এক).
‘চিনি তাকে চিনি
ভাত ছেড়ে তিন বেলা তিনি খান রুটি
বেশি নয়, কম নয়, গুণে গুণে দুটি।
তেল আর চর্বি না জমে যেনো পেটে
তাই তিনি এলাকাটা ঘুরে নেন হেঁটে।
নিঃশ্বাস নেন তিনি খুব জোরে জোরে
চিরতার রস খান প্রতিদিন ভোরে।
ছোলা খান, মুলা খান, খান কচি শশা
টমেটোর সস খান, ভেজে খান মশা।
সিঁড়ি বেয়ে উঠানামা চারতলা ছাদে
শামুকের সুপ খান তেল নুন বাদে।
তবুও তো পেট তার কমেনা যে মোটে
দিনে দিনে সেটি যেনো ঢোল হয়ে ওঠে।
কী কারণ?কী কারণ? সুদখোর তিনি!
পেটমোটা মহাজন, চিনি তাকে চিনি।

দুই).
শীত সকালে
শীত সকালে ঘরের পাশে
সবুজ সবুজ দুর্বাঘাসে
শিশির কণা জ্বলে,
ঠাণ্ডা জলে হাঁসের ছানা
সাঁতার কাটে,ঝাঁকায় ডানা
হিজল গাছের তলে।
ডালিম গাছের আড়াল থেকে
দোয়েল পাখি যাচ্ছে ডেকে
হচ্ছেটা কী? বলে,
এসব দেখে ছোট্ট খুকি
আঁকছে খাতায় আঁকিবুকি
রঙ মিশানো জলে।
তিন).
থুত্থুরি এক বুড়ি
নানার ক্ষেতের চায়না মুলা
নানির হাতের মুড়ি
ভর্তা করে খাওয়ার পরে
গ্রাম এলাকা ঘুরি।
মোল্লা বাড়ির বরই গাছে
ইট দিয়ে ঢিল ছুঁড়ি
খেঁকখেঁকিয়ে খেঁকিয়ে আসে
থুত্থুরি এক বুড়ি।
বুড়ির মাথার চুলগুলি সব
ময়লা শনের নুড়ি
বয়স হবে তার আনুমানিক
কমকরে পাঁচ কুড়ি।
এই বুড়িটা খায় বেশি খুব
বিশ কেজি তার ভূঁড়ি
দুই হাতে তার ভাঙাচোরা
লাল পিতলের চুড়ি।

চার).
খেতে বসে
খেতে বসে
টেংরা এবং পুঁটিতে
মাছের কাঁটা
বিঁধলো সেদিন টুঁটিতে।
সেই কারণে
আছি এখন ছুটিতে
মগ্ন আছি
গান,কবিতা দুটিতে।
খাদ্যখানা
চলছে ডাল ও রুটিতে
মাংস ও মাছ
হচ্ছে না তাই কুটিতে।
নিষেধ আমার
বাইরে ছোটাছুটিতে
এইভাবে দিন
কাটছে মোটামুটিতে।
পাঁচ).
প্রতিদিন
প্রতিদিন ভোরবেলা
ঘুম থেকে উঠি
নামাজটা সেরে নিয়ে
রাস্তায় ছুটি।
হেঁটে হেঁটে পার হই
কতো ঘর বাড়ি
চোখে পড়ে সরিষার
ক্ষেত সারি সারি।
পাশ দিয়ে চলে গেছে
পথ আঁকাবাঁকা
ঠিক যেনো ছবি এক
পটুয়ার আঁকা।
চোখ ভরে দেখি আর
খুশি হই মনে
মিশে যাই আমি এই
প্রকৃতির সনে।’
কবি ও ছড়াকার নূরুল ইসলাম মনি সমকালীন বাংলা শিশুসাহিত্যের একজন নিভৃতচারী ও সমাজসচেতন শিল্পী। তাঁর ছড়ায় গ্রামীণ প্রকৃতি, নৈতিক শিক্ষা এবং সমাজের অসংগতিগুলো খুব সহজ ভাষায় ফুটে। তিনি মূলত শিশুদের জন্য ছড়া ও কবিতা লিখেন। তাঁর লেখনীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ছন্দোময়তা এবং সহজবোধ্যতা। তিনি জটিল বিষয়কে অত্যন্ত সরল শব্দে প্রকাশ করতে পারদর্শী। তাঁর ছড়ায় উঠে আসে বাংলার চিরচেনা প্রকৃতি, সাধারণ মানুষের জীবনধারা এবং সূক্ষ্ম বিদ্রূপের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের চেতনা।
তাঁর রচিত পাঁচটি ছড়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কবি এখানে তিনটি ভিন্ন ধারার (প্রকৃতি, বিদ্রূপ এবং জীবনবোধ) সমন্বয় ঘটিয়েছেন। যেমন –
ক) সমাজসচেতনতা ও ব্যঙ্গ (চিনি তাকে চিনি) : এই ছড়াটি চমৎকার একটি ‘স্যাটায়ার’ বা ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনা। এখানে ডায়েট কন্ট্রোল করা একজন মানুষের বর্ণনা দিয়ে শুরু হলেও, শেষে গিয়ে কবি এক চরম সত্য উন্মোচন করেছেন।
এখানে কবি বুঝিয়েছেন যে, কেবল পরিমিত খাবার বা শরীরচর্চা করলেই মানুষ ‘সুস্থ’ হয় না; যদি তার উপার্জনের উৎস (সুদখোর) কলুষিত হয়, তবে তার ভেতরে সেই পাপের প্রতিফলন (পেট ঢোল হওয়া) ঘটবেই। এটি একটি নৈতিক শিক্ষামূলক ছড়া।
খ) প্রকৃতির চিত্রায়ণ (শীত সকালে ও প্রতিদিন): এই দুটি ছড়ায় কবির নিপুণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ফুটে উঠেছে।
শীত সকালে: শিশির ভেজা ঘাস, হাঁসের সাঁতার কাটা আর খুকির ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে শীতের সকালের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে উঠেছে। এটি অত্যন্ত চিত্রল ।
প্রতিদিন: এ ছড়াটি শৃঙ্খলিত জীবনের জয়গান গায়। ভোরবেলা ওঠা, নামাজ পড়া এবং প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়ার মাধ্যমে একটি ইতিবাচক জীবনবোধের প্রতিফলন ঘটেছে। ‘পটুয়ার আঁকা’ উপমাটি গ্রাম বাংলার চিরকালীন সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছে।
গ) হাস্যরস ও গ্রামীণ জীবন (থুত্থুরি এক বুড়ি ও খেতে বসে): ‘থুত্থুরি এক বুড়ি’ মূলত এটি নিখাদ হাসির ছড়া। শৈশবে বরই পাড়া বা ঢিল ছোঁড়ার যে স্মৃতি আমাদের সবার আছে, কবি তাকেই এক শতায়ু বৃদ্ধার চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। ‘পাঁচ কুড়ি’ (১০০ বছর) বা ‘বিশ কেজি ভুঁড়ি’র মত অতিশয়োক্তিগুলো শিশুদের বিনোদিত করবে।
খেতে বসে: এটি একটি আত্মজৈবনিক মজার ছড়া। গলায় কাঁটা বিঁধে যাওয়ার মতো একটি ছোট দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে কবির ঘরবন্দি জীবন এবং তাঁর সাহিত্যচর্চাকে (গান, কবিতা) সহজ ছন্দে প্রকাশ করা হয়েছে।
নূরুল ইসলাম মনির ওই গুচ্ছ ছড়াগুলোর সাহিত্যিক মান বিচারে নিম্নোক্ত দিকগুলো লক্ষ্যণীয়-
ক).অন্ত্যমিল ও ছন্দ: তিনি মূলত স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের দোলা সৃষ্টিতে পারদর্শী। প্রতিটি ছড়ায় অন্ত্যমিল (যেমন: ছুটি-রুটি, বাড়ি-সারি) অত্যন্ত নিখুঁত।
খ). শব্দ চয়ন: তিনি অত্যন্ত পরিচিত ও দেশজ শব্দ (যেমন: পটুয়া, হিজল গাছ, শনের নুড়ি) ব্যবহার করেন, যা পাঠককে সহজেই মাটির কাছাকাছি নিয়ে যায়।
গ). জীবনবোধ: তাঁর ছড়া শুধু বিনোদনের জন্য নয়, এর পেছনে একটি গভীর জীবন দর্শন থাকে। বিশেষ করে লোভ, অসততা এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কের বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন।
উপসংহার : সামগ্রিকভাবে বলা যায় নূরুল ইসলাম মনির ছড়াগুলো সমকালীন শিশুদের নৈতিক অবক্ষয় রোধে এবং তাদের প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর ভাষা যেমন প্রাঞ্জল, ভাব তেমনি স্বচ্ছ।
লেখক : কবি, গীতিকার ও সাংবাদিক, সভাপতি, কবিসংঘ বাংলাদেশ।




