ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষি ও খাদ্য সমৃদ্ধ অঞ্চল শেরপুরের ধানের চাতালে কাজ করা হাজিরাভিত্তিক শত শত নারী শ্রমিক। হাড্ডিসার পরিশ্রমে ধান শুকানো, মাড়াই করাসহ সব ধরনের কাজে পুরুষ শ্রমিকের সমান কাজ করলেও তাদের চাইতে কম মজুরি পাচ্ছেন নারী শ্রমিকরা। তবে চাতাল মালিকরা বলছেন, ভিন্ন কথা। তাদের মতে, নানা সঙ্কটে চাতাল শিল্পই এখন বন্ধের পথে, এরপরও আগের চাইতে মজুরি অনেক বাড়ানো হয়েছে। মজুরিতে নারী-পুরুষ শ্রমিকের সমতাও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

জানা যায়, খাদ্য ও কৃষিসমৃদ্ধ অঞ্চল শেরপুর জেলায় একসময় চাতালের সংখ্যা ছিল হাজারেরও অধিক। ওইসব চাতালে অর্ধ লাখেরও বেশি নারী-পুরুষ শ্রমিক কাজ করতেন। আর তাদের সিংহভাগই ছিলেন নারী শ্রমিক। কারণ পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিকের মজুরি দিতে হতো কম। তবে সময়ের পরিক্রমায় এখন চাতালের স্থান দখল করে নিয়েছে অত্যাধুনিক পারবয়লার অটো রাইস মিল। এতে জেলার সিংহভাগ ধানের চাতাল মিল বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চলছে সেগুলোর অবস্থাও ততোটা ভালো নয়। এসব চাতালে পুরুষ শ্রমিকের সমান কাজ করেও নারী শ্রমিকরা পুরুষের চেয়ে কম মজুরি পান। চাতালগুলোতে বর্তমানে পুরুষ শ্রমিককে ২২০ থেকে ২৫০ টাকা দেওয়া হলেও নারী শ্রমিকদের দেওয়া হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকায় জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়েই ওইসব নারীরা কম মজুরিতে হলেও চাতালে কাজ করছেন। তবে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির এই সময়ে সামান্য টাকায় দিন চলে না তাদের।
সোমবার দুপুরে সরেজমিনে শেরপুর শহরের ঢাকলহাটি, শীতলপুর, দিঘারপাড় ও নওহাটা এলাকার বেশ কয়েকটি ধানের চাতালে ঘুরে দেখা যায়, পুরুষদের সাথে নারী শ্রমিকরাও ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কথা হয় নারী শ্রমিক মোছা. আবেদা বেগম ও রিতা বেগমের সাথে। তারা জানান, আমরা তো পুরুষের সমানই কাজ করি। এরপরও বেতন তাদের চাইতে কিছুটা কম পাই। এখন আগের মতো ধানের মিল নাই। সব বন্ধ হয়ে গেছে গা। তাই বাধ্য হইয়াই কাজ করতে হয়। নাইলে পোলাপান নিয়া খামু কি? আরেক নারী শ্রমিক জাহানারা বেগম বলেন, প্রায় বিশ বছর থাইকা এই কাজ করি। আগে ৩০ টাকা দিন পাইতাম। এখন বাড়তে বাড়তে ২০০ টাকা পাই। কিন্তু জিনিসের যে দাম, তাতে তো আমার চারজনের সংসার এই টাকা দিয়া চলে না। আবার মিল সারাবছর চলে না, ছয় মাস চলে, ছয় মাস বন্ধ থাকে। তাই মজুরিটা আরও বাড়াইলে ভালা হইতো আমগোর জন্য।

দিঘারপাড় মহল্লার চাতাল মিল মালিক সোহাগ তালুকদার, মো. হযরত আলী ও হরফ আলী জানান, পুরুষ শ্রমিকরা বস্তা টানা, বড় খাঁচা টানাসহ ভারি কাজগুলো করে। যেগুলো নারীরা করতে পারে না। সেজন্য পুরুষদের ২০-৫০ টাকা বেশি দেওয়া হয়। তাছাড়া এখন নারী পুরুষদের মধ্যে বেশি ব্যবধান নেই। চাতাল শ্রমিকদের বেতন তাদের শ্রমিক সংগঠনের সাথে আলোচনা করেই ঠিক করা হয়। এক সময় নারী পুরুষের তারা আরও বলেন, এখন অটো রাইস মিলের জন্য চাতাল মিলই পুরোপুরি বন্ধের পথে। পুরো জেলায় এখন ৫০টা মিলও চালু নেই। এজন্য শ্রমিকরা বেকার হয়ে কেউ ঢাকা চলে গেছেন। অনেকেই ভিক্ষা করে জীবন-যাপন করছেন। সরকারের এদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
চাতালে নারী-পুরুষ শ্রমিকের মজুরি বৈষম্যের বিষয়ে শেরপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আলহাজ্ব মো. আসাদুজ্জামান রওশন শ্যামলবাংলা২৪ডটকমকে বলেন, এখন নারী পুরুষের মজুরি বৈষম্য তেমন নেই। অটো রাইস মিলের কারণে অধিকাংশ চাতাল মিলই বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকও বেকার হয়ে পড়েছেন। আমরা সরকারের কাছে আমাদের ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফের দাবি জানাচ্ছি, যাতে এই শিল্পটা টিকে থাকতে পারে।
এ ব্যাপারে জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. লুৎফুল কবীর শ্যামলবাংলা২৪ডটকমকে বলেন, কোন প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারী-পুরুষের বৈষম্য কিন্তু এখন আর নেই। সরকার সংবিধানেও নারী-পুরুষের সম অধিকার নিশ্চিত করেছে। কিছু বৈষম্য রয়েছে অপ্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত খাতে। সেগুলো দূর করতে সরকার নারী দিবস পালনসহ নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। জনসাধারণকে সচেতন করে তুলে সেগুলোও দূর করা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।




