ইয়ানুর রহমান, যশোর : যশোরের অভয়নগরের চাপাতলা মালোপাড়ার মেয়েরা রাতে কেউই বাড়ি থাকছেন না। রাতের আঁধারে কখন কী হয়ে যায়-কেবল এই আতঙ্কেই মেয়েরা পার্শ্ববর্তী গ্রামের কারো কারো স্বজনের বাড়িতে রাতযাপন করছেন। শুধু তারাই নন, একই রকম আতঙ্ক বিরাজ করছে বাড়ির পুরুষ এমনকী সেখানে ক্যাম্প করে থাকা পুলিশদেরও মাঝে। সরেজমিন ওইসব তথ্য জানা গেছে।
যশোরের অভয়নগরের চাপাতলা মালোপাড়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর যশোরের অভয়নগরের চাপাতলা মালোপাড়ায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প করা হয়।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে যশোরের এসপি জয়দেব ভদ্র দাবি করেন, বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের লোকজন।
সরেজমিন ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, তারা বাড়ি ফিরছেন ঠিকই কিন্তু রাতে মেযেরা কেউই থাকছেন না। কথা হয় ক্ষতিগ্রস্ত মায়া রাণী বর্মণের সাথে। তিনি বলেন, আমাদের সবার মাঝেই আতঙ্ক রয়েছে। দিনের বেলা বাড়ি থাকছি, কিন্তু রাতে দিয়াপাড়ায় আত্মীয়বাড়িতে মেয়েদের নিয়ে থাকছি।
একই এলাকার তরুণ বিশ্বাস বলেন, আমাদের এই এলাকায় প্রায় ৬ শ’ মানুষের বসত। যার অর্ধেকই নারী। যাদের এক থেকে দেড় শ’ বাড়ির মেয়ে রাতে বাসায় থাকে না।
কথা হয় বিকাশ বিশ্বাসের সাথে। তিনি বলেন, নিজস্ব বিদ্যুৎ লাইন না থাকায় আমরা স্থানীয় কয়েক জামায়াতনেতার বাড়ি থেকে বিদ্যুতের সাইড লাইন নিয়ে থাকতাম। ভোটের দিন (৫জানুয়ারি) রাতে তারা বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়। এরপর অন্ধকার রাতে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর ভাংচুরসহ লুটপাট করে দুর্বৃত্তরা।
অভয়নগরের চাপাতলা মালোপাড়ায় দুর্বৃত্তদের তাণ্ডবের পর সারাদেশ আলোড়িত হয়। ঘটনার পরপরই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন সেখানে অস্থায়ী একটি ক্যাম্প স্থাপন করে। পুলিশ প্রশাসন এগিয়ে দেয় সহযোগিতার হাত। তারা যশোর পুলিশের একদিনের সমপরিমাণ অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরবরাহ করে।
স্থানীয়রা জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার পিছু জেলা প্রশাসন ৩০ কেজি করে চাল দিয়েছে। টাকা দেয়া হয়েছে দুই হাজার করে আর কম্বল একটি করে। এসব সহায়তা গোটা ত্রিশেক পরিবার পেয়েছে বলে তাদের দাবি।
স্থানীয়দের আতঙ্কের আরেকটি কারণ পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প। তাদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার উত্তরপাশে করা হয়েছে ক্যাম্পটি। গ্রামে প্রবেশের পথটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত। আরেকটি ক্যাম্প করা হয়েছে চেংগুটিয়া এলাকায়। যা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে প্রায় ৪ কিমি দূরে।
চাপাতলায় স্থাপিত অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ জানান, ভোটের দিন থেকে আমরা এখানে কাজ করছি। রাতে একটু সমস্যা হচ্ছে কেননা এখানে বিদ্যুৎ নেই। তাছাড়া ২০ সদস্যের এই ক্যাম্পটিও পর্যাপ্ত নয়।
এদিকে, চাপাতলা তাণ্ডবের সাথে জড়িত অভিযোগে গত দুদিনে ১২ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এর আগে মঙ্গলবার অভয়নগর থানার এসআই মহাসিন হাওলাদার ৩৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ২৫০ জনের নামে মামলা করেন।
চাপাতলা মালোপাড়ায় দুপুরে অবস্থান করছিলেন যশোরের জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান ও পুলিশ সুপার জয়দেব ভদ্র।
জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান ক্ষতিগ্রস্তদের পুণর্বাসন বিষয়ে বলেন, যতদিন পর্যন্ত তারা স্বাভাবিকভাবে কাজ-কর্মে যেতে না পারেন, সরকার তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেবে।
তিনি আরও বলেন, খুব শিগগির স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এখানে সর্বদলীয় একটি কমিটি গঠন করা হবে। যেখানে ক্ষতিগ্রস্তদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে।
রাতে মেয়েরা বাড়িতে থাকতে পারছে না বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে যশোরের পুলিশ সুপার জয়দেব ভদ্র বলেন, বিষয়টি তিনি জানতেন না। এখন অবহিত হলেন এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই পাড়ায় আর কোন জামায়াত-শিবিরের হামলা হবে না। যদি পুণরায় ওই ধরণের কোন ঘটনা ঘটে-তবে, তিনি যশোর ছেড়ে চলে যাবেন।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের মনের মাঝেই আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক করতে কাউন্সিলিং করতে হবে। বিদ্যুতের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি জানান, চাপাতলা হামলার সাথে জড়িত অভিযোগে দুপুর পর্যন্ত ২৬ জনকে আটক করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, রোববার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সন্ধ্যায় মালোপাড়ার ১২ বাড়িতে আগুন ও ১৩০ টি বাড়ি ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা।




