এম লুৎফর রহমান নরসিংদী : ২৭ ফেব্রুয়ারী ভোট গ্রহনকে সামনে রেখে ৬ জন চেয়ারম্যান ও ১৪ জন ভাইস-চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর প্রতিদ্ব›দ্বীতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে শিবপুর উপজেলা পরিষদের নির্বাচনী প্রচারনা। এরমধ্যে শুধু বিএনপি শিবিরেই প্রার্থী রয়েছে ৩ জন, পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি দিয়েছে একক প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন একজন। বিএনপি শিবিরের প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মান্নান ভূইয়া পরিষদের আহবায়ক আবুল হারিছ রিকাবদার, সদস্য সচিব আরিফুল ইসলাম মৃধা, এবং যুগ্ম আহবায়ক তোফাজ্জল হোসেন। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হচ্ছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুন অর রশিদ খান, জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী হচ্ছেন ওমর ফারুক মোল্লা, এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন বিল্লাল হোসেন ফিরুজ।

শিবপুর উপজেলা পরিষদের অতীত হচ্ছে এখানে বিএনপি কোন সময়ই সুবিধা করতে পারেনি। প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন, তৎকালীন জাতীয় পার্টির নেতা আলহাজ্ব ফজলুর রহমান ফটিক মাস্টার, দ্বিতীয় নির্বাচনে চেয়ারম্যান হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা হারুন অর রশিদ খান, তৃতীয় অর্থাৎ শেষবার চেয়ারম্যান হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা ফটিক মাস্টার।
এবছর কে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন তা নিশ্চিত করে বলতে না পাড়লেও সচেতন ভোটারদের মতে অনেকের কারনে বিএনপি শিবিরের অবস্থা ভাল বলার সুযোগ নেই। প্রকৃত পক্ষে এখানে বিএনপির কোন প্রার্থীও নেই। বিএনপি শিবিরের যাদেরকে বলা হচ্ছে তারা সবাই বিএনপির বহিস্কৃত তৎকালীন সাবেক মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূইয়ার সমর্থক। বিএনপির কোন প্রার্থী না থাকায় জেলা বিএনপি মান্নান ভূইয়া পরিষদের নেতা যোশর ইউপি চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেনকে মনোনয়ন দিয়েছেন। বিএনপি শিবিরের এই অনৈক্যকে কাজে লাগাবার মওকা পেয়েছে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হারুন অর রশিদ খান। গত ১৯ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত পলাশ ও বেলাব উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মূলত বিএনপির কোন প্রার্থী বিজয়ী হয়নি। পলাশ উপজেলায় বিএনপি শিবিরের একাধিক প্রার্থী থাকায় সেখানে স্বল্প সংখ্যক ভোটে জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ প্রার্থী। বেলাব উপজেলায় বিএনপি আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মধ্যে কোন প্রতিদ্ব›দ্বীতাই হয়নি। সংস্কার বাদী নেতা সাবেক এমপি সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের মনোনীত প্রার্থী আহসান হাবিব বিপ্লব ১১ হাজার ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করেছে। এই অবস্থায় বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছে বিএনপিকে আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারী আরেকটি পরাজয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এখানে মান্নান ভূইয়া পরিষদের অবস্থা যেমন তেমনই বিএনপির অবস্থাও। তবে শিবপুরের আম রাজনীতিকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন শিবপুরের রাজনীতি বড়ই কঠিন। উপজেলা নির্বাচন সাধারনত আওয়ামী লীগ বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মধ্যে হলেও এখানে বহু মাত্রিক দ্বান্ধিকতা কাজ করছে। বিএনপি তথা বিএনপি শিবিরের প্রার্থীদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগের নেগেটিভ ভোট পাবে। আবার আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিএনপির একটি অংশের নেগেটিভ ভোট পাবে। আবার জাতীয় পার্টির ভোটারদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা ঘটতে পারে। এ ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানশীপের শিকা কার ভাগ্যে ছিড়বে তা বলা কঠিন । মান্নান ভূইয়া পরিষদের আহবায়ক আবুল হারিছ রিকাবদার ওরফে কালা মিয়া ছিলেন মান্নান ভূইয়া একনিষ্ঠ বন্ধু। বিএনপি শাসনামলে তাকে অনেকে সেকেন্ড মিনিস্টার বলে সংম্ভোধন করতো। মান্নান ভূইয়ার অনুপস্থিতিতে নরসিংদী জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে পরিচালনা করতেন আবুল হারিছ রিকাবদার ওরফে কালা মিয়া। এই কালা মিয়ার সমালোচকদের মতে তিনি মান্নান ভূইয়ার নেতৃত্ব ও মন্ত্রীত্বের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারী হচ্ছেন কালা মিয়া। তিনি মান্নান ভূইয়া বদৌলতে নিজের ছেলে মেয়েদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অর্জন করেছেন বিপুল বিত্ত বৈভব। মান্নান মৃত্যুর পর তিনি তার অনুসারীদেরকে মান্নান ভূইয়া পরিষদের ব্যনারে সংঘবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করছেন। এবারের নির্বাচনে তিনি মান্নান ভূইয়ার কর্মীদেরকে কাজে লাগিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান হবার চেষ্টা চালাচ্ছেন। পাশাপাশি প্রায় একই সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন মান্নান ভূইয়ার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং মান্নান ভূইয়া পরিষদের সদস্য সচিব আরিফুল ইসলাম মৃধা। তিনিও মান্নান পরিষদের ব্যানারে মান্নান ভূইয়ার কর্মীদের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এবার তিনিও মান্নান ভূইয়া কর্মীদেরকে নিয়েই নির্বাচনী বৈতরনী পার হবার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে তার পিছনে আওয়ামী লীগের একটি বিশাল অংশের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে বলে জানা গেছে। বিএনপির প্রার্থী যোশর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেনও মান্নান ভূইয়ার একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। তিনিও মান্নান ভূইয়া পরিষদের একজন নেতা। শিবপুরে বিএনপির কোন প্রার্থী না থাকায় তার কপাল খুলে গেছে। নরসিংদী জেলা বিএনপি ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’ এই তত্তের ভিত্তিতে তোফাজ্জল হোসেনকে মনোনয়ন দিয়েছে। তোফাজ্জল হোসেনও শুধু মান্নান ভূইয়ার কর্মীদেরকে দিয়ে নির্বাচনী বৈতরনী পার হওয়া সম্ভব নয় ভেবে জেলা বিএনপির সমর্থন নিয়ে মাঠে নেমেছেন। বিএনপি শিবিরের অভ্যন্তরে এই ত্রিমুখী লড়াই’র সুযোগ কাজে লাগাবার চেষ্টায় আটঘাট বেধে মাঠে নেমেছেন আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ খান। তিনি আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হলেও দলের ভিতর রয়েছে বড় বড় বিভক্তি। তার সমালোচকরা বলছে হারুন অর রশিদ যে কার তা বলা বা বুঝা কঠিন। তিনি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে মাঠে ময়দানে সাবেক এমপি জহিরুল হক মোহনের দুর্নীতির কথা প্রকাশ্যে বলে বেরিয়েছেন। কিন্তু মোহন সাহেব পূনরায় দল থেকে মনোনয়ন পাবার পর তিনি আবার এই মোহনের পক্ষেই প্রকাশ্যে নির্বাচন করেছেন। নির্বাচনে সিরাজুল ইসলাম মোল্লা জয়ী হবার পর আবার মোহনের সমর্থকরাই বলে বেড়াচ্ছেন হারুন অর রশিদ খান, সিরাজ মোল্লার পক্ষে কাজ করেছেন। এই অবস্থায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হয়ে তিনি খুব একটা সুবিধায় আছেন বলে বলার সুযোগ নেই। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ায় বাহ্যতঃ সকল নেতাকর্মীদেরকেই তার পক্ষে মনে হলেও অনেকেই তার পক্ষে নেই। কিন্তু সেটা ভোটের আগে বুঝা সম্ভব নয়। তবে রাজনৈতিক ও মাঠের দ্বান্ধিকতায় তিনি সবচেয়ে ভাল অবস্থায় রয়েছেন। তিনিও তার সমর্থকগন তার বিজয়ের ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। ভাল অবস্থার দাবী করছেন মান্নান ভুইয়া পরিষদের সদস্য সচিব আরিফুল ইসলাম মৃধাও। তার অনুসারীরা বলছেন, আরিফুল ইসলাম মৃধা একজন ভাল ও গতিশীল নেতা। তিনি সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আরিফ মৃধাও নির্বাচিত হবার আশা পোষন করেন। এছাড়া বিএনপির প্রার্থী তোফাজ্জল হোসেন বিজয়ের আশায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের একক সমর্থন যদি তিনি পান তবে তিনিও তার বিজয়ের ব্যপারে খুবই আশাবাদী।




