ads

মঙ্গলবার , ১২ এপ্রিল ২০২২ | ১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  1. ENGLISH
  2. অনিয়ম-দুর্নীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আমাদের ব্লগ
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. ইসলাম
  8. উন্নয়ন-অগ্রগতি
  9. এক্সক্লুসিভ
  10. কৃষি ও কৃষক
  11. ক্রাইম
  12. খেলাধুলা
  13. খেলার খবর
  14. চাকরির খবর
  15. জাতীয় সংবাদ

বাংলা নববর্ষের অঙ্গীকার

তালাত মাহমুদ
এপ্রিল ১২, ২০২২ ৮:৪৫ অপরাহ্ণ

বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সবকিছুই আঙ্কিক নিয়মে আবর্তিত হয়। নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটলেই ফল হয় তার উল্টো। তখন সাজানো গোছানো আয়োজন আর সব পরিপাটিই এলোমেলো হয়ে যায়। সৃষ্টি করে বিতর্ক বিসম্বাদের। অথচ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি পুরোনোকে বিদায় দিয়ে নতুনকে স্বাগত জানানো। আর এটাই প্রকৃতির খেলা। প্রকৃতির এই খেলার মধ্যেই কেটে যায় আমাদের জীবনের যাপিত বেলা। নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে আমরা সভ্যতার উত্তরণ ঘটাই আর তার উৎকর্ষ সাধন করি। ইতিহাসের পাতায় রেখে যাই সাফল্যের কীর্তিগাঁথা। আবার কেউ বা রেখে যায় ব্যর্থতার কলঙ্কগাঁথা। বাঙালির নাড়ির সম্পর্কের টানে তাই বারবার ফিরে আসে আমাদের প্রতিটি জাতীয় উৎসব। বাংলা শুভ নববর্ষ সেই উৎসব সমূহেরই অন্যতম একটি।

Shamol Bangla Ads

চৈনিক ‘বঙ’ শব্দ থেকে বাংলা শব্দের উৎপত্তি। ‘বঙ’ শব্দের অর্থ জলাশয়। এককালে হাওর-বাওর, খাল-বিল, নদী-নালায় ভরপুর ছিল আজকের এই বাংলাদেশ। হিমালয়ের মানস সরোবর থেকে যেমন ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তি এবং বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অন্যান্য নদী অববাহিকার সাথে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। তেমনি গঙ্গা, বুড়িগঙ্গা, কপোতাক্ষ, পদ্মা, মেঘনা, তিস্তা ও যমুনার মত অসংখ্য খরস্রোতা নদী, উপ-নদীর স্রোতাধারার সাথে উজান থেকে বয়ে নিয়ে আসা পলিমাটি আর পাহাড়ের লাল মাটির নির্যাসে এই অঞ্চলের নিম্নাঞ্চল ভরাট করে তোলে। অত:পর হাজার হাজার বছরের ব্যবধানে বঙ্গোপোসাগরের তলদেশ থেকে ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ জলাভূমির ভূ-ভাগÑঅর্থাৎ ‘বাংলাদেশ’ নামক এই ব-দ্বীপ।

তারপর দেশী বিদেশী পর্যটক, বণিক আর বহিরাগত আগ্রাসী শক্তির মানুষের আগমন উপস্থিতিতে নানা ধর্মের বর্ণের গোত্রের ও শ্রেণি-পেশার মানুষের যৌথ প্রক্রিয়ায় এদেশে বসতি গড়ে উঠে। মূলতঃ ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেই ভিনদেশী মানুষের এদেশে আগমন ঘটে এবং এ অঞ্চলে বা ভূ-খন্ডে ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রাকৃতিক রূপ, শোভা, সৌন্দর্য আর অনুকূল আবহাওয়া ও পরিবেশ তাদেরকে বসতি স্থাপন করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং ভীণদেশী শাসকরা শুধু প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের মনোলোভা মাৎসর্য্যে আপ্লুত হয়েই তারা তাদের অধিকৃত এলাকাসমূহে বসতি স্থাপন সহ নিজস্ব পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থার প্রচলন করেন। প্রাক-সনাতনী ব্যবস্থায় পর্যায়ক্রমে স্থান লাভ করে বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্মের। কালক্রমে ভারতবর্ষে সনাতন বা হিন্দু ধর্ম সহ বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষার প্রচলন হয়।

Shamol Bangla Ads

ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটে সপ্তম শতাাব্দী থেকে। আরব জাহান থেকে বিভিন্ন অলি, আউলিয়া,তথা বুজুর্গ ব্যক্তিবর্গ ইসলাম প্রচারের জন্য ভারতবর্ষে আগমন করেন এবং বঙ্গদেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বা প্রভিন্সিয়ালে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বাণিজ্য করতে এসেও অনেক ভীনদেশী বণিক এদেশের উর্বর পলিমাটি, চমৎকার আবহাওয়া, অনুকূল পরিবেশ, সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলে ভরপুর এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ভীনদেশীরা এই বঙ্গদেশেই স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। এদেশের আদি বাসিন্দা আর্য্য, দ্রাবিড় ও মোঙ্গলীয় জাতি গোষ্ঠীর লোকজন যেমন আজও আছে তেমনি ভীনদেশী বিভিন্ন ধর্মের ও জাতি গোষ্ঠীর মানুষের উত্তরাধিকারীরাও আছে।
সঙ্গতঃ কারণেই আমাদের দেশের মানুষ বিভিন্ন কৃষ্টি ও সভ্যতার আলোকে উদ্ভাসিত। এই নাতিশীতোষ্ণ বাংলাদেশের মানুষ শুরু থেকেই ধর্মভীরু। ধর্মীয় আচার আচরণেও এদেশের মানুষ যেমন জাতিগতভাবে আন্তরিক, সংবেদনশীল ও অতিথিপরায়ণ তেমনি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্ট্রান ইত্যাদি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্ম পালনের রীতি-পদ্ধতিও ভিন্ন ভিন্ন ধারায় বিদ্যমান। বছরের বারোমাসে তেরো পার্বণ নিয়ে এদেশের মানুষ হর-হামেশাই ব্যস্ততার মধ্যে কালাতিপাত করে। কিন্তু হালে নানা কারণে এসব কিছুর ব্যতিক্রম ঘটছে। সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অসংগঠিত ও অবিন্যস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরনির্ভরশীলতা এর অন্যতম কারণ বলা যায়। এসবের মূলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির অভাবকে দায়ী করা যায়।

প্রকৃত অর্থে সম্রাট আকবরের শাসনামল থেকে বাংলা সাল প্রচলিত হয়। কাকতালীয়ভাবে মিলে যাওয়া সম্রাট আকবরের তারিখ-ই-ইলাহী ৯৬৩ হিজরী থেকে সৌর দিবসের মাধ্যমে যে বাংলা সালের গণনার যাত্রা শুরু সেই বাংলা সালের নববর্ষ পহেলা বৈশাখ থেকে সূচনা হয়েছিল কৃষক-প্রজাদের নিকট থেকে বকেয়া খাজনা আদায়ের কার্যক্রম। প্রজা সাধারণের বিনোদনের জন্য প্রচলন হয়েছিল গান-বাজনা ও নানা আয়োজন অনুষ্ঠানের। কালক্রমে তা বাঙ্গালির ঐতিহ্যপূর্ণ সংস্কৃতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। পূরনো দিনের ক্লান্তি আর অবসাদ ধুয়ে মুছে নতুনের আস্বাদন লাভের ব্রত নিয়ে আমাদের মাঝে প্রতিবছর ফিরে আসে শুভ নববর্ষ ও পহেলা বৈশাখ।

আমাদের সমাজে ইংরেজী সালের বহুল ব্যবহার থাকলেও ধর্মীয় মাসের ব্যবহারও বিদ্যমান রয়েছে। তবে যে কোন শুভ কাজে বাংলা সালের ব্যবহারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিবাহ, খাতনা, গৃহনির্মাণ, নবান্ন উৎসব তথা পান্তা-ইলিশ, শুটকি ভর্ত্তা খাওয়া, মেলায় যাওয়া, খেলাধূলায় আনন্দ উপভোগ করাসহ বিভিন্ন পূজা পার্বণ ইত্যাদি বিষয়ে বাংলা সালের, মাসের বা দিনের ব্যবহার সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়ে থাকে। বাংলা নববর্ষের সূচনা লগ্নে যেমন বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে তেমনি কোন কোন ধর্মীয় সম্প্রদায় এই শুভ দিনটিকে অত্যন্ত পূণ্যের ও পরিত্রাণেরও দিন মনে করে থাকে। বিদায়ী বছরের চাওয়া-পাওয়ার হিসেব নিকেশ চুকিয়ে ব্যবসায়ীরা নতুন করে শুভ মহররত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। শুভ হালখাতা এর অন্যতম উদাহরণ।

বিগত বছরের ক্লান্তি আর অবসাদকে মুছে ফেলে নতুন বছরে যাতে সুখ আর সমৃদ্ধির সোনালী দিগন্ত উন্মোচিত হয় সেই প্রত্যাশায় বর্ষবরণ বন্দনা গীত হয় এবং আবহমানকাল ধরেই মানুষ চিত্ত-বিনোদনের জন্য নানা অনুষ্ঠান ও মেলার আয়োজন করে আসছে। জারি, সারি, ভাওয়াইয়া, পালাগান, ঘোড়াদৌঁড়, ষাঁড়ের লড়াই, পুতুল নাচ এবং নানা পণ্যসামগ্রী কেনাবেচার জন্য বিশেষ মেলার আয়োজন করা হয়। মৃৎ-শিল্পের বৈচিত্র্যপূর্ণ হাট বসে গ্রামে-গঞ্জে ও শহরের মেলাগুলোতে। ঈদ বা পূজা পার্বণের মতই সার্বজনীন বাংলা শুভ নববর্ষের প্রথম দিনটিকেই অত্যন্ত আদর সোহাগ আর আনন্দাবেগে বরণ করে নেয় এই জাতি। রাজধানী ঢাকার রমনা বটমূল থেকে সারাবাংলার কোথাও বাদ যায় না বর্ষবরণের পালা। পান্তা খাওয়া আর রং মেখে সং সেজে আনন্দ মিছিল ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা মুহুর্তের জন্য হলেও মানুষকে অনাবিল আনন্দ দিতে সহায়তা করে থাকে।

কবি বলেছেনÑ‘নব নবীনের গাহি জয়গান/এসো হে এসো হে/এসো হে নতুন’। পল্লীর বাউল এখন নগর বাউলের রূপ নিয়েছে। তাই শহরের রঙ্গ মঞ্চে পরিবেশিত নগর বাউলের গানে এখন বিদেশী সংস্কৃতির ছড়াছড়ি। গ্রামের বাউল শিল্পী ও বয়াতীদের কদর ফুরিয়ে গেছে। গ্রামীণ বৈশাখী মেলা এখন শহরের কাচারী মাঠে আর নগরের রমনা বটমূলে শোভা পায়। গ্রামের সাধারণ মানুষের রক্তচোষা এক শ্রেণীর শহুরে ধনাঢ্য ব্যক্তি শুধু এইদিন খদ্দরের পাঞ্জাবী গায়ে জড়িয়ে খাঁটি বাঙালি সেজে মেলায় যায় আর লাখ টাকার ইলিশ পান্তাভাতে মাখিয়ে খায়। এটা বাংলা নব-বর্ষকে অপমান করা ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ সারাবছর এরা বিদেশী সংস্কৃতিতে ডুবে হাবুডুবু খায়। গ্রাম থেকে উঠে আসা এইসব ছেচ্চরদের পূর্ব ইতিহাস ঘাটলে এদের আসল পরিচয়ের দুর্গন্ধ বেরিয়ে আসবে।

এককালে বাংলার মানুষের ঘরে গোলাভরা ধান ছিল, পুকুর ভরা মাছ ছিল আর গোয়াল ভরা গরু ছিল, সেই সব মানুষের সংসারে আজ দারিদ্র্যের হাহাকার, ক্ষুধার অনলে দাউ দাউ করে জ্বলছে ভূখা-নাঙ্গা মানুষের পেট। জ্বলে পুড়ে ছাই করে দিচ্ছে আমাদের সুকমার সুক্ষ্মবৃত্তি, চেতনা-চিৎপ্রকর্ষ আর উৎসাহ উদ্দীপনার প্রসূন। আবহমান বাংলার শাশ্বত আবেদন নিয়ে যে নববর্ষ আমাদের দ্বার প্রান্তে এসে হাজির হয়। লজ্জায় আর অপমানে নীরবেই ফিরে যায় শুভ পয়লা বৈশাখ। প্রতিবছর আমরা কেবল আমাদের ভাগ্য পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেই ক্ষান্ত থাকি। কিন্তু ভাগ্যের পরিবর্তন আমাদের ঘটে না। আজকের বৈশাখী মেলার ঝুরি-জিলেপী বুঝি বা আগের মত নয়। এদিনে মানুষের বাড়ি বাড়ি যেভাবে আনন্দের ঢল নামতো; সেটাও আজ অনেকের কাছেই স্মৃতিময় উচ্ছ্বাস!
সমস্যা জর্জরিত ও দারিদ্র্য পীড়িত অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফুটানো আজ সচেতন সমাজের সবচে’ বড় কর্তব্য। এই কর্তব্য পালনে ফলিত ভূমিকা পালন সকলের জন্যই কর্তব্য বলে মনে করি। আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানকৃত অভীক্ষা রচনা করে এদেশের মানুষের হারানো ঐতিহ্য পূণরুদ্ধার করতে নির্বিশেষে সকল মহলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। জারি, সারি, যাত্রা, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, পালাগান, লোকজ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি তথা লাঠিখেলা, কাবাডি, হাডুডু, দাঁড়িয়াবান্দা, ষাড়েঁর লড়াই, ঘোড়াদৌঁড় আর পুঁথিপাঠ, কিচ্ছা কাহিনী বা বাউল গানের যে সুর চারদিকে অনুরণিত হতোÑ আজ সে সুরের ঝংকার নেই। অথচ এগুলোই আমাদের পল্লী সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। গ্রাম-বাংলার মানুষের আনন্দের একমাত্র অবলম্বন।

যুগ-যন্ত্র-জ্বালায় জর্জরিত এ জাতি অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অবক্ষয় তথা দ্রব্যমুল্যের উর্দ্বগতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বেকারত্ব, সন্ত্রাস, স্থবিরতা, ঘুষ-দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতা ইত্যাদি জটিল উপসর্গের কারণে পরিকল্পিত জাতীয় উন্নয়ন আজ সুদূর পরাহত। বৈরী পারিপার্শি¦কতায় দেশাত্মবোধ, মায়া-মমতা, আন্তরিকতা আর সংবেদনশীলতা লোপ পেতে বসেছে। আমাদের কোমল অনুভূতিগুলো হিমায়িত করে ফেলা হচ্ছে। বহিঃশত্রুর অপ-তৎপরতা তো রয়েছেই। এসবের পরেও সরকার সরকারি চাকুরেদের জন্য প্রতিবছর নববর্ষের উৎসব বোনাস প্রবর্তন করেছে। তবে কৃষক শ্রমিক মজুরের জন্য নয়। কোন শিক্ষিত অশিক্ষিত বেকারের জন্যও নয়। তারপরও শুভ নববর্ষে আমাদের প্রার্থনা হোক সুখ-শান্তি-আনন্দ ও সমৃদ্ধির। জাতির ঐক্য অটুট থাকুক।

লেখক : সিনিয়র কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, শেরপুর।

Need Ads
error: কপি হবে না!