কোন কাগজপত্র, আসছেনা জেলা থেকে ব্যাংকগুলোর টাকা, আসছেনা উপজেলার অর্ধশত বাজারের ব্যাবসায়ীদের মালামাল। যার ফলে মানুষ পাচ্ছেনা নাগরিক সুবিধা, ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারছেনা গ্রহীতারা এবং বাজারে এসে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদী কিনতে পারছেনা ভোক্তারা। মনপুরার এই চিত্র দেখে মনে হয় যেন মধ্যযুগে বসবাস।
বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষের গাফলতিতে এই রুটে সী-ট্রাকটি যান্ত্রিক ত্রুটি দেখিয়ে বারবার বিকল হয়ে পড়ছে। অসংখ্য যাত্রীদের অভিযোগ, টেন্ডার পাওয়া ঠিকাদার পক্ষ এস. কে ট্রেডার্স নিজেদের সুবিধার্থে বিআইডব্লিউটিসি’র অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে আতাত করে এই রুটে অত্যাধুনিক সী-ট্রাক বাদ দিয়ে বহু পুরানো সী-ট্রাক বরাদ্ধ করে নিয়ে আসে। কখনো কখনো যান্ত্রিক ত্রুটি না থাকলেও সী-ট্রাকটি বন্ধ রেখে ট্রলার মালিকের সাথে অর্থের বিনিময়ে মেঘনায় যাত্রী পারাপারের জন্য ট্রলার চালানোর কাজে সহযোগীতা করছেন। বিআইডব্লিউটিসির কিছু কর্মকর্তার যোগ সাজসে একক আধিপত্য বিস্তার করে যাচ্ছেন এই ঠিকাদার কোস্পানী এস. কে ট্রেডার্স। সী-ট্রাক টেন্ডার পাওয়া এস.কে ট্রের্ডাসের ঠিকাদার মোঃ ভুট্টো অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে সী-ট্রাক বন্ধ রয়েছে। মেশিনটি বর্তমানে সম্পুর্ন অকেজো। বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষের বরাবর দরখাস্ত করেছি। মেশিনের নতুন যন্ত্রাংশ ঢাকা থেকে এখনও আনতে পারিনি। নতুন যন্ত্রাংশ আনান পর সী-ট্রাকের ইঞ্জিনের কাজ করে চালু করা হবে। সী-ট্রাক মাষ্টার আলী আক্কাস বলেন, এস.টি শহীদ শেখ জামাল সী-ট্রাকটির ইঞ্জিন ২টি সম্পুর্ন অকেজো হয়ে গেছে। আমরা বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। ঢাকা থেকে মেশিনের নতুন যন্ত্রাংশ এখনও এসে পৌছেনি। কবে নাগাদ সী-ট্রাক চালু হবে সে বিষয় কিছুই জানাতে পারেননি তিনি। এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবদুলাহ আল বাকী বলেন, সী-ট্রাক কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করেছি। দ্রুত মেশিনের কাজ শেষ করে সী-ট্রাক চালু করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন বলে তিনি জানান।




