আলোচক : তালাত মাহমুদ
স্মৃতির পাতা থেকে (কাব্যগ্রন্থ), ফডু হাফিজ, প্রকাশকাল: জুন, ২০১৭, মূদ্রণে: এম অফসেট প্রিন্টার্স, মুন্সীবাজার, শেরপুর। পৃষ্ঠা- ১৫০, মূল্য- ২৫০ টাকা।

নিভৃতচারী ও প্রচারবিমুখ কবি ফডু হাফিজের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ সম্প্রতি আমার হাতে এসেছে। কাব্যগ্রন্থে সর্বমোট ১০০টি কবিতা রয়েছে। কবি ফডু হাফিজের প্রাথমিক জীবন থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত রচিত কবিতাসমূহ থেকে এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। কবিতাগুলো অনেকটাই কাহিনী কবিতার মত। গ্রামীণ আবহে চিরাচরিত রীতিতে বিধৃত কবিতাগুলো অনেকাংশে পল্লীকবি জসিমউদ্দিনের স্টাইলে রচিত।
আমরা তো এখন আর আবহমান বাংলার কথা ভাবিনা, গ্রামীণ জীবন, গ্রামীণ অর্থনীতি, গ্রামীণ নারীর সুখ-দুঃখের কথা ভাবিনা। জারি, সারি, ভাওয়াইয়া পল্লীগীতি গানের কথা ভাবিনা; আমরা ভাবি পশ্চিমা দুনিয়ার অপ-সংস্কৃতির কথা, লালায়িত হয়ে ভাবি পশ্চিমা দুনিয়ার রীতিবিরুদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতি আর বেলেল্লাপূর্ণ নষ্ট-নির্লজ্জ আকাশ সংস্কৃতির কথা। তাইতো আমাদের দেশের কবিদের কবিতার বই উঁইপোকার পেটে যায়। গল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা আর নাটকের বই মুদির দোকানে বিক্রি হয়। ধীক! ধীক আমাদের এমন মানসিকতাকে। যে শিক্ষায় শিক্ষিত জাতির মাঝে স্বাজাত্যবোধ সৃষ্টি করে না। বই পড়ার প্রবণতা সৃষ্টি করে না, যে শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে পরগাছার মত আর গইচ্চা ঘাসের মত যারা বেড়ে ওঠে তারা তো দেশপ্রেমিকও হতে পারেনা। গাইড বই আর নোট বইয়ের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান পরিস্কার। এর দ্বারা শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের মেধা মনন ও অনুচিন্তনের স্ফুরণ ঘটায়না। পৃষ্ঠপোষকতা আর প্রেরণার অভাবে সৃজনশীল প্রতিভারও জন্ম হয়না।
কবি জসিমউদ্দিন তাঁর কবিতায় গ্রাম-বাংলার চিত্র যেভাবে হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন, যেভাবে গ্রামীণ জন-জীবনের জীবনযাত্রাকে ফুটিয়ে তুলেছেন এবং জসিমউদ্দিন তাঁর ‘কবর’ কবিতায়, ‘আসমানী’ ‘নিমন্ত্রন’ কবিতায় যে করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন, ‘সুজন বাদিয়ার ঘাট’ আর ‘নকসী কাঁথার মাঠ’ নামে দু’টি বিখ্যাত অমর কাহিনী কাব্য রচনা করে সমগ্র বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী হয়ে আছেন; পল্লীকবি জসিমউদ্দিনের সেই ধারায় পরবর্তীতে আর কোন কবি গ্রামীণ আবহে সে রকম কবিতা বা কাহিনী কবিতা রচনা করেছেন বলে আমার জানা নেই। এক্ষেত্রে বাহের দেশের (বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের) কবি ফডু হাফিজ পল্লীকবি জসিমউদ্দিনের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে গিয়ে সত্যিই চমক সৃষ্টি করেছেন।
মানুষের নৈর্ব্যক্তিক জীবনের নীতি-নৈতিকতা, কর্ম-অপকর্ম, স্বেচ্ছাচার, লোকাচার, পারিবারিক শুদ্ধাচার, আত্মীয়তা, মানবতা, সেবা, প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ-মিলন, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, চাওয়া না পাওয়]া, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক আচার-অবিচার, স্বামী-স্ত্রীর মান-অভিমান, ধর্মীয় রীতি-নীতি এবং মাদক, সন্ত্রাস, বাল্য বিবাহ, অকাল বিচ্ছেদ, ঘুষ-দুর্নীতি ও অনিয়ম-অনাচারের চিত্র ফুটে উঠেছে কবির কবিতায়। কবি কডু হাফিজ একটি সুন্দর সমাজ ব্যবস্থার কথা বলতে চেয়েছেন; সর্বোপরি তিনি রাজনৈতিক হানাহনি, হত্যা, গুম, এবং সংঘাতের বিরুদ্ধে কবির অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন। তিনি প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকাতে, জীব-বৈচিত্র্যের অস্তিত্ব রক্ষার্থে এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক গড়তে উদ্যানের কথা বলেছেন, ছয়া সুনিবিড় শান্তি নীড় আমাদের বন-বিথীর কথা বলেছেন।
জাতির পিতা, একাত্তরের কথা, জীনের বাদশা, শোক সংবাদ, আশুনী মাছ, যৌতুক, রমনার বটমুল, পান্তা ইলিশ, নির্যাতিতা নারী, নীমগাছের নালিশ, পান্তাভাতে ঘি, প্রতিবেশী মানুষের মন, টেন পার্সেন্ট, মশা. জমির আলী, বর্ষাকাল, স্খলন, সুদখোর, আদিম বন্ধু, দিলজান বিবি, ইন্টারভিউ, এরকম আরো অনেক কবিতা আছে, যা পাঠককে আনন্দ দানে সক্ষম হবে। আবহমান বাংলার প্রকৃতি, মানুষ, জীব-বৈচিত্র্য ও কীট-পতঙ্গ-প্রাণীর স্বভাব-চরিত্র এবং নদী, মাটি, পানি, আলো-বাতাসের যে অপূর্ব সমন্বয়, আকাশে মেঘ ভাসে, পাখি উড়ে, ঋতু পরিবর্তিত হয়, এরকম অনেক উপাদানে ভরপুর রূপসী বাংলার আবহ মুর্”ছনার বিচিত্র অনুরণন তাঁর কুবিতায় ফুটে উঠেছে।
‘জাতির পিতা’ কবিতায় কবি লিখেছেন ‘সকাল বেলা উঠে শুনি/জাতির পিতা নাই/সাথে ছিল পরিবার পরিজন/চাচাতো ফুফাতো ভাই/ নির্মম নশৃংস ভাবে হত্যা করেছে/রাতের অন্ধকারে/এমন জঘণ্য কাজ কেবল/ সীমারেরাই করতে পারে……….এমন নির্মম হত্যাকান্ড/জীবনে শুনি নাই/চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে/¯্রােতের মতো তাই’। ‘একাত্তরের কথা’ কবিতায় কবি ফডু হাফিজ লিখেছেন- আমি তখন খুবই ছোট/কেবল ক্লাস ফোরে পড়ি/আমার কি আর শক্তি আছে/ওদের বিরুদ্ধে লড়ি/গ্রামবাসীর চোখের ঘুম/ হারাম হয়ে গেল/দুখিনী মা কোলের শিশু/বুকে জড়িয়ে নিলো/ থালা বাসন হাড়ি পাতিল/ বস্তায় নিলো ভরি/পাকসেনারা ধরার আগেই/ভারতে দিবে পাড়ি’। ‘মৌমিতা’ কাবিতায় কবি লিখেছেন- কবিতা তোমায় ভালবেসে আমার হয়েছে জ্বালা/ বউ বড় না কবিতা বড় এবার দেখার পালা’। ‘মা বিড়াল’ কবিতায় কবি ফডু হাফিজ অত্যন্ত সহজ সরল ও সাবলীল ভাষায় লিখেছেন- লোকজনের মুখে শুনতে পেলুম তুমি একজন কবি/প্রাণীকুলকে সুনজরে দেখা তোমার একটা হবি/ কুকুর বিড়ালকে খেতে দিয়ে নাকি চেয়ে চেয়ে দেখো/তারপর আবার ওদেরকে নিয়ে নানা কবিতা লেখো’।
কবি ফডু হাফিজের প্রকৃত নাম মোঃ হাফিজুর রহমান চাঁদ। তিনি ১৯৬৪ সালে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার বোয়ালমারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গোলাম মওলা আকন্দ, মায়ের নাম- হাজেরা খাতুন। তিনি ঢাকা সিটি কলেজ থেকে ¯œাতক ডিগ্রী লাভ করেন। একজন সরকারি চাকরিজীবী। বর্তমানে শেরপুর গণপূর্ত বিভাগে কর্মরত আছেন। কবি ফডু হাফিজ ৩ কন্যা সন্তানের জনক। তার স্ত্রী আরজুমান্দ বানু চায়না একজন গৃহিণী।
‘স্মৃতির পাতা থেকে’ কাব্যগ্রন্থটিতে কিছু মুদ্রণ প্রমাদ রয়েছে। শব্দ চয়নে কবি আরো সচেতন হলে ভাল হতো। কবি ফডু হাফিজের কিাশোরী কন্যা হাফছা খাতুনের গ্রামীণ নিসর্গের উপর আঁকা প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে। কাব্যগ্রন্থটির পাঠকপ্রিয়তা কামনা করি।
লেখক: কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।




