আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি : একমাস আগে ধান ঘরে উডাইছি, মাত্র সাড়ে তিনমাসে পাইক্ক্যা যায়, ফলনও অইছে প্রায় দুইগুন। মোরা এতাদিন তো এই ধানই বিচরাইছি। খ্যাতের দিগে চাইলে পড়ানডা জুড়াইয়া যায়। কৃষক মো. আলতাফ গাজী ক্ষেত ভরা পাকা ধান কাটতে এসে এমন করেই আনন্দ প্রকাশ করলেন। আলতাফ গাজীর মত বরগুনার আমতলী উপজেলার মনিকঝুড়ি এলাকার আরও পাঁচজন কৃষক মোট ৫একর শাখারিয়া গ্রামে আলতাফ হোসেনসহ ৫ একর কেওয়াবুনিয়ার ফারুক হাংসহ ৫ জন ঘটখালীর শাহালোম সিকদারসহ ৫জন প্রত্যোকে এক একর করে জমিতে উন্নত জাতের ধান ধানের আবাদ করেছেন কাংখিত ফলন পেয়ে মহাখুশী।

বৈষ্মিক উষ্মায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় কৃষির দূর্যোগ প্রবনতা মূল্যায়ন ও সাইক্লোনের ব্যপক ধ্বংস এড়িয়ে চলার কৌশল হিসেবে সরকারের কৃষিবিভাগ বরগুনা জেলায় এ এইউআই এফ – হ্যাকেপ নামের গবেষনামূলক একটি প্রকল্প বাস্তবাযন করছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগের সহায়তায়ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষকদের সহায়তায় এ বছর জেলার আমতলী, বরগুনা সদর ও পাথরঘাটা উপজেলায় প্রাথমিক পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ বছর জেলার মোট ৫০ জন কৃষক আমন ও রবি মৌসুমে আলোক অসংবেদশীল, স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট এপ্রিল ও অক্টোবর মাসে মধ্যে কর্তনযোগ্য ধান চাষ করে। কৃষকদের প্রশিক্ষন ও নানা পরামর্শ দিয়ে সফলভাবে এ ধানের উৎপাদন করা হয়। প্রকল্পের আওতাধীন জমিতে স্থানীয় জাতের চেয়ে প্রায দ্বীগুন ফলন লাভ পেয়েছে কৃষক। এক একর জমিতে এ পদ্ধতিতে ধানের আবাদ করেছিলেন কৃষক শাহলোম শিকদার। তিনি বলেন, ‘ধান লাগাইয়া মোরা লোকাল ধানের চাইতে প্রায় এক দেড় মাস আগে ধান ঘরে উডাইতে পারছি। ফলনও পাইছি দুই গুন। হেরপর এমন সময় ধানডা ওডছে যে এক্কালে হুগনার ছিজন।
কোন ঝামেলা নাই। এহন হইতে মোরা প্রত্যেক বচ্ছর এই ধান লাগামু’। জামালের ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে অন্যান্য কৃষকরা বলেন এমন ধান আবাদ না করে ভুল করেছেন চোখেমুখে এমন ভাব ষ্পষ্ট। এলাকার কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, আগামীতে মোরা সবাই এই ধান লাগামু কইরা চিন্তা করছি। জলবায়ু পরিবর্তনে কৃষি উৎপাদন ঝুঁকি এড়াতে সরকারের এমন প্রকল্প যে কতটা সফল হতে চলেছে ও বরগুনার কৃষিতে বিল্পব ঘটাতে চলতে কৃষক আলতাফ গাজীর বক্তব্যে তা ষ্পষ্ট।
রবিবার সকালে আমতলী উপজেলার মনিকঝুড়ি এলাকায় প্রকল্পের সফল শষ্যকর্তন ও কৃষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এসময় উপস্থিত ছিলেন,বরগুনা জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল ওহার ভুঞা, কর্তন অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তা ছিলেন হ্যাকেপ প্রকল্পের বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধি ডঃ সিরো নাকাতা, প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের উপ-ব্যাবস্থাপক প্রফেসর ড. এমএ হালিম, জেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম মাতুব্বর , সহকারী কমিশনার ভূমি দেবেন্দ্র নাথ উরাও ,আমতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহআলম,সহ প্রকল্পের আওতাভুক্ত কৃষকা-কৃষানীরা।
প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের উপ-ব্যাবস্থাপক প্রফেসর ড. এমএ হালিম বলেন, বৈষ্মিক উষ্মায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্নিঝড় ও জলোচ্ছাসের প্রবনতা প্রতিবছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বছরের নভেম্বর ও মে মাসে সংগঠিত এসব প্রাকৃতিক দূর্যোগে উপকূলীয় এলাকার ব্যপক ফসলহানী হয়। বিষয়টি বিবেচনায় এনে সরকারের কৃষিবিভাগ প্রকল্পটি হাতে নেয়। প্রকল্পের আওতায় আমন ও রবি মৌসুমে অসংবেদশীল, স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট এপ্রিল মাসের মধ্যে কর্তনযোগ্য ফসলের চাষ করা হয়। এতে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক দূর্যোগ ঝূঁকিমুক্ত অপরদিকে প্রায় দ্বীগুন ফলনের শষ্য উৎপাদন সম্ভব হয়। দেশের উপকূলীয় বরগুনা জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে আমরা এ ধরনের ফসল ফলিয়ে সফলভাবে উত্তোলন করতে সমর্থ হয়েছি। পর্যায়ক্রমে গোটা উপকূলীয় এলাকা এ ফসল চাষের আওতায় আসবে বলে তিনি জানান।

বৈষ্মিক উষ্মায়নের প্রভাব মোকাবেলা করতে কৃষি খাতে সরকারের এ ধরনের উদ্যোগে ব্যপক সাড়া মিলেছে। কৃষিবিভাগের সহায়তা অব্যহত থাকলে উপকূলে এ ধরনের ফসল আবাদে ব্যপক সাড়া মিলবে বলে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা। মনিকঝুড়ির কৃষক আলতাফ গাজীর কর্তনকৃত ক্ষেতে ৬.৫০ মেঃ টন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে।




