শ্যামলবাংলা ডেস্ক : শুরু হয়েছে আগুন ঝরানো মার্চ। আমাদের স্বাধীনতার মাস। ১৯৭১ সালের এই মার্চেই স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুক্তিকামী দেশবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। সংগ্রামের মাধ্যমে মুক্তিকামী মানুষ জান বাজি রেখে স্বাধীনতার স্বপ্নকে রূপায়িত করেছিল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, শোষণ-বঞ্চনা, জেল-জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল বাঙালি। ওই সময়ের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে একক নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই চলত গোটা দেশ। তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের নেতা এবং পূর্ববাংলার গণমানুষের মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব নিয়েই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ একদিকে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান, অপরদিকে বাংলার আপামর জনগণের আস্থাভাজন নেতা হিসেবে একাত্তরের মার্চে একমাত্র বঙ্গবন্ধুরই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার এই সাংবিধানিক অধিকার ছিল। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের লাখো জনতার উপস্থিতিতে ওই ঐতিহাসিক ঘোষণার আলোকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু তার সাংবিধানিক অধিকার থেকেই ২৬ মার্চ মধ্যরাতে বিডিআর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর হিন্দু-মুসলমান দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভট সংজ্ঞায় প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান নামক দেশের যাত্রালগ্ন থেকেই শুরু হয় বাংলাভাষার মর্যাদার লড়াই এবং বাঙালির স্বাধিকারের সংগ্রাম। মাতৃভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলা ভাষা দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়ে বাঙালির অধিকার আদায়ের যে আন্দোলন ও সংগ্রাম শুরু হয়, তার সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের বুকের তাজা রক্তস্রোতের পথ ধরে একাত্তরের ২৬ মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। সেই বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের বিনিময়ে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেই বাঙালি জাতি খুঁজে পায় তাদের হারানো হাজার বছরের স্বপ্নসাধ স্বাধীনতা উদ্ধারের মূলমন্ত্র। চুয়ান্নর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের ভরাডুবি, ছাপ্পান্নতে এসে সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান, বাষট্টিতে শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ছিষট্টিতে লাহোরে ৬ দফার স্বাধিকার আদায়ের প্রস্তাব, আটষট্টিতে বঙ্গবন্ধুসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান- এ সব কিছুই অবদান রাখে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ধারাবাহিক সংগ্রামে। জনতার প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের মুক্তির পর রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে তৎকালীন তুখোড় ছাত্রনেতা ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদের প্রস্তাবে জনতার মুহুর্মুহু করতালির মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। ওই জনসভা থেকেই বঙ্গবন্ধু দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’ ও জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’র ঘোষণা দেন। নানা বিতর্ক এবং বিভ্রান্তি শেষে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্ট স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ২৬ মার্চের ঐতিহাসিক ঘোষণাকেই সঠিক ও প্রমাণিত সত্য বলে যে রায় দিয়েছেন, সেটিই এখন আইন। তারপরও একটি অন্ধ ও সবকিছু বুঝেও না বোঝার ভান ধরা গোষ্ঠী এখনও স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক তৈরির অপচেষ্টা করেই যাচ্ছে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাক হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে মানব ইতিহাসের যে জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, সেই পৈশাচিকতার ওপর ভর করেই ঘুরে দাঁড়ায় বাংলার অকুতোভয় দামাল সন্তানেরা। অবস্থা টের পেয়েই বঙ্গবন্ধু মধ্যরাতে গ্রেফতারের আগেই সুকৌশলে ঘোষণা করেন ‘বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা’। পরবর্তী সময়ে ২৭ মার্চ তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার সেই ঘোষণা পাঠ করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর হিসেবে ওই সময় তিনি পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে যুদ্ধজাহাজ সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাসের জন্য যাচ্ছিলেন। মুক্তির অদম্য স্পৃহায় উদ্দীপ্ত সমগ্র জাতি জীবন বাজি রেখে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে। একাত্তরের ১ মার্চ পাক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হঠাৎ করেই স্থগিত ঘোষণা করেন। জেনারেল ইয়াহিয়ার এ ঘোষণার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা। পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৫ ফেব্রুয়ারি ৩ মার্চের জাতীয় অধিবেশন বয়কটের যে আগাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার সঙ্গে তাল মেলানোর জন্যই যে অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন, তা আর বুঝতে কারও বাকি থাকে না। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার সূত্র ধরে ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে সমগ্র জাতি জোটবদ্ধ হয়ে প্রস্তুতি নেয় চূড়ান্ত যুদ্ধের। ঘরে ঘরে শুরু হয় প্রস্তুতি। তরুণদের রক্তে আগুন জ্বলে ওঠে। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সারা দেশের জেলা, থানা, ইউনিয়ন ও পাড়া-মহল্লায় গঠিত হয় সংগ্রাম কমিটি। সংগ্রহ হতে থাকে অস্ত্র। চলতে থাকে প্রশিক্ষণ। গড়ে তোলা হয় সর্বত্র প্রতিরোধ ব্যূহ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত প্রবাসী মুজিব নগর সরকার। আর এই প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি ফিরে পায় তাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার সাধ। একাত্তরের এই মার্চ মাসের মতো এমন অগ্নিঝরা, ঘটনাবহুল সমুজ্জ্বল কোনো মাস জাতির জীবনে আর আসেনি। তাই প্রতি বছরের মতো অগ্নিঝরা-রক্তঝরা আন্দোলন-সংগ্রাম আর প্রেরণার মাস মার্চ এলেই বাঙালির রক্তে শিহরণ জাগে। দোলা লাগে মনে। গর্বে ভরে ওঠে বুক। স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সেই গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলোর কথা। মহাকালের ঘূর্ণায়মান চাকায় ভর করে প্রতিবারই যখন সেই ঐতিহাসিক মার্চ মাস আসে, তখনই অসংখ্য গৌরবদীপ্ত স্মৃতির সাগরে ডুবে যায় গোটা বীরের জাতি। সেই জ্বলজ্বলে স্মৃতির পথ ধরেই স্বাধীনতার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য এগিয়ে চলেছে আজকের বাংলাদেশ।




