শেরপুরের শ্রীবরদী সীমান্তের পাহাড়ি জনপদ সিঙ্গাবরুনা ইউনিয়নের ঢেউফা নদীর ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। ফসলি জমি গিলে খেয়ে নদী এগুচ্ছে বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে। সড়ক ভেঙে যাওয়ায় বিপাকে রয়েছেন গারো পাহাড়ের চান্দাপাড়া, বাবেলাকোনা, দিগলকোনা, হারিয়াকোনাসহ কয়েকটি গ্রামের মানুষ। এভাবে নদী ভাঙনের জন্য যত্রতত্র বালু তোলাকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা।

জানা যায়, সাম্প্রতিক উজানের ঢল ও নদীর বিভিন্ন স্থানে বালু তোলার কারণে সীমান্ত মেঘাদল শয়তান বাজার থেকে চান্দাপাড়া, বাবেলাকোনা, দিগলকোনা, হারিয়াকোনা যাওয়ার সড়কটি নদীতে বিলীন হচ্ছে। চান্দেরপাড়া এলাকায় নদী গ্রাস করেছে ফসলি জমি। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বাবেলাকোনা ও হারিয়াকোনাতেও নদীতীর ভেঙে সড়ক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যে কোনো সময় এলজিইডির ৩০-৩৫ বছরের পুরোনো উশান (স্থানীয় নাম) সেতুটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরেজমিনে গেলে কথা হয় হারিয়াকোনার বাসিন্দা মিথুন সাংমার সাথে। তিনি জানান, বেশ কয়েকবছর ধরে অবৈধভাবে বালু তোলায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন নদী উল্টো পথে গিয়ে ফসলি জমি, বসতভিটা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গ্রাস করছে। তিনি বলেন, এই অঞ্চলে তিন-চারটি গ্রামে ৭ হাজারের অধিক আদিবাসী মানুষ বসবাস করেন। তারা খুব কষ্টে আছেন। সবার পেশা কৃষি। তাই কোনো অনিয়মের কথা তারা বলতে সাহস পান না। কারণ যারা বালু তোলে তারা প্রভাবশালী। কিছু বললে এলাকায় বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ ছাড়া গত কয়েক বছরে উজানের ঢলে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

পাশের গ্রাম বাবেলাকোনার বাসিন্দা আদিবাসী নেতা লেবানুস মারাক জানান, দুই সপ্তাহ আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে লোকজনকে আশ্বাস দিয়েছেন ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড এখনও কাজে হাত দেয়নি। যদি দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না যায় তবে উশান সেতুটি নদীতে বিলীন হতে পারে।
বাবেলাকোনা আদিবাসী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী উসিষ্টা মারাক ও এসএসসি পরীক্ষার্থী ইভাস সাংমা জানান, বাবেলাকোনার কামাখ্যা মন্দির ও কালভার্টের সামনের সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় স্থানীয় আদিবাসী বিদ্যালয় ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩ শতাধিক শিক্ষার্থী বেকায়দায় রয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছে তারা। হারিয়াকোনার লিপি সাংমা বলেন,নির্বাচনের সময় সবাই আমাদের আপন হয়ে যায়। অনেক আশ্বাস দেন, কিন্তু পরে আর খোঁজ রাখেন না।
সিঙ্গাবরুনা ইউপি চেয়ারম্যান ফখরুজ্জামান কালু বলেন, চেয়ারম্যান হলেও এখন তাদের ক্ষমতা সীমিত। তবে চান্দেরপাড়া থেকে হারিয়াকোনা পর্যন্ত একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করলে এই এলাকার মানুষের ভীষণ উপকার হবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হারিয়াকোনা দেখতে আসা মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। এতে স্থানীয়দের আয়-রোজগারও বাড়বে।
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী নাদরুদ জামান ইমন বলেন, এই অঞ্চলটি দেখতে অসাধারণ। একটি পর্যটন কেন্দ্রও আছে। এ ছাড়া তিনটি বিদ্যালয় রয়েছে, সেখানেও প্রান্তিক পর্যায়ের ৫ শতাধিক ছেলে-মেয়ে লেখাপড়া করে। সড়কটি ভেঙে পর্যটকসহ স্থানীয়দের যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। গাড়ি চলাচল বন্ধ। নদীতীর রক্ষায় ২৯ লাখ টাকার একটি প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, তাঁর বাবা প্রয়াত সংসদ সদস্য ডা. সেরাজুল হকের চেষ্টায় ৩০-৩৫ বছর আগে ঢেউফা নদীর চান্দেরপাড়া অংশে একটি সেতু নির্মিত হয়। এরপর এই অঞ্চলে কোনো উন্নয়ন কাজ সেভাবে হয়নি। এ ছাড়া গত কয়েক বছরে উজানের ঢলে নদী ভাঙন শুরু হওয়ায় একমাত্র সড়কটি নদীতে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসককে ঘটনাস্থলে নিয়ে এসে পরিস্থিতি দেখিয়েছেন এবং নিজে চেষ্টা করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে সড়কটি মেরামত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিছু দিনের মধ্যে কাজ শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।




