শ্যামলবাংলা ডেস্ক : চট্টগ্রামের সদ্য প্রয়াত সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের রিমা কমিউনিটি সেন্টারে এ ঘটনা ঘটে। বেলা সোয়া ৩টার দিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটান পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, কমিউনিটি সেন্টারের গেট দিয়ে ঢোকার রাস্তাটি ঢালু। এই ঢালু রাস্তা দিয়ে প্রবেশের সময় কিছু মানুষ পড়ে যায়। এ সময় পদদলিত হয়ে ১০ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় কারো গাফিলাতি আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।

নিহতরা হলেন- প্রিন্সিপাল ঝন্টু, সুধীর দাস, কৃষ্ণ প্রসাদ দাস, প্রদীপ তালুকদার, লিটন দেবনাথ, দীপংকর দাস রাহুল, টিটু দাস, ধনসী, অলক বণিক ও কনক দাস। উল্লেখ্য, রিমা কমিউনিটি সেন্টারে খাবার আয়োজনটি ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য।
পদদলিত ঘটনার পর ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কমিউনিটি সেন্টারের বাইরে অনেক মানুষের ভিড় ছিল। ঢোকার সময় পেছনের চাপে সামনে ওই ঢালু জায়গায় থাকা বেশ কয়েকজন পড়ে যান। তখন তাদের ওপর দিয়েই পেছনের লোকজন হুড়মুড় করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। আর এতেই পদদলিতের ঘটনাটি ঘটে।
প্রসঙ্গত, গত ১৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী (৭৩) মারা যান।
নিজ বাসায় মৃদু হার্ট অ্যাটাক ও কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে গত ১১ নভেম্বর চট্টগ্রামের ম্যাপ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর একদিন পর মহিউদ্দিনকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় নিয়ে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে ১৬ নভেম্বর তাকে সিঙ্গাপুরের অ্যাপোলো গ্লিনিগ্যালস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে এএনজিওগ্রাম করে হার্টের দুটি ব্লকে রিং বসানো হয়। ডায়ালিসিসের জন্য কৃত্রিম ব্যবস্থা তৈরি করা হয় হাতে।
দেশ-বিদেশে বেশ সুখ্যাতি রয়েছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানের। আর রসনাপ্রিয় মানুষকে মেজবানের মাংস দিয়ে খাওয়াতে পছন্দ করতেন সদ্যপ্রয়াত ‘চট্টলবীর’ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। নগরীর চশমাহিলের বাসভবনে প্রতিদিনই বিপুল মানুষকে খাওয়াতেন তিনি। এজন্য বাসভবনের নিচতলার বড় অংশজুড়ে খাওয়ানোর জন্য রাখা হতো চেয়ার-টেবিল। দলের নেতাকর্মী হোক কিংবা সাধারণ কোনো মানুষ- কাউকে না খাইয়ে ছাড়তেন না তিনি। এখন তিনি নেই, চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আজ সোমবার তার কুলখানি। এ উপলক্ষে বিশাল কলেবরে আয়োজন করা হয়েছে তার প্রিয় সেই মেজবানি। সোমবার নগরীর ১৪ স্থানে দেড় লাখ মানুষকে খাওয়ানো আয়োজন করা হয়।
প্রতি বছর ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেজবানের আয়োজন করতেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। কয়েক বছর ধরে এভাবে টুঙ্গিপাড়ায় ঐতিহ্যবাহী মেজবানের আয়োজন করে হাজার মানুষকে খাওয়ানোর জন্য আলাদা একটি পরিচিতি লাভ করেন তিনি।
টুঙ্গিপাড়ায় মেজবানের আয়োজন করার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামকে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন। সর্বশেষ ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ব্যানারে প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে মেজবানি খাওয়ান তিনি। এর মধ্যে ২৬টি গরু জবাই করে ২৫ হাজার মুসলমান এবং ছাগল ও মুরগি দিয়ে ১৫ হাজার অন্য ধর্মাবলম্বীদের খাওয়ানো হয়।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেজবানের জন্য রোববার কেনা হয়েছে ১২৫টি গরু। হিন্দু সম্প্রদায় ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। মুরগির মাংসসহ আরও দু-তিনটি পদ দিয়ে তাদের আপ্যায়ন করা কথা ছিল।
চট্টগ্রাম নগরীর চশমাহিলের বাসভবন ছাড়াও মেজবানের আয়োজন করা হয়েছে- পাঁচলাইশ থানা সংলগ্ন কিং অব চিটাগাং, জিইসি মোড় সংলগ্ন কে স্কয়ার, জামালা খান মোড় সংলগ্ন রিমা কনভেনশন সেন্টার, চকবাজারের কিশালয় কমিউনিটি সেন্টার, পাঁচলাইশের সুইস পার্ক, লাভলেইন মোড়ের স্মরণিকা কমিউনিটি সেন্টার, শুলকবহের এন মোহাম্মদ কনভেনশন সেন্টার, এক কিলোমিটার এলাকার কেবি কনভেনশন সেন্টার, কাজীর দেউরি মোড়ের ভিআইপি ব্যানকুইট, আগ্রাবাদে গোল্ডেন টার্চ, উত্তর পাহাড়তলীতে সাগরকি কমিউনিট সেন্টার ও দক্ষিণ হালিশহরে মুনভিউ কমিউনিটি সেন্টার। নারীদের খাওয়ানো হবে চশমাহিলের বাসভবনে এবং মুসলমান ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদের খাওয়ানো হবে রিমা কমিউনিটি সেন্টারে।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল জানান, তার বাবার কুলখানি উপলক্ষে নিজ বাসভবনে ছোট পরিসরে মিলাদের আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া কুলখানি উপলক্ষে বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে মেজবানের আয়োজন রয়েছে।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করা ওসমান গনি সমকালকে বলেন, স্যার মেজবান দিতে ভালোবাসতেন। তিনি নেই। পরিবারের পক্ষ থেকে তার সেই প্রিয় মেজবানি দিয়ে মানুষকে খাওয়ানো হবে।
এদিকে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর তিন দিন কেটে গেলেও এখনও শোক কাটেনি। মানুষের মুখে-মুখে তার গুণগান। উঠে আসছে জানান-অজানা নানা বৈশিষ্ট্যের কথা। চশমাহিল এলাকা ও দোস্ত বিল্ডিংয়ে দলীয় কার্যালয়সহ নগরীর বিভিন্ন এলাকা ছেয়ে গেছে সাদা-কালো ব্যানার-পোস্টারে। শত শত মানুষ ভিড় করছেন তার কবরে।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর অবর্তমানে দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি বলেন, ব্যক্তি স্বার্থ ও ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। শোককে শক্তিতে পরিণত করতে।




