‘আমার ছেলে মাহবুবকে বাড়ি বাড়ি কাজ করে, ধার-কর্জ করে পড়াশোনা করাইছি। সে সবসময় বলত, মা তুমি চিন্তা কইরোনা। আমি তোমার সব অভাব-অনটন দূর কইরা দিমু। সে ইন্টারে পড়া শুরুর পর থেইকাই কম্পিউটারে কাজ কইরা কামাই করা শুরু করছিল। কিছুদিন থেকে সে একাই আমাদের পরিবারটারে চালাইতেছিল। ইট কিনে আনছিল আমারে নতুন বাড়ি করে দিবার জন্য। কিন্তু তার মনের আশা আর পূরণ হইল না। আন্দোলন করতে গিয়া গাড়ি চাপা দিয়া তারে মাইরা ফেলাইছে। যারা আমার ছেলেরে মারছে, আমি তাদের বিচার ও শাস্তি চাই।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন শেরপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে সংঘাতের সময় নিহত আইটি উদ্যোক্তা মাহবুব আলমের (২০) মা মাহফুজা খাতুন। মাহবুব আলম সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের তারাগড় গ্রামের মো. মিরাজ আলীর ছেলে। তিনি শেরপুর সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিষয়ের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

আইটি ল্যাব এডুকেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। এছাড়া তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের হার পাওয়ার প্রকল্পের শেরপুর জেলার কো-অর্ডিনেটর ও প্রশিক্ষক ছিলেন তিনি। গত ৪ আগস্ট বিকেলে শেরপুর শহরের খরমপুর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিল চলাকালে গাড়িচাপায় মাহবুব আলম নিহত হন।
মাহবুব আলমের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দরিদ্র মিরাজ আলীর দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে মাহবুব ছিলেন চতুর্থ। মাহবুবের বড় দুই বোন মিলিনা ও সেলিনার বিয়ে হয়েছে। বড় ভাই মাজহারুল ইসলাম শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছেন। আর ছোট বোন মারিয়া চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। ছোটবেলা থেকেই মাহবুবের তথ্যপ্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ ছিল। উচ্চমাধ্যমিকে পড়ালেখা করার সময় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আইটি ল্যাব নামের কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার। এছাড়া তিনি ফ্রিল্যান্সিং করতেন। মাহবুবের বাবা মিরাজ আলী প্রায় ১৫ বছর ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন। ৮ শতক জমির বসতভিটা ছাড়া মাহবুবের বাবার কোনো ফসলি জমি নেই। মাহবুবের মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে, চেয়ে-চিন্তে ও ধারকর্জ করে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাচ্ছিলেন। মাহবুব মেধাবী ও তথ্য প্রযুক্তিতে পারদর্শী হওয়ায় সে এসএসসির পর থেকেই টুকটাক ফ্রিল্যান্সিং এবং টিউশনি করিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতো। এরপর ইন্টারমিডিয়েটে পড়াশোনা করার পাশাপাশি তিনি আইটি ল্যাব নামে একটি ট্রেনিং সেন্টার চালু করেন এবং পরিবারের সব খরচ চালানো শুরু করেন। তাই মাহবুবকে নিয়ে পরিবারের অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু আন্দোলনে নিহত হয়ে স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে মাহবুবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠোনে নতুন ইট কিনে রেখেছেন মাহবুব। সেগুলো দিয়ে নতুন বাড়ি বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কাঁচা ভিটির ওপর নির্মিত মাহবুবদের টিনের বসতঘরের বারান্দায় একটি কম্পিউটার বসানো। পাশে পড়ার টেবিল। এখানে বসেই ফ্রিল্যান্সিং করতেন মাহবুব। এখন সেসব শুধুই স্মৃতি। মা মাহফুজা খানম ঘরের মধ্যে মাহবুবের বিভিন্ন পুরস্কারের ছবি ও মেডেল হাতিয়ে হাতিয়ে দেখছেন আর কান্নাকাটি করছেন। এ সময় স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। মাহবুবের মা মাহফুজা খাতুন বলেন, মাহবুব মানুষকে কম্পিউটারের বিভিন্ন বিষয়ে ট্রেনিং দিয়ে যে টাকা আয় করত, তা নিজের পড়ালেখা ও সংসারের খরচ মেটাত। সংসারের অন্যতম উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তাঁর পরিবারে নেমে এসেছে অন্ধকার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, এত এত ছেলেমেয়ে আন্দোলনে গেল, সবাই তো ফিরে এল। আমার বাবাটা তো আর ফিরল না। আমার বাবাটা শহীদ হয়ে গেল, কিভাবে আমি এইটা সহ্য করি। আমার বাবাটারে যারা এমন কইরা মারছে আমি তাদের কঠিন বিচার চাই। মাহবুবের বড় ভাই মাজহারুল ইসলাম বলেন, আমার ভাই কম্পিউটার ট্রেনিং করিয়ে শুধু তার নিজের খরচ চালাইনি। আমাদের খরচও দিয়েছে। সে অত্যন্ত ভদ্র ছেলে ছিল। কারো সাথে তার কোন বিরোধ ছিল না। আমি আমার ভাই হত্যার বিচার চাই।
স্থানীয় বাসিন্দা তাফাজ্জল হোসেন বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শেরপুরের প্রথম শহীদ মাহবুব আলম। সে খুবই মেধাবী একটি ছেলে। পড়াশোনার পাশাপাশি সে ফ্রিল্যান্সিং ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে জড়িত ছিল। কলেজ শিক্ষার্থী হলেও এলাকার সবার কাছেই সে সুপরিচিত ও আস্থার মানুষ ছিল। তার মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী সুষ্ঠু তদন্ত করে তাদের বিচার করা উচিত। একইসাথে তার পরিবারকে আর্থিক সহায়তাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত। মাহবুবের খালাতো ভাই কবীর হোসেন বলেন, আমরা দেখেছি ছোটবেলা থেকেই মাহবুব কঠিন সংগ্রাম করে বড় হয়েছে। পড়ালেখার পাশাপাশি ছাত্র পড়িয়ে ও আইটি ল্যাবে কাজ করে সংসারের খরচ জুগিয়েছে। তাঁর অকালমৃত্যুতে পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়েছে।
এদিকে আন্দোলনে নিহত সদর উপজেলার মাহবুব ও শ্রীবরদী উপজেলার সবুজের পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা বিএনপি। ইতোমধ্যে দুজনের বাড়িতে গেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শেরপুর জেলা বিএনপির সভাপতি, সাবেক এমপি মো. মাহমুদুল হক রুবেল, সাধারণ সম্পাদক মো. হযরত আলীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। তাদের কিছু আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছে। তবে শেরপুরের বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও সমাজসেবী রাজিয়া সামাদ ডালিয়া বলেন, আন্দোলনে নিহত মাহবুব ও সবুজের পরিবার খুবই অসহায়। তারা দুজনই পড়াশোনার পাশাপাশি আয় করে তাদের পরিবারকে সহযোগিতা করতো। তাই সরকারিভাবে তাদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও পাশে দাঁড়ানো খুবই প্রয়োজন।




