ads

রবিবার , ২০ জুন ২০২১ | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  1. ENGLISH
  2. অনিয়ম-দুর্নীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আমাদের ব্লগ
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. ইসলাম
  8. উন্নয়ন-অগ্রগতি
  9. এক্সক্লুসিভ
  10. কৃষি ও কৃষক
  11. ক্রাইম
  12. খেলাধুলা
  13. খেলার খবর
  14. চাকরির খবর
  15. জাতীয় সংবাদ

বিশ্ব বাবা দিবসের ঐতিহাসিক পটভূমি

ড. আবদুল আলীম তালুকদার - ফটো কার্ড
জুন ২০, ২০২১ ১:১৬ অপরাহ্ণ

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বাবা দিবস পালন শুরু হয়। আসলে মায়েদের পাশাপাশি বাবারাও যে তাদের সন্তানের প্রতি স্নেহপ্রবণ ও দায়িত্বশীল একথা বোঝানোর জন্যই এই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। পৃথিবীর সব বাবাদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা প্রকাশের ইচ্ছে থেকে যার শুরু এবং সেই বাবার প্রতি সম্মান জানাতে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব বাবা দিবস।
বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম উপহারগুলোর মধ্যে নিঃসন্দেহে একটি। বাবা মানে পরম নির্ভরতা, মমতায় জড়ানো শঙ্কাহীন আবাস, নিখাদ আশ্রয়স্থল, উত্তপ্ত অগ্নিপিণ্ডের নীচে আরাম শীতল ছায়া। বাবা সন্তানের চির আপনজন, খুশি-আনন্দের কেন্দ্রস্থল। বাবার প্রতি সন্তানের চিরন্তন ভালোবাসা প্রকাশ প্রতিদিন-প্রতিক্ষণই ঘটে থাকে। সন্তানের জন্য প্রতিটি দিনই তো বাবার উৎসর্গকৃত দিবস। কেউ কেউ মনে করে থাকেন এরপরও আলাদা করে বাবা দিবসের কী প্রয়োজন ? হ্যাঁ, তারপরও বিশ্বব্যাপী বাবার জন্য বিশেষ দিন হিসেবে প্রতি বছর ‘বিশ্ব বাবা দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু কোথা থেকে বা কবে থেকে বাবা দিবস পালন শুরু হলো বা কে এই দিবস পালনের সূচনা করলেন, তা আমাদের অনেকেরই অজানা।
ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, গ্রেস গোল্ডেন ক্লেটন প্রথম ব্যক্তি যিনি বাবা দিবসের প্রচলন শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্টবাসী গ্রেস প্রথম বাবা দিবস পালনের জন্য আবেদন করেছিলেন। ১৯০৭ সালের ডিসেম্বরে ভার্জিনিয়ার মোনোনগাহ্য় ভয়াবহ খনি বিস্ফোরণে প্রাণ হারান ৩৬২ জন পুরুষ শ্রমিক; তাদের বেশিরভাগই ছিলেন সন্তানের বাবা। ফলে প্রায় ১ হাজার শিশু পিতৃহারা হয়ে পড়ে। এ বিষয়টি গ্রেস গোল্ডেন ক্লেটনকে পীড়া দেয়। তিনি স্থানীয় মেথোডিস্ট গির্জার যাজককে মৃত বাবাদের সম্মানে ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই রবিবার বাবা দিবস হিসেবে উৎসর্গ করার অনুরোধ করেন। ৫ জুলাইকে বাবা দিবস করার দাবী জানানোর কারণ এটি ছিল গ্রেসের মৃত বাবার জন্মদিন। এরপর ১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রপক্ষ একটি ঐতিহাসিক ফলক স্থাপনের মাধ্যমে ফেয়ারমন্টকে বাবা দিবসের জন্মস্থান হিসেবে ঘোষণা দেয়।
আবার সোনোরা লুইস স্মার্ট ডড নামের ওয়াশিংটনের এক ভদ্র মহিলার মাথাতেও বাবা দিবসের ধারণা আসে। যদিও তিনি ১৯০৯ সালে ভার্জিনিয়ার বাবা দিবসের কথা একেবারেই জানতেন না। ডড এই আইডিয়াটা পান গির্জার এক পুরোহিতের বক্তব্য থেকে, সেই পুরোহিত আবার মা’কে নিয়ে অনেক ভালো ভালো কথা বলছিলেন। তার মনে হয় তাহলে বাবাদের নিয়েও তো কিছু করা দরকার। স্থানীয় বেশ কয়েকজন ধর্মযাজক তার এই আইডিয়াটি গ্রহণ করেন। ডড আবার তার বাবাকে খুব ভালোবাসতেন। তাই তিনি স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বাবা দিবস পালনের আবেদন জানিয়েছিলেন এবং সে বছর ৫ জুন নিজ বাবার জন্মদিনের দিন বাবা দিবস ধার্য করার অনুমতি চান। তবে হাতে সময় কম থাকায় ওই বছর ১৯ জুন প্রথম এ অঙ্গরাজ্যে বাবা দিবস পালন করা হয়। সোনোরা তার বাবা উইলিয়াম স্মার্টকে আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাতেই এ দিনের সূচনা করেন। আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময় উইলিয়াম স্মার্ট ছিলেন একজন সৈনিক। ষষ্ঠ সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় তার স্ত্রী মারা যান। এরপর শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থেকেও ছয় সন্তানকে একাই লালন-পালন করেন উইলিয়াম।
প্রথম প্রথম বাবা দিবস বেশ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই পালিত হতো। আসলে মা দিবস নিয়ে মানুষ যতটা উৎসাহ দেখাতো, বাবা দিবসে মোটেও তেমনটা দেখাতো না বরং বাবা দিবসের বিষয়টা তাদের কাছে বেশ হাস্যকরই মনে হতো। ধীরে ধীরে অবস্থা পাল্টায়, ১৯১৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংসদে বাবা দিবসকে ছুটির দিন ঘোষণা করার জন্য একটা বিল উত্থাপন করা হয়। ১৯২৪ সালে তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজ বিলটিতে পূর্ণ সমর্থন দেন। অবশেষে ১৯৬৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন বাবা দিবসকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে, প্রতি বছর জুনের তৃতীয় রবিবার বাবা দিবস হিসেবে পালন করা হবে। ছয় বছর পর ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এটিকে আইনে পরিণত করেন এবং প্রতি বছর জাতীয়ভাবে বাবা দিবস পালনের রীতি চালু করেন।
এনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটেনিকার ভাষ্য মতে, বিশ্বের প্রায় ৭৫টি দেশে জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বাবা দিবস হিসেবে পালিত হয়। তৃতীয় রবিবার হিসেবে এ বছর ২০ জুন রবিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাবা দিবস। বিশ্বের কয়েকটি দেশ ভিন্ন মাসের ভিন্ন তারিখে বাবা দিবস পালন করলেও বাংলাদেশসহ একটি বিরাট অংশ যেমন- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, কলাম্বিয়া, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, জাপান, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স, স্ইুজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, ভেনিজুয়েলা, চিলি, আয়ারল্যান্ড, জ্যামাইকা, গ্রিস, জিম্বাবুয়ে, চেক প্রজাতন্ত্রসহ আরও কিছু দেশে জুনের তৃতীয় রবিবার এ বিশেষ দিনটি পালিত হয়। দক্ষিণ আমেরিকায় এটি পালিত হয় ১৯ মার্চ। আর অস্ট্রেলিয়া ও ফিজিতে পালন করা হয় সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম রবিবার।
আপাত দৃষ্টিতে অনেকের কাছেই মা দিবস বা বাবা দিবস পালনের বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায় না। তাই বলে এ ধরণের দিবসগুলো একেবারেই যে অপ্রয়োজনীয় তেমনটা কিন্তু মোটেও বলা যাবে না। সন্তানের জন্য বাবার ভালোবাসা অপরিসীম। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর সন্তানের বাবার ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছেন। তিনি সন্তান হুমায়ুনের জীবনের বিনিময়ে নিজের জীবন ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা-বোধ করেননি। এমন স্বার্থহীন যার ভালোবাসা, সেই বাবাকে সন্তানের খুশির জন্য জীবনের অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হয়। বাবা দিবসে সন্তানদের সামনে সুযোগ আসে বাবাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ জানানোর। তাছাড়া বাবা দিবস পালনের ফলে সমাজে এবং পরিবারে বাবাদের যে অবদান তা যে সমাজ এবং নিজের সন্তানরা মূল্যায়ন করছে, এ বিষয়টিও বাবাদের বেশ আনন্দ দেয়। তাছাড়া অনেক সন্তানই আছে যারা পিতামাতার দেখাশোনার প্রতি খুব একটা মনোযোগী নয়। মা দিবস বা বাবা দিবস তাদের চোখের সামনের পর্দাটি খুলে ফেলে পিতা-মাতার প্রতি তাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে তাই বলা যায়, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে মা দিবস বা বাবা দিবসের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। মোটকথা আমাদের পরিবার তথা সমাজে পিতার যে গুরুত্ব তা আলাদাভাবে তুলে ধরাই বাবা দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য।
পবিত্র কুরআনুল কারীম এবং রাসূলের (স.) হাদীসের বিভিন্ন স্থানে পিতামাতার সম্মান-মর্যাদা রক্ষার জন্য এবং তাদের প্রতি যথাযথ কর্তব্যপরায়ন হতে সন্তানের প্রতি জোর তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। সূরা বনী ইসরাঈলের ২৪ নং আয়াতে, সূরা নিসার ৩৬ নং আয়াতে, সূরা আহকাফের ১৪ নং আয়াতে এবং সূরা লুকমানের ১৪ নং আয়াতে পিতামাতার প্রতি ইহসান করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। তেমনিভাবে পিতামাতার গুরুত্ব বোঝাতে নবী করীম (স.) বলেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে নিহিত। (তিরমিযি শরীফ :১৮৯৯)
রাসূলে পাক (স.) অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘তার নাক ধূলায় মলিন হোক (৩ বার বলেছেন), সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেই হতভাগ্য ব্যক্তিটি কে? রাসূল (স.) প্রত্যুত্তরে বলেন, সে হলো ঐ ব্যক্তি যে তার পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেল অথচ তাদের সেবা করে জান্নাত হাসিল করতে পারলো না।(মুসলিম : ৪/১৬৭৮)
রাসূলুল্লাহ্ (স.) আরো ইরশাদ করেন, পিতামাতা জান্নাতের মাঝের দরজা। যদি চাও, দরজাটি নষ্ট করে ফেলতে পারো, নতুবা তা রক্ষা করতে পারো।’(তিরমিযি, তুহফাতুল আহওয়াযী: ৬/২৫)
এছাড়াও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ‘পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহী পরমং তপঃ, পিতরী প্রিতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্বদেবতা’- এই মন্ত্র জপ করে পিতাকে ধর্ম-স্বর্গ মনে করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকেন।
বাবা দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রে দেশভেদে দেখা যায় নানা বৈচিত্র। এ দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে পালিত হয়। এদিনে ছেলেমেয়েরা তাদের বাবাকে কোনো না কোনো উপহার দিতে খুব পছন্দ করে। আবার বাবারাও ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে বিশেষ উপহার পেয়ে বেশ অভিভূত হয়ে যান। এ উপহার দেয়ার ক্ষেত্রেও দেশভেদে দেখা যায় ভিন্নতা।
ফ্রান্সে বাবা দিবসটি ঐতিহ্যগতভাবে পালিত একটি উৎসব। এই দিনে সবরকম উপহার দেয়া হয়ে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে গোলাপ ফুলও। ফ্রান্সে একটা প্রথা চালু আছে যেমন: বাবা জীবিত থাকলে তাকে লাল গোলাপ দেয়া হবে আর বাবা যদি মারা যেয়ে থাকেন তাহলে তার সমাধিতে সাদা গোলাপ রেখে আসে।
জার্মানীতে এই দিনে সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে বাবারা বরং একেকটি গ্রুপ হয়ে হাইকিং করতে যান। কখনো কখনো মদ বা খাবার ভর্তি পাত্র টেনে তোলার মতো খেলা করেন।
মেক্সিকোয় বাবা দিবস বা ডিয়া ডেল পেড্রো উৎসবে রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে তেরো মাইল লম্বা এক দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, যাকে বলা হয় ক্যানেরা ডিয়া ডেল পেড্রো। বাবাদের সঙ্গে ওই দৌড়ে অংশ নেন সন্তানরাও।
থাইল্যান্ডে বাবা দিবস পালন করা হয় সদ্য প্রয়াত রাজা ভূমিবল আদুলিয়াদেজের জন্মদিন ৫ ডিসেম্বরে, কারণ তাকে দেশটির জনক বলে মনে করা হয়। এদিন হলুদ রঙের কাপড় পরা সেখানকার প্রথা।
নেপালে সন্তানরা এই দিনে তাদের পিতামাতাকে মিষ্টি কিনে দেন। কখনো কখনো সন্তানরা তাদের বাবার কাছ থেকে আশীর্বাদ নেন।
কোনো কোনো দেশে ছেলেমেয়েরা বাবাকে কার্ড বা ফুলের তোড়া উপহার দিয়ে বাবা দিবসের শুভেচ্ছা জানায়। আবার কোথাও কোথাও বাবাকে ছেলেমেয়েরা নেকটাইও উপহার দেয়। অনেকে আবার বাবা দিবস উপলক্ষে কেক কাটার আয়োজনও করে। যে যেভাবেই পালন করুক না কেন আসল কথা হলো বাবার সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানোসহ নানা উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করা।

Shamol Bangla Ads

লেখক : কবি, শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক।

Need Ads