হাকিম বাবুল :
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট। তবে এ সমস্যার কার্যকর ও পরীক্ষিত সমাধান রয়েছে যা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অধিকাংশ মৃত্যুই প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে এসব উদ্যোগকে টেকসই করতে প্রয়োজন নীতিগত ধারাবাহিকতা, সরকারি অঙ্গীকার এবং গণমাধ্যমের আরও সক্রিয় ভূমিকা। তাই শিশু সুরক্ষা, প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ এবং পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের মতো জনস্বার্থের বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক, তথ্যনির্ভর ও সমাধানমুখী সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম নীতিনির্ধারকরা।

পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধসহ শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের গণমাধ্যম নীতিনির্ধারক ও গেটকিপারদের সঙ্গে এক পরামর্শসভায় এসব মতামত উঠে আসে। আন্তর্জাতিক সংস্থা সিনারগোস-এর সহযোগিতায় গণমাধ্যম ও যোগাযোগবিষয়ক উন্নয়ন সংগঠন সমষ্টি এ সভার আয়োজন করে। রাজধানীর একটি হোটেলে ২৯ জুন সোমবার এ পরামর্শ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
সমষ্টির নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুরুজ্জামানের সঞ্চালনায় পরামর্শসভায় অংশ নেওয়া সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চর্চার সোহরাব হাসান, আগামীর সময়ের সাইদুজ্জামান রওশন, ঢাকা ট্রিবিউনের রিয়াজ আহমদ, এটিএন নিউজের শহিদুল আজম, বাংলাভিশনের সালমা ইয়াসমিন, লিটন হায়দার, দীপ্ত টিভির এস এম আকাশ, মানবজমিনের কাজল ঘোষ, একাত্তর টিভির শাহনাজ শারমীন, প্রথম আলোর পার্থ শংকর সাহাসহ অন্যরা। তাঁরা পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনাকে কেবল দুর্ঘটনার সংবাদ হিসেবে প্রকাশ না করে সমস্যার কারণ, কার্যকর সমাধান, সফল উদ্যোগ এবং নীতিগত প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আরও বেশি অনুসন্ধানী ও সমাধানমুখী প্রতিবেদন প্রকাশের ওপর জোর দেন। এ ধরনের সাংবাদিকতা জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মত দেন তাঁরা।

পরামর্শসভায় আরো বক্তব্য রাখেন সিনারগোস-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর এশা হুসাইন ও কর্মকর্তা রিজওয়ানুল হক খান। সভায় জানানো হয়, দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কমিউনিটি চাইল্ড কেয়ার সেন্টার এবং বড় শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণের মতো গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ এ ধরনের মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে এসব কেন্দ্র শিশুদের ভাষা, মানসিক ও সামাজিক বিকাশ, বিদ্যালয়ের প্রস্তুতি এবং নিরাপদ বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৬ জেলায় বাস্তবায়িত প্রকল্পের প্রথম পর্যায় শেষ হয় গত বছরের ডিসেম্বরে। অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা নতুন প্রকল্প প্রস্তাবে ৩০ জেলার ৭৯ উপজেলায় কার্যক্রম সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বক্তারা প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার সুপারিশ করেন।
চর্চা ডট কমের সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, ’প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন দিয়ে খুব বেশি দূর এগোনো যাবে না। এটিকে স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ, নারী, তরুণ এবং গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে স্থায়ী উদ্যোগে পরিণত করতে হবে। যেসব এলাকায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেশি, সেখানে আরও বেশি কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যমকে সরকারকে বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে, যেন এ ধরনের কার্যকর উদ্যোগ কোনোভাবেই থেমে না যায়।’
সিনারগোস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এশা হুসাইন বলেন, আগে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুকে অনেকেই ভাগ্যের বিষয় বলে মনে করতেন। কিন্তু গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ছোট শিশুদের নিরাপদ তত্ত্বাবধান এবং বয়সভিত্তিক সাঁতার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অধিকাংশ মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। সেই গবেষণার ভিত্তিতেই সরকারের নেতৃত্বে কর্মসূচির সম্প্রসারণ শুরু হয়। তিনি বলেন, ’এটি শুধু জীবন রক্ষার প্রকল্প নয়, এটি একটি জাতি গঠন প্রকল্প। এক থেকে পাঁচ বছর বয়সে শিশুর নিরাপত্তা, পুষ্টি, শেখা ও বিকাশ নিশ্চিত করা গেলে তার সুফল পুরো সমাজ পায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভালো উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবর্তন এলেই অনেক সময় কার্যকর উদ্যোগ থমকে যায়। কিন্তু তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সংবাদ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে ইতিবাচক চাপ তৈরি করে এবং কার্যকর উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে।’
মীর মাসরুরুজ্জামান বলেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শিশুদের হাত ধরে। তাই শিশুদের সুরক্ষা ও বিকাশ নিশ্চিত করা কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং টেকসই রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়নে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
বক্তারা আরও বলেন, শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ কেবল একটি স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই শিশু সুরক্ষা, প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ এবং কেয়ার ইকোনমির মতো বিষয়গুলোকে জাতীয় উন্নয়ন আলোচনার অংশ হিসেবে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।




