বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একযোগে কাজ করার জন্য চীন ও মালয়েশিয়া ঐকমত্য পোষণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।তিনি বলেন, ‘আমরা অভিভূত হয়েছি যেভাবে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারপ্রধানকে সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়া হয়েছে, লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে—এটি শুধু প্রধানমন্ত্রীর জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল গৌরবের বিষয়। যখন একজন সরকারপ্রধানের ক্ষমতার উৎস হয় জনগণ, তখন কীভাবে সেই সম্মান এবং আত্মমর্যাদা বিশ্ব দরবারে ফুটে ওঠে, আমরা সেটি দেখেছি।’ ২৬ জুন শুক্রবার রাতে মালয়েশিয়া ও চীন সফর থেকে ফিরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন ও মালয়েশিয়া সফর শেষে রাত ৭টা ৪৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীরাও একই ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানান সরকারের মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্য, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ ছাড়া, বিএনপির সিনিয়র নেতারা বিমানবন্দরে দলীয় প্রধানকে স্বাগত জানান।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুব সংক্ষিপ্ত বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন। এখানে তিনটি পর্ব ছিল। প্রথম পর্বে তিনি মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন; সেখানকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং রাজার সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তারপর চীনের ডালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অধিবেশনে যোগদান করেছিলেন; সেখানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট এবং সিইওসহ বেশ কিছু বিনিয়োগকারীর (ইনভেস্টর) সঙ্গে কথা বলেছেন। পরে চীনের প্রধানমন্ত্রীর (প্রিমিয়ার) আমন্ত্রণে দেশটির রাজধানী বেইজিংয়ে গিয়ে সেখানে চীনের প্রিমিয়ার ও রাষ্ট্রপতির (প্রেসিডেন্ট) পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

মাহদী আমিন বলেন, ‘আপনাদের অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, মালয়েশিয়া এবং চীন— দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার রাজা ও প্রধানমন্ত্রী এবং চীনের প্রিমিয়ার ও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগ কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, বাণিজ্যের প্রসার কীভাবে করা যায়, কর্মসংস্থান কীভাবে সৃষ্টি করা যায়, পিপল-টু-পিপল কানেক্টিভিটি অর্থাৎ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কালচার, মিডিয়া— প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিন্তু দুই দেশের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় কীভাবে মালয়েশিয়া এবং চীন ভূমিকা রাখতে পারে, সেগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, দুটি দেশের সঙ্গেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। আমরা খুব আশ্বস্ত হয়েছি দেখে যে, মালয়েশিয়া এবং চীন দুই দেশেরই সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধান যারা রয়েছেন, তারা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সেই অনবদ্য, অসাধারণ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, স্মরণ করেছেন।
মাহদী আমিন বলেন, আজকের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে অদম্য অগ্রযাত্রা রয়েছে, আন্তর্জাতিক সেই স্বীকৃতি সেটিকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শুধু যে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন কিংবা শুধু যে খুব আন্তরিকভাবে তাকে বরণ করা হয়েছে তাই না, আমরা দেখছি চীনের যে সম্পর্ক বাংলাদেশের সঙ্গে, সেই সম্পর্ককে তিনি দ্বিপাক্ষিকভাবে একটা বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছেন; যাকে আমরা বলছি ‘লং-টার্ম স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের একটা প্রসার। যেটার মূল ভিত্তি হবে কৌশল এবং অবশ্যই আমরা এর মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানসহ দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একযোগে কাজ করব।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং চীন ও মালয়েশিয়ার সরকারপ্রধান যারা রয়েছেন, তাদের মাঝে যে উষ্ণ সম্পর্ক আমরা দেখেছি, যে আন্তরিকতা আমরা দেখেছি, ইনশাআল্লাহ সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে সেগুলো অনেক বড় ভূমিকা রাখবে।
বিমানবন্দরে বিএনপি নেতাকর্মীদের না আসা প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, আজকে আমরা দেখেছি এখানে কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর পূর্ব নির্দেশনা অনুযায়ী দলীয় কোনো নেতাকর্মী আসেননি। কোনো র্যালি বা সমাবেশ করতে মানা করা হয়েছিল। এই যে একটা নতুন ধরনের রাজনীতি, এই যে একটা ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তা, সেটিরই বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক হয়েছে, সেখানে দুটি দেশেরই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ছিল। পরে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রী একান্তে বৈঠক করেছেন। তাদের মাঝে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেকগুলো বিষয় উঠে এসেছে এবং স্বাভাবিকভাবেই চীনের রাষ্ট্রপতি খুব প্রশংসা করেছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার।
তিনি বলেন, ‘চীনের রাষ্ট্রপতি বর্তমানে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য অদম্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে চীন অবশ্যই বাংলাদেশের পাশে থাকবে, বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে এবং বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একযোগে কাজ করার জন্য ইতোমধ্যে দুই পক্ষই ঐকমত্য পোষণ করেছে।’
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে মাহদী আমিন বলেন, ‘দেখুন, এটা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে না, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাদের অভ্যন্তরীণ যে নীতিমালা রয়েছে, সেই ইন্টারনাল প্রসিডিউর ফলো করার পর যদি কোনো দেশের মার্কেট ওপেন করা হয়, তবে বাংলাদেশকে ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ করা হবে, প্রায়োরিটি দেওয়া হবে। বাংলাদেশের এটি একটি অন্যতম স্বার্থের জায়গা; সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর একান্তে কথা হয়েছে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এবং তার আলোকে ডেফিনেটলি আমাদের যে চাওয়াগুলো রয়েছে, তারা ফাস্ট ট্র্যাকে যতটা আন্তরিকতার সঙ্গে, যতটা সহমর্মিতার সঙ্গে সম্ভব সেটাকে প্রসিড করার চেষ্টা করবেন ইনশাআল্লাহ।’
চীনের করিডোরের প্রস্তাবনা নিয়ে সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, ‘অবশ্যই আমরা চাই ব্যবসার প্রসার হোক, বাণিজ্যের প্রসার হোক। তাহলে বাংলাদেশে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন হবে, নতুন ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হবে, ট্রেড ভলিউম বাড়বে। সুতরাং আমরা একে ইতিবাচকভাবে দেখছি। এখনো তো এটার ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হয়নি, প্ল্যানিং স্টেজে যাবে এবং ফিজিবিলিটি অ্যানালাইসিস করা হবে। কিন্তু সাধারণত আমরা তো চাই শুধু নির্দিষ্ট কোনো দেশ না, এর মাধ্যমে সাউথ-ইস্টের অন্যান্য দেশের প্রতি মার্কেটের একটা সুযোগ তৈরি হবে, এশিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। সুতরাং অবশ্যই এটা আমরা ইতিবাচকভাবে নিচ্ছি। সামনের দিনগুলোর জন্য এটা একটা বিশাল মহাপরিকল্পনা, সেটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা ও আলোচনা করা হবে।’
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবদুল্লাহ এম ছালেহ (সালেহ শিবলী), অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি ও শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন।




