ওবায়দুল ইসলাম রবি, রাজশাহী : বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপিঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। এই ২৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে সিটের সংখ্যা খুবই কম। ফলে শিক্ষার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশ হলের বাহিরে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহৎ সংখ্যাক শিক্ষার্থী হলের বাইরে অবস্থান করলেও নতুন হল নির্মানের ব্যাপারে উদাসীন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। এছাড়াও হলগুলোতে সিট নির্ধারণ করে থাকে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন। এর বাহিরে বৈধ আবাসিকতা পাওয়া শিক্ষার্থীরাও ছাত্রলীগের ভয়ে হলে উঠতে পারছে না। এ ব্যাপারে হল প্রাধ্যক্ষদের অবহিত করলেও কোন সূফল পাচ্ছেনা আবাসিক শিক্ষার্থীরা। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ হাজার শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে হলের বাইরে মেসে অথবা ভাড়া বাড়িতে অবস্থান করতে হচ্ছে। এতে দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে রাবির শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম।

সংশি¬ষ্ট সুত্রে জানাগেছে, বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮ হাজার ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়নরত আছে। আর হলের সংখ্যা ১৬টি। আবাসনের জন্য সিট আছে মাত্র আট হাজার। এই অল্প সংখ্যাক সিটে গাদাগদি করে ১০ হাজারের মত শিক্ষার্থী থাকতে পারে। এর মধ্যে ছাত্রের সংখ্যা প্রায় ২০হাজার। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬টি আবাসিক হলের ভিতরে ছাত্রদের জন্য ১১টি। মোট মিলিয়ে সিটের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। তবে ছেলেদের হলে গণরুম না থাকায়, এর বেশি শিক্ষার্থী হলে অবস্থান করতে পারেনা। বাকি ১৫ হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী বিনোদপুর, কাজলা, ধরমপুর, তালাইমারি, মেহেড়চন্ডী, কাটাখালি, ভদ্রা ছাড়াও মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে। এতে শিক্ষার্থীদের এক দিকে যেমন শিক্ষাকর্যক্রম ব্যহত হচ্ছে অপর দিকে মোটা অঙ্কের টাকা গুনা লাগে মেসে থাকার জন্য। দেখা যায়, নগরীর বিভিন্ন মেসে ও বাসায় থেকে প্রতিমাসে অতিরিক্ত ১০০০-১৫০০টাকা গুনতে হচ্ছে ছাত্রদের। এছাড়া মেসে বিভিন্ন সময়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কোন কারণ ছাড়াই মেসে পুলিশি তাল্লাশি, বিনা অপরাধে আটকের শিকার হতে হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে আসার জন্য বাস না পেলে দ্বিগুন টাকা খরচ করে ক্যাম্পাসে আসতে হয়। তাছাড়া মেস গুলোতে মান সম্মত খাবার না পওয়ায় তাদের নানান রেগে ভুগতে হয়।
নগরীর সাহেব বাজার থেকে আসা ভাষা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষাথী তারেক হোসাইন টুটুল বলেন, আমি লতিফ হলের আবাসিক ছাত্র, দুইবার আবেদন করেও সিট পায়নি। তাই বাধ্য হয়েই আমাকে শহরে থাকতে হয়। এতে করে আমার যেমন মেসে থেকে এক দিকে যেমন দ্বিগুন ভাড়া গুনতে হয়ে, অপর দিকে মান সম্মত খাবারও পাইনা।
হলসূত্রে জানা যায়, শহীদ হবিবুর রহমান হলে ৬১২ টি, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে ৫৯২ টি, মাদার বখ্শ হলে ৫৮৪ টি, বঙ্গবন্ধু হলে ৪৯৬ টি, শাহ্ মখদুম (এসএম) হলে ৪২৩ টি, আমীর আলী হলে ৪২০ টি, শামসুজ্জোহা হলে ৪০৬ টি, শের-ই-বাংলা হলে ৩০০ টি, নবাব আবদুল লতিফ হলে ৩২৫ টি মতিহার হলে ১৬৮টি এবং শহীদ জিয়াউর রহমান হলে ৫৯৮টি সিট রয়েছে। কিন্তু ছাত্র হল গুলোতে গণরুম না থাকার কারণে চার হাজার ৯২৪ সিটের বিপরীতে অতিরিক্ত ছাত্র আবাসিকতা লাভ করতে পারে না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এভাবে রাবিতে অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর দুই-তিতীয়াংশই আবাসিক হলে থাকার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
একদিকে যেমন আবাসন সংকট আছে অপর দিকে হলের সীটগুলো সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের নিয়ন্ত্রনে থাকায় দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। ফলে হলে আবাসিকতা লাভের পরেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলে উঠতে পারছেনা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসন মেধা ও জৈষ্ঠতার ভিত্তিতে সীট বরাদ্দ না দিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সুপারিশের ভিত্তিতে সিট বরাদ্দ দিচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শের-ই-বাংলা হলের শিক্ষার্থী বলেন, আমি হলে সিটের আবেদন করলেও তা গ্রহণ কারা হয়নি। কারণ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আগেই প্রাধ্যক্ষের নিকট তারা একটি লিস্ট জামা দেয়, তার ভিত্তিতে আবাসিকতা প্রদান করা হয়।
তবে বিষয়টি নিয়ে হল প্রাধ্যক্ষ জাফর সাদিকের সাথে কথা বললে বিষয়টি অস্বীকার করেন। এখানে তিনি বলেন, মেধা ও জেষ্ঠতার ভিত্তিতে আবাসিকাতা প্রদান করা হয়েছে। এখানে কোন রকম অনিয়ম হয়নি।
এছাড়া হলগুলোতে প্রতিনিয়ত ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি, হুমকি ও শিবির অখ্যায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনায় অনেক ভয়ে হল ছেড়েছে।
হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ এপ্রিল শাহ মখদুম আবাসিক হলে শিবির অখ্যায় ইসলামের ইতিহাস দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরানকে পিটিয়ে জখম করে ওই হলের ছাত্রলীগ নেতা রিনেট। পরে পুলিশ এসে এই নির্যাতিত শিক্ষার্থীকে আবার আটক করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে এই শিক্ষার্থী হল ছাড়তে বাধ্য হয়।
গত ২৬ এপ্রিল মাদার বখ্শ হল শিবিরের সভাপতি ওয়ালিউল্লাহকে হলের ১০৫ নম্বর কক্ষে রাবি ছাত্রলীগের আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক অনিক সাহা, হযরত, তরিকুল, মাসুদ নেতৃত্বে ১০-১২ জন ছাত্রলীগ ক্যাডাররা তাকে রড, হাতুরি এবং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে উপর হামলা চালায়। এসময় এলোপাথারি পেটাতে থাকে। বেধড়ক মারধরের ফলে তার ডান পায়ের হাটুর নিচের কয়েকটি অংশ ভেঙ্গে যায়।
গত ২৮ মার্চ মাদার বখ্শ হলের আব্দুল হান্নান নামের এক শিক্ষার্থীকে শিবির অখ্যায় ব্যাপক মারধরে করে তার বাম পা ভেঙ্গে দেয় ছাত্রলীগের সদস্য আব্দুল্লাহ আল বাকি। এসময় ওই শিক্ষার্থীর চিৎকার যাতে বাহিরে কেউ শুনতে না পারে সে জন্য কম্পিউটারে উচ্চ শব্দে গান বাঁজানো হয়। পরে পুলিশ এসে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়।
মার্চের ২৯ তারিখে শাহ মখদুম হলে ফাইন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের শরিফুল ইসলাম বাবু নামের এক শিক্ষার্থীকে বেধাড়গক মারধর করে । পরে পিস্তুল দেখিয়ে হুমকি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক স¤পাদক গোলাম কিবরিয়া।
গত ৩০ মার্চ চাঁদা দিতে অস্বীকর করায় বিশ্বদ্যিালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের আব্দুল মুয়িজ ও ইমরান নামের দুই শিক্ষার্থীকে হাতুরি দিয়ে পিটিয়ে মাথা থেতলে দেয় ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী ক্যাডার সালাম ও আসিফ।
শুধু শিবির আখ্যায় শিক্ষার্থীদের মারধরের পাশাপাশি হল গুলোতে ছাত্রলীগের ব্যাপক চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটেছে। এপ্রিল মাসের ১৩ তারিখে শাহ মখদুম হল ছাত্রলীগ নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রিনেট হোসেনের নেতৃত্বে সংগঠনটির ৪-৫ জন কর্মী হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের কক্ষে গিয়ে বৈশাখী পিকনিক করার কথা বলে ১০০ টাকা চাঁদা আদায় করে।
এছাড়া হলগুলোতে সিট পেলেও তাদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক সৈয়দ আমীর আলী হলের আবাসিক ছাত্র বলেন, আমি হলে সিট পেয়ে হলে উঠি, অথচ আমার কাছ থেকে জোর করে ৪০০ টাকা আদায় করে ছাত্রলীগের এক নেতা।
হলে সিট দেওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের প্রভাবের কথা স্বীকার করে রাবি ছাত্রলীগের সেক্রেটারি তৌহিদ আল তুহিন বলেন, হলে যেন শিবির ক্যাডাররা উঠতে না পারে সেজন্যই আমরা যাচাই-বাছাই করে থাকি। তবে তিনি চাঁদা আদায়ের কথা অস্বীকার করেন।
আবাসন সংকট নিয়ে রাবি প্রো-ভিসি প্রফেসর চৌধুরী সারওয়ার জাহান কথা বললে তিনি দৈনিক নতুন প্রভাতকে জানান, আমরা সরকারের কাছে শেখ হাসিনা ও শহীদ কামরুজ্জামান হল নির্মাণের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছি। আশা করছি সরকার এ ব্যাপারে দ্রæত সিদ্ধান্ত নিবে, এবং এর মাধ্যেমে শিক্ষার্থীদের কিছুটা হলেও আবাসন সংকট নিরাসন করা সম্ভব হবে।




