প্রতীক ওমর, বগুড়া : বগুড়ার সারিয়াকান্দি যমুনার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পশ্চিম তীরে ভেঙে যাওয়া নতুন অংশের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন না হতেই দুই কিলোমিটার বাঁধে ঘরবাড়ি তুলেছে নদী ভাঙা মানুষ। ৯ মের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নোটিশ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কুতুবপুর থেকে চন্দনবাইশা রহদহ পর্যন্ত এ দুই কিলোমিটার ঘরবাড়িসহ সকল স্থাপনা নিজ উদ্যোগে সরিয়ে নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। এতে দিশেহারা হয়ে পরেছে নদী ভাঙা ২৭০ পরিবারের প্রায় দেড় হাজার মানুষ।

এক সপ্তাহ আগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সারিয়াকান্দি দপ্তর থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন না হওয়া এবং বাঁধ সুরক্ষা ও বনায়নের জন্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের এ নোটিশ দেয়া হয়। এক মাস আগেও এরকম একটি নোটিশ দেয়া হয়েছিল।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বগুড়া অফিস থেকে জানা গেছে, ২০১৩-১৪অর্থ বছরে জলবায়ু ট্রাষ্ট ফান্ডের আওতায় ৩ দশমিক ৭০ কিলোমিটার বিকল্প বাঁধ নির্মাণের প্রকল্পের আওতায় বাঁধটি নির্মাণ করা হয়। এর ব্যয় ছিল ৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
বাঁধের উপর আশ্রয় গ্রহণকারীরা জানান, বিকল্প বাঁধটি নির্মাণের শেষ হওয়ার পরপরেই ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় গৃহহীন ২৭০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। এক বাঁধ নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পর নতুন আরেকটি বাঁধ নির্মাণ হলে এখানে বসতি স্থাপন করে এসব নদী ভাঙা মানুষ। তাদের কোন উপায় না থাকায় বাঁধকেই তারা আশ্রয়ের ঠিকানা হিসাবে বেছে নেয়। যুগযুগ ধরে এভাবেই বসবাস করে আসেছে যমুনা পারের ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষ। এসব মানুষের অধিকাংশের একমাত্র পেশা দিনমজুরি না হয় ভিক্ষাবৃত্তি।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নেয়া দুলাল প্রামানিক (৫৫) বলেন, ‘বান্দের উপর কি হামরা শখ করে আছি। বান্দের উপর বাস করা খুবই কষ্টের কিন্তু কি আর করমু। একদিন কামলা না দিলে বউ ছোলের পেটত ভাত পরে না। যদি অন্য কোন উপায় থাকলো হিনি তাইলে আগেই জমি কিনে বাড়ি করলেম হিনি। সরকারের লোকেরা আংগেরে বাড়ি ঘর ভাঙগে দিবার চাছে। শুক্রবারের মধ্যে যদি হামরা ঘর না ভাংগি তাইলে সরকারের লোকেরা পুলিশ আইনা মেশিন দিয়ে ঘর দুয়ের ভাংগে দিবি। এখন তোমরাই কও দেখি হামরা এখন কুনটি যামু বাপো।’
বাঁধে আশ্রয় গ্রহণকারী হত দরিদ্র মানুষ কি ভাবে থাকে চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নাই। অধিকাংশ মানুষের বুকের হাড় গোণা যায়। পড়নে ছেঁড়া- ময়লা কাপড়। চিকিৎসা পাওয়া এদের কাছে দূর্লভ ব্যাপার। অভাবের কারণে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে চান না। আবার স্কুলে আসলেও পরনের ময়লা জামা কাপড় দেখে সহজেই অনুমান করা যায় বাঁধে থাকা শিশু।
গত বন্যায় কুতুবপুর ইউনিয়নের কর্ণীবাড়ি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে এসব পরিবারের ঠাঁই ছিল। যমুনা নদী গর্ভে ঐ বাঁধ বিলীন হওয়ায় পশ্চিম পাশ দিয়ে আরেকটি রিং বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ওই সব ছিন্নমূল মানুষ নতুন করে এই বাঁধে আশ্রয় নেয়। নদী সিকস্তিরা কেউ পঞ্চম কেউ বা সপ্তম বারের মত জায়গা বদল করে নতুন বাঁধে ঘর-দরজা তোলার উদ্যোগ নেন। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীরা প্রথমে বাঁধে ঘর উঠাতে দিতে না চাইলেও পরে প্রতি হাত জায়গার জন্য ১০০-১৫০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে ঘর তোলেন। একেকটি বসত বাড়ির জন্য ওই দরিদ্র পরিবারকে ৭-৮হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে। এভাবে ২৭০টি পরিবার ঘর তুলে মাথা গোঁজার আশ্রয় খুঁজে পায়। কিন্তু ঘর তোলার পরপরেই বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোড জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন মহলে নজরে আসে। এরই মধ্য ২৭০টি পরিবারের বসতঘর উচ্ছেদের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে আগামী শুক্রবার ৯ মের মধ্য স্ব-উদ্যোগে বসতবাড়ি সরিয়ে নিয়ে যেতে সংশ্লিষ্টদের জরুরি নোটিশ দেয়া হয়েছে।
এব্যাপারে বাঁধে আশ্রয় নেয়া কাশেম প্রামানিক জানান, সরকার আমাদের ঘর উঠিয়ে দিয়ে এজায়গায় বন বিভাগ বাগান করতে চাইছে। এর আগেও বাঁধে বাগান করা হয়েছিল। প্রচুর গাছ-পালা ছিল কিন্তু রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীরা গাছ কেটে নিয়ে গেলেও তাদের কিছুই করা হয়নি। উচ্ছেদের নোটিশ পেয়ে আমাদের এখন নির্ঘুম রাত কাটছে। আমরা জান দেব তবুও বাঁধ ছাড়বো না।
সারিয়াকান্দি উপ-বিভাগীয় প্রকৌশল মো ঃ আরিফুল ইসলাম জানান, বাঁধটি এখনো কিছু কাজ বাঁকি আছে। এখনো কাজ শেষ হয়নি। বাঁধ নির্মাণ শেষে প্রকল্পের প্রধানরা পরিদর্শন করবেন। তার পওে বাঁধ ছেড়ে দেয়া হবে। এরপর বাঁধ সুরক্ষার জন্য বন বিভাগ বনায়ন করতে পারে। বর্ষা মৌসুমে বাঁধের নিরাপত্তা ও বাঁধের স্থায়িত্ব সব মিলিয়ে এলাকার সার্থে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।




