নব্বই দশকের শক্তিমান কবি হাদিউল ইসলাম এর জন্মদিন আজ (১৫ জানুয়ারি)। তিনি ১৯৭৪ সালের এইদিনে শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার মাটিয়াকুড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম নূরুল ইসলাম এবং মাতার নাম মোছা. রোকেয়া বেগম।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
তিনি মূলত নব্বই দশকের একজন নিভৃতচারী এবং প্রভাবশালী কবি। পরিমিত শব্দ চয়ন এবং গভীর জীবন বোধের জন্য তিনি স্থানীয় ও জাতীয় পরিমণ্ডলে পরচিত। তাঁর কবিতার ভাষা সহজ হলেও তার ভেতরকার থিম বা বিষয়বস্তু অত্যন্ত গভীর ও বৈচিত্র্যময়।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: ১. ধুলোকালস্রোত (প্রকাশকাল: ২০০৪) ২. আগুনের শিরদাঁড়া (প্রকাশকাল: ২০১৯) ৩. মধু ও মৌমাছির গান ( প্রকাশকাল ২০২৪)। এছাড়া ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত সমন্বিত কাব্যগ্রন্থ ‘চন্দ্রাবতীর কয়েকজন সন্তান’-এর অন্যতম কবি ছিলেন তিনি। তাঁর কবিতা জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংকলনে (যেমন: ইউপিএল প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কবিতা ২০০০’, বাংলা একাডেমি প্রকাশিত সংকলন ইত্যাদি) স্থান পেয়েছে।
ছোট পরিসরের কবিতায় তিনি ছন্দ এবং আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পছন্দ করেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির অধীনে গবেষণামূলক কাজও করেছেন। শেরপুরের স্থানীয় সাহিত্য আড্ডায় তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে।
এদিকে কবি হাদিউল ইসলাম-এর জন্মদিন উপলক্ষে বৃহত্তর ময়মনসিংহ লেখক সাংবাদিক ফাউন্ডেশনের সভাপতি হামিদুল আলম সখা, কার্যকরী সভাপতি চৌধুরী নুরুল হুদা, সাধারণ সম্পাদক লতিফুল বারী হামিম, কবিসংঘ বাংলাদেশ এর সভাপতি রফিকুল ইসলাম আধার, কার্যকরী সভাপতি আরিফ হাসান ও সাধারণ সম্পাদক ড. আব্দুল আলিম তালুকদার, অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুল হক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
কবি হাদিউল ইসলামের গুচ্ছ কবিতার কাব্যিক বিশ্লেষণ
এক.
‘সময়ের সারমেয়’ : এই কবিতাটি মূলত বর্তমান সময়ের নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের এক চিত্রপট। কবি এখানে এক অস্থির ও কলুষিত সময়ের বর্ণনা দিয়েছেন। কবিতার শুরুতেই ‘সময়ের সবচেয়ে কুৎসিত সারমেয় (কুকুর)’ এবং তাদের ‘বাঘের মতো গর্জন’ দিয়ে কবি এক ধরণের সামাজিক অস্থিরতা ও আগ্রাসনকে বুঝিয়েছেন। যেখানে সত্য ও সুন্দরের চেয়ে আস্ফালনই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘বাগানের সৌন্দর্য ঈষৎ ম্লান’—এই চরণের মাধ্যমে সুন্দরের বিনাশ এবং মানুষের ভেতরের ‘সুচেতনা’ বা বিবেকের বিকৃতি (দেহোৎসবে মেতে ওঠা) ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ভালোবাসা এখানে মেকি, যেখানে কেবল ‘অশ্লীল দঙ্গল’ আর ‘মগজবিহীন’ আস্ফালন বিদ্যমান।
শেষ স্তবকে কবি ‘আলোলতা’ এবং ‘জ্ঞান বৃক্ষের’ কথা বললেও পরিস্থিতিকে আশঙ্কাজনক হিসেবেই দেখিয়েছেন। বিশেষ করে, ‘মা হাঁটছেন নগ্নপদে বিমর্ষ করুণ বাংলায়’ চিত্রকল্পটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। এটি দেশমাতৃকার অসহায়ত্ব এবং বর্তমান সময়ের অরাজকতায় তাঁর বিপন্ন অবস্থাকেই নির্দেশ করে।
দুই.
‘ইতিহাস’ : এ কবিতাটি আগেরটির ঠিক উল্টো সুর বহন করে। এটি প্রতিরোধ, জাগরণ এবং ঐতিহ্যের জয়গান।
‘ইতিহাসের বস্ত্রহরণের ইতিহাস’ এবং ‘বেহুমার দুর্যোধন ও দুঃশাসন’—এই শব্দগুলোর মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে শাসকগোষ্ঠী বারবার ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কবি বিশ্বাস করেন, ফিনিক্স পাখির মতো সেই ছাই থেকেই ইতিহাস আবার জেগে ওঠে।
কবি বাংলার ইতিহাসের লড়াকু ও সাংস্কৃতিক আইকনদের (টিপু পাগলা, নূরল দীন, চণ্ডীদাস, চাঁদ সওদাগর) এক সারিতে এনে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁরা হার মানেননি, বরং তাঁদের ‘বঙ্গীয় সাহস’ দিয়ে ব্যর্থতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন।
কবিতার শেষে প্রমিথিউসের মতো চিরন্তন বিদ্রোহীর সাথে চন্দ্রাবতী ও বেগম রোকেয়াকে যুক্ত করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রোকেয়া বা চন্দ্রাবতীর মতো মহীয়সী নারীদের স্বাবলম্বী ও সাবলীল উপস্থিতি দিয়ে কবি সমাজ পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ রূপটি ফুটিয়ে তুলেছেন।
তিন.
‘ভেজানো দরজা ঠেলে’ : এ কবিতাটি মূলত একটি বিষণ্ণ, বৃষ্টিভেজা রাতের প্রেক্ষাপটে লেখা, যেখানে কবির ব্যক্তিগত একাকীত্ব বিশ্বজনীন দার্শনিক চিন্তার সাথে মিশে গেছে।
বৃষ্টির ছাঁট আর কামিনী ফুলের গন্ধের মাধ্যমে একধরনের মায়াবী কিন্তু বিষণ্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ‘চায়ের কাপের সঙ্গে গল্প করা’ লাইনটি চরম একাকীত্বের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে কথা বলার মতো কোনো মানুষ নেই।
প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সাদি মহম্মদের আত্মহত্যার প্রসঙ্গটি কবিতায় গভীর বিষণ্ণতা যোগ করে। শিল্পের মাধুর্য (রবীন্দ্রসংগীত) এবং জীবনের রূঢ় বাস্তবতা (আত্মহত্যা) এখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
কবিতার শেষাংশে কবি সিগমুন্ড ফ্রয়েড ও সিমোন দ্য বোভোয়ার নাম নিয়েছেন। ফ্রয়েড অবচেতন মন এবং বোভোয়ার অস্তিত্ববাদ নিয়ে কাজ করেছেন। কবি নিজের অনিদ্রাকে এই দুই মহান চিন্তকের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন, যা আসলে বৌদ্ধিক ক্লান্তি থেকে মুক্তির একটি আকুতি।
চার.
‘কেন যাবো’ : এই কবিতাটি আরও বেশি প্রশ্নবোধক এবং অস্তিত্ববাদী। এখানে কবি নিজের অবস্থান এবং সময়ের সাথে তাঁর সংঘাতকে তুলে ধরেছেন।
‘কেন যাবো?’—এই মৌলিক প্রশ্নটি দিয়ে কবি গতির বিপরীতে স্থিরতাকে বেছে নিয়েছেন। তিনি অন্যের বেঁধে দেওয়া নিয়মে বা ‘অন্যদের কালে’ জীবন যাপন করতে চান না।
কবি আক্ষেপ করছেন যে তাঁর নিজের কোনো ‘ছায়া ‘বা নিজস্ব জোরালো ‘উচ্চারণ’নেই। সমাজে সবাই যখন ভিড়ের অংশ, কবি তখন নিজের একটি স্বতন্ত্র সত্তা বা ‘নিজস্ব ছায়া’ খুঁজছেন। চণ্ডীদাস (প্রেমের কবি) এবং নজরুল (বিদ্রোহের কবি)—দুজনেরই প্রাসঙ্গিকতা আজকের এই ‘উন্মমানুষের কলহপ্রবণ জমানায়’ হারিয়ে যাচ্ছে বলে কবি মনে করেন। প্রেম এবং দ্রোহ আজ খণ্ডিত।
চারপাশের এই অবক্ষয় দেখে কবি তাঁর পা গুটিয়ে নিয়েছেন। এটি পরাজয় নয়, বরং এই অসার সময়ের সাথে আপস না করার একটি প্রতিবাদী ভঙ্গি।




