শিব শংকর কারুয়া
শেরপুরের কোন দুঃস্থ রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন। কোথায় যাওয়া যায়? কোন বিশেষ রোগীকে কোন বিশেষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন করতে হবে। সাহায্য করবে কে? কোন নারীর উপর নির্যাতন হয়েছে। প্রতিবাদ সংঘটিত করছে কে? কোন আর্ত মানবতার জন্য সহযোগিতা প্রয়োজন। এগিয়ে যাচ্ছে কে?- এই রকম শত প্রশ্নের উত্তরে একটি নামই সর্বাগ্রে মনে পড়ে- তিনি হচ্ছেন রাজিয়া সামাদ ডালিয়া। শেরপুরের ছোট বড় সকলেরই ডালিয়া আপা। সত্তুরোর্ধ্ব ডালিয়া আপা।
বয়য়ের ভারে ন্যূজ্য নন। বরং অনেক কম বয়সী মানুষের চেয়েও তিনি কর্ম চঞ্চল, প্রাণবন্ত, সদা হাস্যময়। কাজের ক্ষেত্রে নিষ্ঠাচারী। বাক্য বিনিময়ে বিনম্র সদালাপী।
কোন রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস থেকে নয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, হাতটা একটু বাড়িয়ে দেওয়া, সেবার ব্রত নিয়ে এগিয়ে যাওয়া- এই হচ্ছেন ডালিয়া আপা।
সমাজে অনেক মানুষই আছেন যারা খুব ভাল কথা বলেন। কিন্তু ভাল কাজে এক কদমও ফেলেন না। চারপাশের হাজারটা খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। আবার অনেক মানুষ আছেন। খরচ করবেন একশ টাকা। প্রচারে ঢাক ঢোল পিটিয়ে আকাশ মাথায় তুলে জানান দিবেন। তিনি কত কত বিলুচ্ছেন। ডালিয়া আপা এ দুটোর কোনটিও নন। ভাল কাজে তিনি নিজে ব্যয় করেন। অন্যদের কাছ থেকে আদায় করেন এবং নিজে মাঠে নেমে কাজ করেন।
রাজিয়া সামাদ ডালিয়া নিরবে একা একা কত কাজই না করছেন। কাউকে না জানিয়ে। কাউকে না বলে। প্রচারের বাঁশিতে ফুঁ না দিয়েই তিনি হেটেছেন শত শত মাইল। কিন্তু শেরপুরে ডায়বেটিক হাসপাতাল নির্মাণ তিনি আর লোক চক্ষুর অন্তরালে করতে পারলেন না। শুরু করেছিলেন নিজের বাড়িতে। এখন তা সুরম্য অট্টালিকায় হাসপাতালের নিজস্ব ভবনে নির্মিত। ভবিষ্যত পরিকল্পনা মেডিকেল কলেজ। তিনি শেরপুর রেড ক্রিসেন্টের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। শেরপুর খান বাহাদুর ফজলুর রহমান সরকারি গ্রন্থাকার তাদেরই দেয়া জায়গার উপর তার পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত।
পাতা বাহার খেলাঘর আসর শেরপুেেরর শিশু কিশোরদের জন্য নিবেদিত একটি সংগঠন। ১৯৭২ সাল থেকে কাজ করে যাচ্ছে। টিনের ভাঙ্গা ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে। বর্ষায় সাপ খোপ বাসা গাড়ে। খেলাঘর কমিটি সিদ্ধান্ত নিলো পাকা দালান তৈরী করবে। সিদ্ধান্ত নিয়েও কাজ হচ্ছে না। অর্থের অভাব। ডালিয়া আপা অভয় দিলেন এবং নিজে একটি বিরাট অংকের অর্থ তুলে দিলেন খেলা ঘরের হাতে। সাহসে ভর করে পাতাবাহার কাজ এগিয়ে চললো। খেলা ঘরের আজ একটি সুরম্য ঘর তৈরী হয়েছে। সকল প্রগতিশীল সংস্কৃতির লালন কেন্দ্র এই খেলাঘর।
বাঙ্গালী সংস্কৃতির অন্যতম পরিচয় পৌষ সংক্রান্তি পিঠা উৎসব। শেরপুরের মায়েদের বোনেদের মেয়েদের একত্রিত করে উজ্জয়ীনী নামের একটি মহিলা সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিবছরেই পিঠা উৎসব হচ্ছে ডালিয়া আপার আগ্রহে। তিনি এই সংগঠনেরও সভাপতি। দিন দিনই এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খান বাহাদুর ফজলুর রহমান ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় ও উজ্জয়ীনীর ববস্থাপনায় প্রতিবছর শেরপুরে দুই একবার বিনামূল্যে চক্ষু অপারেশনের আয়োজন করে থাকেন। এ ছাড়াও তিনি তার বাড়িতে রেখে কয়েকজন এতিম ছেলে-মেয়েদের লেখা পড়াও করাচ্ছেন। গরিব ও অসহায় পরিবারের মাঝে থাকার জন্য ঘরের ব্যাস্থা করে দেন।
হার্ট ফাউন্ডেশন রাজিয়া সামাদ ডালিয়া আপার একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। ইতোমধ্যে বেশ কিছু কাজ করেছেন হার্ট ফাউন্ডেশন ডায়াবেটিক হাসাপাতালের মতই। হার্ট ফাউন্ডেশন একদিন শক্ত মজবুত ভিত্তির উপর দাড়াবেই বলে ডালিয়া আপার বিশ্বাস।
সৃজনশীল মননশীল প্রগতিমুখীন সংস্কৃতি চর্চায় রাজিয়া সামাদ ডালিয়ার রয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান। জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ শেরপুর জেলার তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি বিটিভি এবং বেতারের সাথেও জড়িত ছিলেন।
রাজিয়া সামাদ ডালিয়ায় জন্ম ১৯৪৩ সালের ১ ডিসেম্বর। পিতা খান বাহাদুর ফজলুর রহমান। মাতা লুৎফুন্নেছা। অভিজাত পরিবারের মেয়ে ডালিয়া ব্যস্ত ঢাকার জৌলুস জীবন ছেড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল শেরপুর এলাকায় এসেছেন, থাকছেন শুধ্ইু মানুষের জন্য। আর্ত মানবতার সেবায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য। এ যেন মহান বাণীরই প্রতিফলন-
জীবে প্রেম করে যেইজন
সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি কলেজ, শেরপুর।





