মো. ফরিদুজ্জামান, শেরপুর : কৃষকের প্রাণের দাবি খরস্রোতা সোমেশ্বরী নদীর উপর প্রাক্কলিত রাবারড্যাম প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় কৃষকের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন দু:স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। কথিত আছে ‘কৃষক বাঁচলে, দেশ বাঁচবে’, কৃষি আর কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনে শেরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকা ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নে ২০০৩ সালে সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয়েছিল আয়নাপুর রাবারড্যাম প্রকল্পটি। স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে নির্মাণ কাজ শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত কাজ শেষ না হতেই উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের প্রবলস্রোতের তোড়ে সোমেশ্বরী নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় ওই প্রকল্পটি। বিগত ২০০২-০৩ অর্থ বছরে সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে রাবারড্যাম প্রকল্পটি শুরু করলেও এর শেষ রক্ষা হয়নি। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার জন্য কাজ শুরুর মাঝামাঝি পর্যায়েই ওই এলাকার হতভাগ্য কৃষকের স্বপ্ন যেই তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে যায়। আজও বাস্তবায়িত হয়নি কাঙ্খিত সেই রাবারড্যাম প্রকল্পটি।

এ ব্যাপারে স্থানীয় লোকজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাবারড্যাম প্রকল্পটি শুরুর প্রাক্কালে আয়নাপুর বাজার সংলগ্ন স্থাপনে স্থানীয় এলাকাবাসী এর বিরোধিতা করলেও তা তোয়াক্কা না করে প্রকল্পটির নির্মাণ স্থান মাত্র ৩৫ মিটার হওয়ায় অধিক লাভবানের আশায় স্থানীয় প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের মনগড়ায় প্রকল্পটি বাজার সংলগ্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রকল্পটি বিলীন হওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেন- বর্তমান বিলীন হওয়া প্রকল্প থেকে ৩ কি. মি. উত্তর-পশ্চিমে বালিজুরী এলাকায় ওই সোমেশ্বরী নদীর প্রস্থ ১শ ৪০ মিটার হওয়ায় প্রবল স্রোতের চাপ কম পরিধির এ প্রকল্পের উপর আঘাত হানায় পানি প্রবাহের ক্ষমতা না থাকায় প্রকল্পটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। রাবারডেম প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ওই এলাকার প্রকল্পের উভয় পার্শ্বে প্রায় ১০ হাজার কৃষক পর্যাপ্ত সেচের অভাবে বোরো মৌসুমের চাষাবাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রকল্পটি পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় যথোপযুক্ত স্থানে নির্মাণ করা হলে আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের হাজারও কৃষকের প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে রাবারড্যাম প্রকল্পের পানি ব্যবহার করে শুধু বোরোই নয়, বিভিন্ন চাষাবাদে সুফল পাবে। উত্তর পাশে কাংশা, পানবর, চকপাড়া, পশ্চিম বাকাকুড়া, শিমূলকুচি এবং দক্ষিণ পাশে নাচনমহুরী, কাড়াগাঁও, দুপুরিয়া, বিলাসপুর এসব এলাকার প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমি নতুন করে বোরো মৌসুমের মুখ দেখত। ওই এলাকার অধিকাংশ মানুষের আবাদি জমির পরিমাণ বেশি থাকলেও বোরো মৌসুমে স্যালো বা গভীর কোন নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলনের ব্যবস্থা না থাকায় শুধু আমন ধানেই সন্তুষ্টি থাকতে হয় স্থানীয় কৃষকদের। রাবারড্যাম প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্থানীয় কৃষকরা পড়েছেন বিপাকে। তাদের বিশ্বাস ছিলো রাবারড্যাম হবে, হাজার হাজার একর জমি নতুন করে ফসলের মুখ দেখবে।
কথা হয় স্থানীয় কৃষক খোরশেদ আলমের সাথে। তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিক্ষেত্রে আমাদের স্বাবলম্বীতার পাশাপাশি কৃষিতে অবদান রাখতে পারব। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের যোগসাজস, অবহেলা আর অর্থের হীন্যমনতায় কৃষকদের স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে এলাকাবাসী স্থানীয় এমপি একেএম ফজলুল হক চাঁনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করেও কোন সুফল পায় নি।
অন্যদিকে ওই উপজেলার আয়নাপুর বাজার রক্ষা বাঁধের অবস্থা খুবই নাজুক। উজান থেকে পাহাড়ি ঢলে বাজার রক্ষা বাঁধকে বিধ্বস্ত হলেও সরকারীভাবে কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করায় ওই এলাকার একমাত্র বাজারটিও ঝুকির মধ্যে রয়েছে। বাঁধের বড় বড় ভাঙ্গনগুলি স্থানীয়দের নিজস্ব উদ্যোগে বাজারের একাংশ রক্ষা হলেও বাঁধ সংলগ্ন ওই এলাকার একমাত্র সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি মারাত্মক ঝুকিপূর্ণ হওয়ায় অন্যত্র পাঠদানের সাময়িক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। পাহাড়ি ঢল আর সোমেশ্বরী নদীর স্রোতের কবলে যে কোন সময় নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে ওই বিদ্যালয়টি। এছাড়া আয়নাপুর বাজার থেকে বালিজুড়ি ব্রীজ পর্যন্ত সাড়ে ৩ কিলোমিটার বাঁধের প্রয়োজন থাকলেও তন্মধ্যে ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ১শ ৫০ মিটার। তাদের দাবি, আগামী বর্ষা মৌসুমের পূর্বেই বাধটি পুন:নির্মাণ ও সংস্কারকাজ না করলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢল খরস্রোতা সোমেশ্বরীর ভাঙ্গনে বাজার রক্ষা বাঁধের দক্ষিণ পাশে উচ্চ বিদ্যালয়, দাখিল মাদ্রাসা, কওমি মাদ্রাসা, বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ ও পশু হাসপাতালসহ অনেকের বসতবাড়ী নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।
এব্যাপারে স্থানীয় প্রকৌশলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রকল্পটির নির্মাণকালীন সময় তিনি ছিলেন না বিধায় এ সম্পর্কে কোন মতামত দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে এলাকাবাসীর দু:খকষ্টের কথা মাথায় রেখে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশসহ অবহিত করার আশ্বাস দেন।




