নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে খালেদা জিয়া চলে গেছেন অনন্তলোকে। গণতন্ত্র, পরমতসহিষ্ণুতা ও দেশপ্রেমের তুলনারহিত এক প্রতীক তিনি। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে-মননে, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায়, চর্চায়, সংকটে-স্বপ্নে তিনি অবধারিতভাবে যুক্ত থাকবেন। তাঁর ত্যাগ, দৃঢ়তা, দূরদর্শী প্রজ্ঞা, আপন মৃত্তিকা ও মানুষের প্রতি সুগভীর অঙ্গীকার আমাদের সব সময় শক্তি ও সাহস জোগাবে। আমাদের সৌভাগ্য যে তাঁর মতো অবিচল আপসহীন প্রত্যয়ী একজন দেশনেত্রীকে আমরা পেয়েছি। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, দেশাত্মবোধ স্বপ্নে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অনিঃশেষ প্রেরণা ও পাথেয় হয়ে থাকবে।

সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে যত চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে, তা মোটেও স্বস্তিদায়ক ছিল না। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক শাহাদাতবরণের পর গৃহকোণ ছেড়ে তাঁকে জটিল-কুটিল অস্থির রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করতে হয়।
শক্ত হাতে হাল ধরতে হয় শহীদ জিয়া প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপির। স্বৈরাচারী এরশাদ ও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দুঃশাসনে তাঁর দল শুধু নয়, নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনও এক দুর্বিষহ অবস্থায় নিপতিত হয়। অপরিসীম ধৈর্য, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও সহিষ্ণুতা দিয়ে সেসব অগ্নিপরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হন। শুধু বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না তিনি, বেগম রোকেয়ার মতো বহু ক্ষেত্রে পথিকৃৎ ছিলেন। দেশ ও জনগণের অভিপ্রায় ও আকাঙ্ক্ষাকে তিনি বাস্তব রূপ দান করতে সক্ষম হন। পূর্ণ সংসদীয় শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির সংযোজন, নারীশিক্ষার ব্যাপক প্রসার, স্বৈরাচারের প্রলোভন ও ফাঁদ উপেক্ষা করে জনপ্রত্যাশার রূপায়ণে অটুট আপসহীনতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তিনি।
পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার অপশাসনকালে তাঁকে নজিরবিহীন সমস্যাসংকুল অনভিপ্রেত, অমানবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। শেখ হাসিনার পৈশাচিক প্রতিহিংসার নির্মম শিকার হয়েছেন তিনি। মিথ্যা মামলায় নিগৃহীত নিপীড়িত পর্যুদস্ত করা হয়েছে তাঁকে। মধ্যযুগীয় বর্বরতায় তাঁকে অফিসে দীর্ঘ সময় অবরোধ করে রাখা হয়। স্বামী, স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক সেনাপ্রধান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে তাঁকে। কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোকে অকালে হারাতে হয়েছে। জেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান এক-এগারোর নীলনকশার ষড়যন্ত্রী সরকার কর্তৃক এমন নৃশংসতার শিকার হয়েছিলেন যে, এক পর্যায়ে তাঁর প্রাণসংশয়ও হয়েছিল। মহীয়সী নারী বেগম জিয়া সর্বংসহা ধরিত্রীর মতো হাজারো অপমান, নির্যাতন সহ্য করেছেন। যে দানবীয় হিংস্রতার শিকার তিনি হয়েছেন, তার হোতাদের কী পরিণতি হয়েছে, তা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছেন। একেই বোধ হয় বলা হয় প্রকৃতির প্রতিশোধ।

খালেদা জিয়া ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থায়ী ঠাঁই পেয়েছেন। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের গাথায় তাঁর নাম, অবদান ও ভূমিকা খোদিত হয়ে রইল উজ্জ্বল স্বর্ণাক্ষরে। রাজপথে লড়াকু আন্দোলন, সংগ্রাম, দেশ পরিচালনা, সহিষ্ণুতার জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা যুগ যুগ ধরে উল্লেখিত হবে। ইতিহাসের পাতায় চোখ বোলালে আমরা তার প্রমাণ পাই। অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রার ৩ জানুয়ারি ১৯৯২ বিশেষ সংখ্যার একটি বিশেষ প্রতিবেদনের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। ওই বিশেষ প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে : ’৯১-এর রাজনীতি ছিল গণ-অভ্যুত্থানের স্বপ্ন রূপায়ণের বছর। ’৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানকালে রুদ্ধ পথের মানুষের প্রত্যাশার অভিব্যক্তি ছিল তিন জোটের রূপরেখা, যার মূল লক্ষ্যই ছিল গণমুখী ও জবাবদিহিমূলক সংসদীয় সরকার প্রতিষ্ঠা। এরশাদের পতনের পর তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল দায়িত্ব নির্ধারিত হয় একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং বিজয়ের স্তম্ভে প্রতিষ্ঠিত সরকারের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে আখ্যায়িত খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্বে নতুন মাত্রা সংযোজনের পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি হয় ঠিক সেখান থেকেই।…
প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে শুরু করতে হয় বিরোধী দলগুলোর প্রথাসিদ্ধ বৈরিতার মধ্য দিয়ে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিএনপির মন্ত্রিসভা গঠনের অধিকারের বিরোধিতা করে জাতীয় পার্টির পাশাপাশি আওয়ামী লীগও। দল দুটির কট্টর বিরোধিতার তাজা স্মৃতি মনে রেখে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে হিসাব করতে হয়েছে ভবিষ্যৎ বৈরিতারও। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে শুরু করতে হয় আরো কিছু বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে। এরশাদ আমলের দুর্নীতি বিস্তৃত প্রশাসনিক কাঠামো এবং গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার ঝড়-ঝাপটার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। ব্যাপকতর অর্থে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গণ-অভ্যুত্থানের উপজাত সমস্ত বিশৃঙ্খলার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকেই নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হয়। রাস্তায় নেমে আসা, আগুনে-স্লোগান দেওয়া, জীবনপণ আন্দোলন করা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঙ্গনে ফেরানো, শ্রমিক, কর্মচারী, পেশাজীবী সকলকে কর্মস্থলে ফেরানো, অসহিষ্ণু অস্থির সমাজের বিভিন্ন অংশের দাবিমালা সামলানোর সমস্ত গুরুদায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে পালন করতে হয়।
মহীয়সীর মৃত্যু হয় না। তিনি আমাদের মাঝে আছেন। থাকবেন। জাতীয় সংকটে, সংগ্রামে, স্বপ্নজয়ের প্রত্যয়ে তাঁর কাজ ও আদর্শ অবিনশ্বর আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখাবে আমাদের। শোক পরিণত হোক শক্তিতে। বেদনাহত উপলব্ধি হয়ে উঠুক প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ঐক্যের বীজমন্ত্র।
লেখক : কবি, প্রবীণ সাংবাদিক ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জাতীয় প্রেস ক্লাব।




