শ্যামলবাংলা ডেস্ক : গত ২৪ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের মিনায় পদদলনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৩ বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু এবং ৯৮ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্য মিলেছে বিভিন্ন সূত্রে। তবে এখন পর্যন্ত জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশি হজ মিশন তিনজন নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও দু’জন বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করেছে। একজনের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য না পাওয়ার কারণে তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষ রোববার বিভিন্ন দেশের নিহত ৬৫০ জনের ছবি প্রকাশ করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, সৌদি বাদশাহর ভাতিজার নিরাপদ চলাচলের জন্য মিনায় ২০৪ নম্বর সড়কে ব্যারিকেড দেওয়ায় আটকেপড়া হাজিরা উল্টো দিকে ঘুরে ভিন্ন পথে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তারা বিপরীত দিক থেকে আসা হাজিদের মুখোমুখি হয়ে পড়লে ধাক্কাধাক্কিতে অসংখ্য হাজি পড়ে যান। যার ফলে ঘটে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। এ ছাড়া তীব্র গরমে ব্যারিকেডে আটকেপড়া বিপুলসংখ্যক হাজির অনেকেই হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনার পর ময়লা পরিষ্কারের ক্রেন দিয়ে টেনে লুটিয়ে পড়া হাজিদের অ্যাম্বুলেন্সে তোলে সৌদি পুলিশ। এ নিয়েও হাজিদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সরেজমিন মক্কায় বাংলাদেশি হাজিদের অবস্থানস্থলে গিয়ে দেখা গেছে অনেকের মধ্যে উৎকণ্ঠা, ভয়। নিখোঁজ হাজিদের ফিরে পেতে তারা এখন ব্যাকুল।
রবিবার বিকেলে জেদ্দার হজ কাউন্সিলর আসাদুজ্জামান বলেন, এখন পর্যন্ত সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ হাসপাতালগুলোতে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। ফলে আহত কিংবা নিহতদের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে হতাহতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকদের তথ্য চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। দুটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও চিকিৎসাধীনদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি নাগরিক আছে, তা জানতে চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ তথ্য দিলে তা জানিয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষ মিনার ঘটনায় বিভিন্ন দেশের নিহতদের ৬৫০ জনের ছবি প্রকাশ করেছে। সেই ছবিও হজ মিশনে টানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ছবির সঙ্গে মিলিয়ে নিহতদের নাম-পরিচয় সুনির্দিষ্ট করার কাজ চলছে। তিনি জানান, ১২৮ জন নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে তারা হজযাত্রীদের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ জনের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন, তারা ভালো আছেন। এ হিসাবে এখন পর্যন্ত ৯৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সে তথ্য নিয়েই তারা হতাহতদের ভেতরে বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ঢাকায় কূটনৈতিক প্রতিবেদক জানান, রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মিনায় পদদলনের ঘটনায় নিহতদের তালিকায় এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত দু’জন বাংলাদেশি নাগরিক হচ্ছেন খুলনার শহীদুল ইসলাম এবং সাভারের আমিনুর রহমান। আরেকটি মৃতদেহ বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তার বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া মক্কায় ফিরোজা খানম নামে একজন হাজি মিনার ঘটনায় নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার সঙ্গী হাজিরা। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত ৬৫০ নিহতের ছবির মধ্যে তার ছবি পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আশা করা হচ্ছে, আগামীকাল সোমবারের মধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষ নিহতদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশে সক্ষম হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় হজে যাওয়া নাগরিকদের স্বজনদের নিজেদের সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিতিতে এখন পর্যন্ত ৯ জন নিহত হওয়ার কথা জানা গেছে। আত্মীয়-স্বজন সূত্রে পাওয়া তথ্যে নিহত ৯ বাংলাদেশি হচ্ছেন_ দিনাজপুরের কেরামত আলী, সুনামগঞ্জের জুলিয়া হুদা, ফেনীর তাহেরা বেগম, নূরনবী মিন্টু, শরীয়তপুরের এম এ রাজ্জাক, হাসিনা আক্তার, আহম্মেদ আলী মৃধা, মুন্সীগঞ্জের জাহানারা আরজু এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোলাম মোস্তফা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে ভয়, কণ্ঠে ক্ষোভ :মিনার ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় আনুমানিক সকাল সাড়ে ১০টায় (বাংলাদেশ সময় দুপুর দেড়টা) মিনার ২০৪ নম্বর সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এই সড়কে আরব ও আফ্রিকার দেশ থেকে হজে আসা নারী-পুরুষ মিনায় আসা-যাওয়া করেন। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার হাজিরা সচরাচর এ সড়ক ব্যবহার করেন না। তবে পথ ভুলে অনেকেই এ সড়কে এলেও আসতে পারেন বলে মনে করেন অনেকেই। আগের দিন (৯ জিলহজ) মোজদালিফায় সারা রাত অবস্থান শেষে পর দিন (১০ জিলহজ) সকালে এই সড়ক দিয়ে শয়তানকে পাথর মারার উদ্দেশ্যে মিনায় আসছিলেন। এখানে কয়েকটি ফ্লাইওভার ও সংযোগ সড়ক রয়েছে। ঘটনার দিন এ পথ দিয়ে সৌদি যুবরাজের ভাতিজার নিরাপদ চলাচলের জন্য কর্তব্যরত নিরাপত্তা বাহিনী সড়কে আগেই ব্যারিকেড দেয়। অসংখ্যা হাজি ব্যারিকেডে আটকে থাকেন দীর্ঘ সময়। এক পর্যায়ে অনেক হাজি উল্টো দিকে ঘুরে ভিন্ন পথে পাথর নিক্ষেপের স্থলে যাওয়ার চেষ্টা করলে শুরু হয় বিপত্তি। বিপরীত দিক থেকে আসা হাজিদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি, হুড়াহুড়ি শুরু হয়।
বাংলাদেশের হাজি ও ময়মনসিংহ পৌরসভার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ সুলতান আহমেদও আকস্মিকতায় এর মধ্যে আটকে পড়েন। তিনি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘ঘটনার আকস্মিকতায় কিছু বুঝে ওঠার আগে সবার মধ্যে ছোটাছুটি, হুড়াহুড়ি শুরু হয়ে যায়। আরবি ভাষায় একে অন্যের মধ্যে উচ্চবাচ্য চলে। হুড়াহুড়ি ও ছোটাছুটি অব্যাহত থাকে। নারী-পুরুষের কান্নাকাটি, চেঁচামেচি শুরু হয়। এ দৃশ্য দেখে ভেবেছিলাম, আমি হয়তো আর বাঁচব না; কিন্তু ঠেলাঠেলির মধ্যেই আল্লাহর অশেষ কৃপায় আমি আপনা-আপনি নিরাপদ স্থানে চলে যাই। না হলে হয়তো আমাকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হতো।’ ময়মনসিংহ সদরের দলিল লেখক হাজি ইউসুফ আলীর অভিযোগ, শত শত হাজি একসঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখলেও পুলিশ তাদের সাহায্যে কাউকে এগিয়ে আসতে দেয়নি। লাশগুলো ময়লা পরিষ্কারের যন্ত্র দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়েছে। এর আগে নারী ও পুরুষের লাশ আলাদা করে রাস্তায় স্তূপ করে রাখা হয়। বাংলাদেশ থেকে আসা মেডিকেল টিমের প্রধান ডা. খিজির হায়াত খান জানান, এমনিতেই তাপমাত্রা ছিল ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার ওপর আরাফাত ময়দান ও মুজদালিফা হয়ে মিনায় আসার পর অনেকে ছিলেন ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। পানিশূন্যতায় ভুগছিলেন অনেকে। এ অবস্থায় প্রখর রোদে ব্যারিকেডে আটকা পড়া হাজিরা হিটস্ট্রোকে রাস্তার ওপর পড়ে যান।
নিখোঁজদের জন্য ব্যাকুল-উৎকণ্ঠায় মক্কায় হাজিরা : সরেজমিন মিনায় তাঁবুতে থাকা বাংলাদেশি হাজিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্ঘটনার দিন তাঁবুতে অবস্থান নেওয়া হাজিদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ ছিল না। বাংলাদেশের হাজি কেউ মারা গেছেন কি-না সেই খবর জানতে উদগ্রীব ছিলেন তারা। অনেকেই ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বেষ্টনীর বাইরে যেতে দেয়নি। তবে পদপিষ্ট হয়ে নিহত ও নিখোঁজদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি রয়েছেন, সে ব্যাপারে খোঁজ নিতে হজে আসা ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানসহ অন্যান্য মন্ত্রী সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাসকে নির্দেশ দেন। হাসপাতালসহ ঘটনাস্থলে যেতে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়। মিনায় ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে জোহর, মাগরিব ও এশার নামাজে নিহত হাজিদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মিনায় বিশেষ দোয়া মোনাজাত হয়েছে। রবিবার পর্যন্ত জেদ্দায় হজ মিশনের সামনে কয়েকশ’ বাংলাদেশি হাজিকে মিনার ঘটনায় নিখোঁজদের ব্যাপারে খোঁজ নিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তারা অভিযোগ করেন, মিশনের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করে কোনো তথ্য দিচ্ছে না।




