সরকারের মন্ত্রী পরিষদ সদস্য,শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবি, বিচারক, প্রশাসনিক আমলা, শিক্ষাবিদ, সামরিক জান্তা, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী থেকে শুরু করে অনেক বুর্জোয়া-ম্যুৎসুদ্দী তাদের শিক্ষা জীবন শুরু করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ’বাল্যশিক্ষা’ বই দিয়ে। বর্ণ শেখার পর পাঠ নিতে হয়েছে এভাবে- অজ, অথ, আম, আর, ইট, ইহ, ঈষ, ঐষ, উল, উব, এত, এব, ইত্যাদি শব্দ শিখে। আর হাতের লেখা লিখতে হয়েছে কলাপাতায় বাঁশের কঞ্চির কলম এবং সীমের পাতার কালি দিয়ে।

সেটা খুব বেশি দিনের কথা নয়, মাত্র ৫০/৫৫ বছর আগের কথা। পন্ডিত মশাই টুলে বসে মাদুড় পাতা বিছানো পাঠশালায় পড়াতেন ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের। শিক্ষার্থী বলতে জীর্ণ ও ময়লা পোশাক পরা, নোংরা চেহারার একদল গেঁয়ো (টোকাই) ছেলেমেয়ে। তাদের লেখাপড়া শেখার ব্যাপারে বাবা-মায়ের কোন গরজ ছিল না। পন্ডিত মশাই নিজেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৫ থেকে ১২ বছর বয়সের এসব ছেলে-মেয়েদের ধরে এনে তার পাঠশালায় শিক্ষার হাট বসাতেন। পড়া শিখে না গেলে কিম্বা স্কুল কামাই দিলে যে শাস্তি পেতে হতো এ কালের শিক্ষার্থী ছেলেমেয়েরা তা কল্পনাও করতে পারবে না। পন্ডিত মশায়ের বেত্রাঘাত খায়নি এমন ছাত্র-ছাত্রী ছিল না বললেই চলে। পন্ডিত মশায়ের নির্মম শাসনে কোন শিক্ষার্থীর অঙ্গহানি ঘটলেও কোন অভিভাবক নালিশ করার সাহস টুকুও পেত না। এমন কঠোর শাসনে যে শিক্ষার্থী টিকতে পেরেছে, সে-ই উচ্চ শিক্ষার দ্বার অতিক্রম করে মানুষের মত মানুষ হতে পেরেছে। তারাই আজ দেশ ও জাতির কাছে স্মরণীয় ও বরণীয়।
হাল আমলে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শাসনের নামে মারবেন তো দূরের কথা, একটু ধমক দিলেই সে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে। বিষয়টি একটু লঘুগুরু হলে সে শিক্ষকের বিরুদ্ধে শালিস বসে। শাস্তি লঘু না হয়ে একটু ভারী হলে আক্রান্ত শিক্ষার্থীর পক্ষে থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। এইচএসসিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত জনৈক শিক্ষার্থীকে একজন টিভি সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, বিজয় দিবস কবে? শিক্ষার্থী নিরোত্তর। শহীদ দিবস কবে? শিক্ষার্থী নিরোত্তর। স্বাধীনতা দিবস কবে? শিক্ষার্থী নিরোত্তর। বাংলা নববর্ষ কবে? শিক্ষার্থী নিরোত্তর। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী, শাহাদাত বার্ষিকী কবেÑ এমন প্রশ্নের জবাব তো আশাই করা যায়না। কেজি স্কুলের শিক্ষাদানের ফলেই শিক্ষার্থীর এমন পরিণতি হয়েছে। কারণ গাইড আর নোট বই অনুসরণ করা ছাড়া আর দাগানো প্রশ্নোত্তর মুখস্ত ছাড়া আর কিছুই পড়ানো হয়না। মজার ব্যাপার শিক্ষার্থীদেও অঙ্ক পর্যন্ত মুখস্ত করানো হয়।
বাংলা শিক্ষার গোড়া পত্তন হয়েছিল ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুর মিশনারিতে। দক্ষিণ-পূর্ব ভারতে খ্রীস্টান ধর্ম প্রচারে বাংলা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ায় পাদ্রীরা এই ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অবশ্য ধর্ম শিক্ষার জন্য মাদ্রাসা ও মক্তব অনেক আগে থেকেই চালূ ছিল। মুসলমানরা আরবী ও ফার্সী শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কট্টর মৌলবাদী মোল্লা মুন্সীদেও ফতোয়ার কারণে শুরু থেকেই মুসলমানরা ইংরেজী ও বালা শিক্ষা বর্জন করে। ফলে তারা ইংরেজি ও বাংলা শিক্ষা গ্রহণ থেকে অনেক পিছেয়ে পড়্।ে যার খেসারত আজও আমাদের দিতে হচ্ছে। অথচ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা ইংরেজি ও বাংলা শিক্ষা গ্রহণ করে তারা অনেক উন্নত জীবন-যাপন এবং অর্থনৈতিকভাবে সেই তখন থেকেই স্বাবলম্বী।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে অনেকেরই কমবেশি ধারণা আছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতি সম্পর্কে আমাদের মাথা ব্যথা নেই। বিশ্বায়নের যুগে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতি কেমন হওয়া উচিত? এটি অবশ্যই ভাববার বিষয়। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম স্থানে রয়েছে এবং আয়তনের দিক থেকে নব্বইতম স্থানে। তারপরও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটিতে বন্যার জলের মত হু হু করে বাড়ছে মানুষ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি সহনীয় পর্যায়ে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে আমাদের জাগ্রত হতে হবে। প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণার খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি এবং ইইউসি বাংলাদেশের মত সমস্যাবহুল দেশগুলোকে তাদের বাণিজ্য ও পণ্য কলোনীতে পরিণত করেছে। কোন সরকারেরই ক্ষমতা নেই তাদের বিরুদ্ধে ’টু’ শব্দটি করে। আমাদের শিক্ষা খাতেও পরিকল্পিত বাণিজ্য ঢুকে গেছে। গড়ে উঠেছে ব্যক্তি মালিকানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনেক আগেই গড়ে ওঠেছে।
প্রিয় পাঠক, ’আমাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতি কেমন হওয়া উচিৎ’ এর উপর দীর্ঘদিন গবেষণা করে একটি সন্দর্ভ (শিক্ষা ভাবনা তৃণমূল হতে) রচনা করেছেন সরকার আবুল হোসেন নামে একজন নিভৃতচারী গবেষক। সম্প্রতি এই গবেষকের সন্ধান পেলাম বিশিষ্ট ট্রেড ইউনিয়নিস্ট ও কেন্দ্রীয় শ্রমিকনেতা শ্রদ্ধাভাজন আঃ মোত্তালেবের মাধ্যমে। দশ ফর্মার সন্দর্ভটি (শিক্ষা ভাবনা তৃণমূল হতে) অত্যন্ত মনেযোগের সাথে পড়তে ও বুঝতে আমার সময় লেগেছে প্রায় এক মাস। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অতীত ও বর্তমান, শিক্ষাক্ষেত্রে দুূর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির চালচিত্র, শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও শিক্ষাদান পদ্ধতি, দেশে প্রচলিত দ্বৈত ও বহুমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মেধার অপচয় ও অবমূল্যায়ণ; সবকিছু মিলিয়ে আমাদের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ভয়াবহ ভঙ্গুর চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি তাঁর গবেষণা কর্মে। স্বাধীনতার তিন যুগ পরেও এই জাতির জন্য একটি সর্বজনীন শিক্ষানীতি প্রণীত হয়নি-একথা ভাবতেও অবাক লাগে। ‘শিক্ষা ভাবনা তৃণমূল হতে’ সম্পাদনা করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার।
গবেষক সরকার আবুল হোসেন পেশায় একজন সফল ব্যবসায়ী। থাকেন জামালপুরের যমুনা সার কারখানা এলাকায়। পূর্বেকার নিবাস সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে। ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে তিনি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্র অবলোকন করেছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে। এজন্য তাকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং তাকে একটি কলেজের দাতা-প্রতিষ্ঠাতা হতে হয়েছে। তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতা, দায়িত্ব পালনে তার প্রতি স্বার্থাম্বেষী মহলের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং স্থানীয় দূর্নীতিবাজদের আধিপত্য বিস্তারের ফলে প্রকৃত শিক্ষানুরাগী বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের শিক্ষাঙ্গনে ক্রমশঃ অনুপস্থিতি এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের আধিক্যের ফলে শিক্ষার যে বেহাল অবস্থা, শহুরে শিক্ষা আর গ্রামীণ শিক্ষার মাঝে আকাশ-পাতাল ব্যবধান, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, শিক্ষার্থীদের নকল প্রবণতা, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে অবনতি, পাঠ্য পুস্তকের চাইতে গাইডের প্রতি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ, শিক্ষকদের টিউশনি করার প্রবণতা বৃদ্ধি ইত্যাদি মিলিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রের যে করুণ চিত্র তিনি অঙ্কিত করেছেন তা রীতিমত চরম হতাশাব্যঞ্জক।
সরকার আবুল হোসেন তার গবেষণায় শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো শনাক্ত করার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশমালাও তুলে ধরেছেন। তন্মধ্যে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত দক্ষ, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে পরিচালনা কমিটি গঠন, শিক্ষার অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি, যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দান, উন্নত বিশ্বে শিক্ষকদের মর্যাদা যেভাবে সংরক্ষিত আছে, বাংলাদেশেও সে মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক সুষম শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সকল শিক্ষার্থীর শিক্ষাদানে যত্নবান ও আন্তরিক হতে হবে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করতে হবে। শহরের বাইরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধিক যোগ্য ও মেধা সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষকদের সম্মানজনক পে-স্কেল দিতে হবে। যা উন্নত দেশগুলোতে দেয়া হচ্ছে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বেকারত্ব নিরসনে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর আত্ম- কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে যদিও বেকার যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে থাকে। কিন্তু সেটা প্রয়েজনের তুলনায় সামান্যই বলা চলে। এটা তথ্য প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তি শিক্ষা সময়ের দাবি। মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার আগেই ওইসব শিক্ষর্থীদের প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষত করে তোলার প্রয়োজন।
যাহোক, সরকার আবুল হোসেনের গবেষণা সন্দর্ভটি সম্পাদনা করতে গিয়ে আমি এতটুকুই ধারণা পেয়েছি যে, একটি সুখি সমৃদ্ধি জাতি গঠনে আমাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতি কেমন হওয়া উচিত- গবেষক তার সন্দর্ভে সে দিক নির্দেশনাই দিয়েছেন। তার অনুচিন্তন, অনুশীলন, অনুচয়ন এবং অনুকম্পা সংবেদনশীল স্পর্শকাতর আবেগ প্রবণতাকে সাশ্রয় করেনি। ক’জন সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক ও পর্যবেক্ষক হিসেবে সরকার আবুল হোসেন বাস্তবতার নিরীখে যে মহৎ কাজটি কঠোর সাধনা, পরিশ্রম এবং অঢেল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে সমাধান করেছেন সে জন্য জাতি চিরদিন তার কাছে ঋণী থাকবে। এ দেশে গত পঞ্চাশ বছরে তেরটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে। কিন্তু কোন কমিশনের সুপারিশই বাস্তবায়ন হয়নি অথবা বাস্তবায়ন করতে দেয়া হয়নি।
একজন প্রচারবিমুখ নিভূতচারী গবেষক তার জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করে যে গবেষণা কর্মের মানকৃত অভীক্ষা রচনা করেছেন তার জন্য অবশ্যই তিনি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। পিএসসি, জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার স্বপ্নদ্রষ্টা সরকার আবুল হোসেনকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই এবং সে পান্ডুলিপিটি আমাকে সম্পাদনা করার সুযোগ দেয়ায় সংশ্লিষ্ট সকলকে সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানাচ্ছি। ‘শিক্ষা ভাবনা তৃণমূল হতে’ গ্রন্থটি একটি আকর গ্রন্থ উল্লেখ করে ভূমিকা লিখেছেন বাংলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক ড. আবুল কালাম মঞ্জুর মোরশেদ। জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী বইটির পরিবেশক। দাম ১৫০ টাকা। আশা করি, সরকারের নীতি নির্ধারণীমহল এই গবেষণা সন্দর্ভের প্রস্তাবনা বা নীতিমালা শিক্ষাক্ষেত্রের সর্বস্তরে সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এগিয়ে আসবে।
নিবন্ধকার : সিনিয়র সাংবাদিক, কবি ও কলামিস্ট, শেরপুর।




