আওরঙ্গজেব আকন্দ
বিশ্বকাপ ক্রিকেট, বিশ্বকাপ ফুটবল এর সাথে আরও একটি বিশ্ব প্রতিযোগিতা রয়েছে যেটির খোঁজ আমরা অনেকেই সচরাচর রাখি না। এ বিষয়ে জানার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও, আগ্রহে ঘাটতি রয়ছে। এ বিশ্ব প্রতিযোগিতাই বাছাই পর্ব খেলতে হয় না, নেই কোন প্রস্তুতি ম্যাচ খেলারও সুযোগ।তবে সুবিধা একটি আছে, যে যত দুর্বল দল, খেলাতে তার অংশগ্রহনের সুযোগ তত বেশি, প্রতিযোগিতায় তার অংশগ্রহন তত নিশ্চিত। এই উদার বিশ্ব প্রতিযোগিতার বিষয়টি এমন যে, দুর্বল পক্ষটি খেলতে না চাইলেও তাকে জোর করে খেলানো হবে। যুক্তিটি এমন যে শক্তিশালী পক্ষের সাথে না খেললে, শিখবে কিভাবে? কথাটি মূল্যবান, শক্তিশালী পক্ষের সাথে খেলেই খেলা শিখতে হবে। কি মহৎ, উদার বিশ্ব মুক্ত নীতি। হ্যাঁ, এই বিশ্বকাপের নাম, পুঁজিবাদী বিশ্বকাপ, উদার নীতির, মুক্ত বাণিজ্যের বিশ্ব প্রতিযোগিতা।

ক্রিকেট, ফুটবল বিশ্বকাপ নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর হলেও এ বিশ্ব প্রতিযোগিতা প্রতিমুহূর্তের। যে খেলার শক্তিশালী পক্ষটির সুচতুর রন-কৌশেলে কখনোই দুর্বলের বিজয়ী হওার সুযোগ নেই!বরংচ শক্তিশালী পক্ষের সাথে মাঠে নেমে খেলা শিখতে গিয়ে, সামান্য অসাবধানতায় হইত কোন দলের উদিয়মান খেলোয়াড়টিকে কিংবা আপনার যে দু একজন প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড় রয়েছে তাকে পঙ্গু করে দিতে পারে। এ খেলায় হলুদ কার্ড, লাল কার্ড শুধু দুর্বল দলের খেলোয়াড়দের জন্যই বরাদ্দ। তবে আইসিসি, ফিফার মত এ প্রতিযোগিতারও রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ।
আপনি খোঁজ রাখেন আর নাই রাখেন, ক্রিকেট, ফুটবল বিশ্বকাপ আপনার ব্যক্তিগত জীবন প্রভাবিত করুক বা নাই করুক, এই বিশ্ব প্রতিযোগিতা রাষ্ট্র, সমাজ থেকে আপনার ব্যক্তিগত জীবনে প্রতক্ষভাবেই প্রভাব ফেলছে। এ বিষয় বিশেষজ্ঞগনের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রয়েছে। শুধু প্রশ্ন রেখে মূল আলোচনাতে চলে যাব, কেন ট্রেন–এ সেবার মান না বাড়লেও, ভাড়াটা বেড়ে যাই নিয়মিত? কেন জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাই নিয়মিত?কৃষি ফসলের দাম না বারলেও, নিয়মিত বেড়ে যায় উৎপাদন প্রক্রিয়ার খরচ? একবার ভেবে দেখেছেন কি? বিষয়টি কি শুধুই সরাকারের একান্ত ইচ্ছায়? সরকার কি ইচ্ছে করলেই কোন পন্য বা সেবার দাম বাড়িয়ে দিতে পারে? নাকি এর পিছনে রয়ছে অন্য কোন প্রভাবক? নিয়ন্ত্রক? সরকার ইচ্ছে করলেই সব কিছু নিজের মত করে করতে পারে না, এটাই সত্য। মুক্ত বাণিজ্য নামক যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো আছে, রাষ্ট্র সে কাঠামোর একটি দুর্বল পক্ষ মাত্র। এ বিষয় বিশেষজ্ঞগনের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রয়েছে, অনেকেই বিশদভাবেই জ্ঞাত রয়েছেন। যাইহোক, আসুন খেলাতেই ফিরে যাই।

আগেই বলেছি, এ খেলারও আইসিসি, ফিফার মত নিওন্ত্রক সংস্থা রয়েছেন। এদের মধ্যে প্রধান হচ্ছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা(ডব্লিওটিও), বিশ্ব ব্যাংক(ডব্লিওবি) এবং আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল(আইএমএফ)। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা প্রতিযোগিতার সবার সমান সুযোগ করে দিতে কিছু শর্ত পালন আবশ্যক করেছে, যেটি মূলত মুক্ত বাজার অর্থনীতির মূল কথা, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শর্তগুলো হচ্ছে; কোন দেশ বাণিজ্যে অংশগ্রহণকারী পক্ষসমুহের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না, সবাইকে সমান সুযোগ দিতে হবে, সুযোগ না থাকলে কেউই পাবে না, দেশি ও বিদেশি পণ্যের মধ্যে পার্থক্য বা বিদেশী পণ্যের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না, সকল ধরনের বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা (টারিফ, শুল্ককর) দূর করতে হবে এবং কোনভাবেই চলমান টারিফ বৃদ্ধি বা কোন সুবিধা বাতিল করা যাবে না (ডব্লিওটিও ওয়েবসাইট)। বিশ্ব ব্যাংকের মতে, মুক্ত বাণিজ্যই হচ্ছে কার্যকরী বা সফল উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় উপাদান। বিশ্ব ব্যাংকের দাবী অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের যে দেশ যত মুক্ত বাজার অর্থনীতি বা উদারপন্থা অবলম্বন করবে সে দেশ তত বেশি দ্রুত উন্নতি করবে এবং এবং সে দেশের জনগণ তত বেশি সুযোগ সুবিধা পাবে (ডব্লিওবি ওয়েবসাইট, ট্রেড রেভিউ)। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) এর দৃষ্টিকোণ থেকে, দেশীয় বাজার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করলে, দেশীয় কোম্পানি প্রতিযোগিতার সুযোগ পায় এবং প্রতিযোগিতা পণ্য ও সেবার মান বৃদ্ধি পায়, সেই সাথে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়ে যায়। এই মুক্ত বাজার অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমুহের সার কথা হচ্ছে,“বৈষম্যহীন আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্য, পুঁজির অবাদ প্রবাহ নিশ্চিত করা, এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধিন প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণের মাধ্যমে, অর্থনীতির উপর সরকারের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনা।” এক কথায় পূঁজির আধিপত্য নিশ্চিত করা, যেখানে শ্রমের মর্যাদা উপেক্ষিত। বিশ্ব বাণিজ্য উদার অর্থনৈতিক নীতি, মুক্ত বাণিজ্যের বিশ্ব প্রতিযোগিতা, আমরা যেটিই বলি না কেন এদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্ব অর্থনীতি নির্ধারণের পুঁজিপতিদেরই একচ্ছত্র ও পরিক্ষিত প্রাধান্য থাকে।
আর এই পুঁজিবাদী দেশগুলোর মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে প্রথমই আলোচনায় আসে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে নাম দুটিই। কেমন ছিল যুক্তরাজ্যে ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি, বাণিজ্য নীতি, যখন তারা উন্নয়নশীল ছিল? যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র কি শুরু থেকেই এমন উদারপন্থা অবলম্বন করেই আজকে প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক বিশ্ব শক্তি? সবসময়ই তাদের বাজারে পুঁজির অবাদ প্রবাহে বিশ্বাসী ছিল? উন্নয়নশীল দরিদ্র দেশগুলোর জন্য উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়া তাদের বর্তমান নীতি এবং মুক্ত বাজার অর্থনীতিকে তারা যেভাবে তরান্বিত করছে সেটি বিশ্লেষণ করলে উত্তরটি দেওয়া খুবিই সহজ, অবশ্যই ‘হ্যাঁ’। কারণ এদের মতে কেবল মুক্ত উদার বাণিজ্য নীতিই উন্নয়নের একমাত্র উপায়। কিন্তু তাদের উন্নতির রহস্য বিশ্লেষণে যে উত্তরটি পাওয়া যায় সেটি হচ্ছে ‘না’। প্রকৃৎপক্ষে, পুঁজিবাদের ধারক, বাহক, প্রভাবক যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে তাদের উন্নতির শুরুর দিকে ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল, উদার অর্থনৈতিক নীতি বিরোধী ও মুক্ত বাণিজ্যে, বিশ্ব প্রতিজোগিতায় ছিল ভীতু প্রতিপক্ষ।
বর্তমান সময়ের একজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও লেখক, ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক স্যার হা-জুন চাং, তার “ Bad Samaritans: The Myth of Free Trade and the Secret History of Capitalism” শীর্ষক বইয়ে আজেকের পুঁজিবাদী চ্যাম্পিয়ন যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত চরিত্রকে, রঙ পরিবর্তনের কাহিনীকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বর্ণনা করেছেন।
অধ্যাপক হা-জুন চাং, পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা যখন পশ্চাদপদ ছিল তখনকার অর্থনৈতিক নীতি বিশ্লেষণ করেতে, লেখক ড্যানিয়েল ডুফো রচিত “ A Plan of the English Commrece (1728), গ্রন্থের সূত্রমতে বর্ণনা করেছেন, সে সময়, বিশেষ করে হেনরি-৭ম ও এলিযাবেথ-১ম –এর রাজত্বকালে ব্রিটেনের অর্থনীতি ছিল একটি অত্যন্ত রক্ষণশীল অর্থনীতি, দেশীয় পণ্য আমদানি-রপ্তানি ও দেশীয় শিল্পের উন্নয়েন ছিল রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ব্যবস্থা, বাজার ব্যাবস্থায় ছিল একচ্ছত্র রাষ্ট্রীয় আধিপত্য, এমনকি অন্য দেশের উন্নয়নশীল শিল্পের রহস্য জানতে সরকারী পৃষ্টপোশকতায় অবৈধ শিল্প গোয়েন্দা কার্যক্রম (industrial espionage)চালাতো। সে সময় ব্রিটিশরা সুতা ও পোশাক উৎপাদনকারি দেশ বর্তমান বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ড এ সুতা তৈরির কাঁচামাল হিসেবে তুলা রফতানি করত। আর সেই রপ্তানি আয়ই ছিল তাদের আমদানির ব্যয় মিটানোর বড় উৎস। যেহেতু সুতার কাঁচামাল রপ্তানির থেকে সুতা প্রস্তুত এবং প্রক্রিয়া করে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করা বেশি লাভজনক তাই হেনরি-৭ম, তার পূর্বসূরি এডওয়ার্ড ৩য় এর মতই কৌশলী হয়ে, ব্রিটেনে সুতা প্রস্তুত ও তৈরি পোশাক প্রস্তুতির কারখানা স্থাপনের জন্য, সুতা ও পোশাক উৎপাদনকারি অঞ্চল থেকে অপকৌশলে দক্ষ শ্রমিকদের প্রলোভিত করে ব্রিটেনে এনেছিল। পাশাপাশি সুতা ও পোশাক উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে তুলা রপ্তানির উপর কর বৃদ্ধি করে, এমনকি সাময়িকভাবে তুলা রপ্তানির উপর নিষেদাজ্ঞাও জারি করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল দুইটি একটি, দেশীয় বাজারে তুলা প্রক্রিয়ায়জাত করে সুতা প্রস্তুত ও পোশাক শিল্প গড়ে তোলা এবং অপরদিকে ব্রিটেনের এর তুলার উপর নির্ভরশীল অন্য দেশের পোশাক শিল্পকে বিপদে ফেলে নিজেরা বাজার দখল করা। কিন্তু বাস্তবতাটা ছিল এমন, তখনও ব্রিটেন যে পরিমান তুলা উৎপাদন করত, সে পরিমাণ তুলার সর্বোত্তম ব্যাবহার নিশ্চিত করতে ব্রিটেনের কোম্পানিগুলো ততটা পরিপক্ক হয়ে উঠেনি। যার ফলে, ব্রিটেনের রাজা আবারও নীতি পরিবরতন করে তুলা রপ্তানির উপর নিষেদাজ্ঞা উঠিয়ে নিলেন। অর্থাৎ নিজ দেশের সম্ভাবনাময়য় শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করতে, শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় উন্নয়নশীল ইংল্যান্ড তার নীতি পরিবর্তন করেছে, নিজের মত করে, যেখানে বৈষম্য সুস্পষ্ট।
বিশেষ করে, রবার্ট ওয়ালপল, প্রথম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, ১৭২১ সালের তার রাজত্বকালে ব্রিটেনের সুরক্ষিত বাণিজ্য নীতির মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শিল্প কারখানাকে বিদেশি কোম্পানির প্রতিযোগিতার হাত থেকে রক্ষা করা। দেশীয় কোম্পানির রপ্তানি বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির পাশাপাশি বিদেশি পণ্য আমদানির উপর ব্যাপকহারে আমদানি কর(গড়ে ৪৫-৫৫%)আরোপ করা হয়, সেইসাথে কাঁচামাল আমদানি কর হ্রাস করেন যেন দেশীয় ব্যবসায়ীরা দেশে উৎপাদন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করে চূড়ান্ত প্রস্তুতকৃত দ্রব্য অধিক লাভজনক উপায়ে রপ্তানি করতে পারে। তার এই রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতি পরবর্তী শতাব্দীতে ব্রিটিশ মানুফেকচারিং শিল্পকে ব্যাপক সাফল্য ও উন্নতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
এই রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতির পাশাপাশি, উপনিবেশ স্থানপনের মাধ্যমে শোষণ আর অপ-কৌশল এর ব্রিটিশ কাহিনী এই উপমহাদেশের ভালো করাই জানা। যেসকল পণ্য তাদের পন্যের সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোকে তারা কখনোই এমন পন্য প্রস্তুত করতে ও রপ্তানিমুখী হতে দিতেন না। এমনকি তাদের শিল্পের প্রতিযোগী রাষ্ট্রে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো থেকে কোন কাঁচামালও রপ্তানি করতেও দিত না। উল্লেখ্য যে ভারতীয় উপমহাদেশ শুরু থেকাই পোশাক উৎপাদন করত, যা সুস্পষ্টভাবেই ব্রিটিশদের পন্যের থেকে মানসম্পন্ন ছিল তাই সেই সময় তার উপনিবেশ রাষ্ট্র গুলোতে ভারত থেকে পোশাক আমদানি নিষিদ্ধ করে। ১৬৯৯ সালে ব্রিটিশ সরকার তার উপনিবেশ রাষ্ট্রগুলো থেকে অন্য রাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি নিষিদ্ধ করে যার ফলে আইরিশ পোশাক শিল্প ধ্বংশ হয়ে যায়।
অধ্যাপক হা-জুন চাং(২০১০), পুঁজিবাদী নায়ক, বর্তমান বিশ্বের মুক্ত বাণিজ্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বী চ্যাম্পিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের অতীত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নয়ের কৌশল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও ব্রিটেনের মতই রক্ষণশীল, সরকারী ভর্তুকি ও মানুফেকচারিং শিল্পের বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব প্রধান করেছিল। আলেক্সেডার হ্যামিলটন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অর্থমন্ত্রী, তার প্রথম অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে সুপারিশ করেন যে দেশের শিল্পের উন্নইয়নের জন্য বৃহৎ পরিকল্পনা দরকার। তার প্রতিবেদনের মূল বিষয় ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সম্ভাবনাময় শিল্পগুলো বিদেশি কোম্পানির প্রতিযোগিতার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে এবং সেগুলোকে ততদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে লালন পালন করতে হবে, যতদিন পর্যন্ত এই শিল্পগুলো বিশ্ব বাজারে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হইয়ে না উঠে। ইংরেজিতে এক কথায় যেটিকে বলা হয় “ইনফ্যান্ট ইন্ডাস্ট্রি প্রটেকশন”। হ্যামিলটন শিল্প উন্নয়নের জন্য, প্রস্তুতকৃত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা, ট্যারিফ সুরক্ষা নীতি গ্রহন ও শিল্পের কাঁচামাল রপ্তানি নিষিদ্ধ করেন কিন্তু শিল্প কারখানা তৈরি ও শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় আনুসাঙ্গিক যন্ত্রপাতি বা উৎপাদন সহায়ক দ্রব্য আমদানিতে উদারনীতি ও কর হ্রাস করেন। হ্যামিলটন এর সুপারিশমত বিদেশী পন্যের আমদানি ট্যারিফ ৫% থেকে বাড়িয়ে ১২.৫ % করা হয় যা পরবর্তীতে ১৮১২ সালে গড়ে ২৫%, ১৮১৬ সালে গড়ে ৩৫%, এবং ১৮২০ সালে গড়ে ৪০%-৫০% নির্ধারণ করা হয়। মূলত হ্যামিলটন এর “ইনফ্যান্ট ইন্ডাস্ট্রি প্রটেকশন” পরিকল্পনাই যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত উন্নতির পথ দেখায়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৬ তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংঙ্কন ও “ইনফ্যান্ট ইন্ডাস্ট্রি প্রটেকশন” নিতিমালাই সমর্থন ও প্রয়োগ করেন। পর্যালোচনায় দেখা যায় ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ছিল সবথেকে বেশি রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতির দেশ।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর থেকে আস্তে আস্তে যখনই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাজারে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিপক্ষ হইয়ে উঠে, যখন তার শিল্পগুলো বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য এক একটি পাকা খেলোয়াড় হয়ে উঠে, তখনি নতুন রুপে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কৌশলে মুক্ত বাণিজ্য নামক খেলায় জোর করে অংশ গ্রহণ করানোর পরিকল্পনা করে, যা বর্তমানে বাধ্যগত। এ যেন মেনে নেওয়া এক আধুনিক অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদ।
যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশী বিনিয়োগ ইতিহাসটি আরও চমকাপ্রদ। যে সকল উন্নয়নশীল দেশ নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত “ওপেন ডোর পলিসি” নামক নীতি গ্রহণ করছে তাদের জন্য একটি উদাহারনই যথেষ্ট। এন্দ্রো জ্যাকশন, যুক্তরাষ্ট্রের ৭ম প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন শুধু এই ভয়ে, যদি দেশে কোন যুদ্ধ শুরু হয় এবং বিদেশী ব্যাংক এ রক্ষিত তাদের অর্থ কোনভাবে বিনিয়োগকারী দেশের নিয়ন্ত্রনে চলে যায়, তবে সেটি হবে প্রতিপক্ষের নৌ বা সামরিক শক্তির থেকেও ভয়াবহ। তবে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ গ্রহণ করেছে কিন্তু ঢালাউভাবে নয়, অত্যন্ত সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে। বিদিশি বিনিয়োগ ছিল তাদের ব্যবস্থাপনায় সুনিয়ন্ত্রিত, বিদেশী নাগরিকগন কখনোই কোন ব্যাংকের পরিচালক হতে পারতেন না। সে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদে বিদেশী বিনিয়োগ ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত, কঠিন শর্তযুক্ত ইচ্ছে করলেই কেউ ভুমিতে বিনিয়োগ করতে পারতেন না। দেশি-বিদেশী কোম্পানির সুযোগ-সুবিধার মধ্যে পার্থক্য ছিল দৃশ্যমান। বিদিশে কোম্পানির উপর দেশি কোম্পানির তুলনায় অতিরিক্ত কর ধার্য করা হত, এমনকি আইনগত সুরক্ষাও থাকতো না অনেক ক্ষেত্রে।
অথচ বর্তমানে তারা মুক্ত বাণিজ্য, বিশ্বায়ন, বাণিজ্যের আন্তর্জাতিকীকরণের নামে উন্নয়নশীল দেশের উপর নানারকম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। শুরুর দিকে আমারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সার কথায় বলেছি ,“বৈষম্যহীন আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্য, পুঁজির অবাদ প্রবাহ নিশ্চিত করা, এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধিন প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণের মাধ্যমে, অর্থনীতির উপর সরকারের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনা।” আর ফলাফল হিসেবে বলা হচ্ছে দ্রুত জাতিয় উন্নতি ও জনগনের সেবার মান বৃদ্ধির জন্য মুক্ত বাণিজ্য আবশ্যক। অথচ ইতিহাস বলছে, এর কোন শর্তের সাথেই যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনের উন্নয়ন নীতিমালার মিলত নেই বরং সম্পূর্ণ বিপরীত নীতিতে তারা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হইয়েছে। রক্ষণশীল নীতি অনুসুরন করে যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেনের টেকসই উন্নয়নকে ব্যতিক্রম বলার উপায় নেই কারণ যুক্তরাষ্ট্র- ব্রিটেনের উন্নয়ন রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতি অনুসরন করেই জার্মানি, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, জাপান, তাইওয়ান, কোরিয়া দেশসমুহ দ্রুত অর্থনৈতিক স্থিতিশিলতা ও উন্নতি অর্জন করেছে।
প্রাসঙ্গিকভাবে বলতে হয়, বাংলাদেশ বিদেশী বিনিয়োগ এর জন্য যথেষ্ট উদারনীতি অবলম্বন সত্ত্বেও ইউনাইটেড ন্যাশন্স কনফারেনস অন ট্রেড এন্ড ডেভেলপমেন্ট (ইউএনসিটিএডি), বাংলাদেশের বিনিয়োগ নীতিমালা পর্যালোচনা (২০১৩) করে সুক্ষ ভাবে সমালোচনা করে আমাদের পোশাক ও ঔষধ শিল্পের আরও অধিক উদার নীতি অবলম্বনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রতিবেদেন সমালোচনা করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল পোশাক ও ঔষধ শিল্পের বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রিত করা হচ্ছে যা সার্বিকভাবে বাংলাদেশের মুক্ত বিদেশী বিনিয়োগ নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে বা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অথচ শিল্পের স্বার্থে ও জাতীয় উন্নতির স্বার্থে এই ধরনের নীতিই জরুরী যা পূর্বে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করেছিল।
পরিক্ষিত এই রক্ষণশীল বাণিজ্য বা “ইনফ্যান্ট ইন্ডাস্ট্রি প্রটেকশন” নীতিকে এখন উদার বাণিজ্য নীতি কাঠামোর অন্তরালে গুম করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে কোন উন্ননয়নশীল দেশের সরকার যদি এই নীতিমালা অনুসরন করে তাকে নিশ্চয় এক ঘরে হতে হবে, নিশেধাজ্ঞা ,অবরুধ ধেয়ে আসবে পৃথিবীর চারপাশ থেকেই। পুঁজিবাদী নিয়ন্ত্রিত এই সকল নিয়ন্ত্রক সংস্থা মূলত পুঁজিবাদীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিসয়গুলোই রক্ষাতেই বিভিন্ন গবেষনার মাধ্যমে নতুন নতুন কৌশল বের করে। এই সকল সংস্থার পরিক্ষিত নিয়ন্ত্রক পুঁজিবাদী দেশগুলোই। তাই উন্নত এ নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রগুলো এখনো তাদের ইচ্ছেমতই যা খুশি করার স্বাধীনতা রাখে।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রে গত ২৪ ফেব্রুয়ারী ট্যারিফ সংশোধন আইন পাস করেছে, যেখানে জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়ছে। বিষয়টি ইতিবাচ। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, আইনে আরও বলা হয়েছে বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীদের দিয়ে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে না (ডয়েচ ভেলে, ২৬.২.২০১৬)। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিভিন্ন শর্ত দিয়ে জিএসপি সুবিধা বাতিল করা হয়। রানা প্লাজা পরবর্তী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহনের মাধ্যমে বাংলদেশে শিল্প ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার নিশ্চিতের জন্য সরকার, ট্রেড ইউনিয়ন ও মালিক পক্ষ সকলেই আন্তরিকতার সাথেই কাজ করছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্পে কর্ম পরিবেশ উন্নয়নে সরকার, ট্রেড ইউনিয়ন ও মালিক পক্ষ একযোগে কাজ করছে, তুলনামূলকভাবে পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনাই উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন হয়েছে। অ্যাকর্ড এবং এলায়েন্স বাংলাদেশে পোশাক শিল্প খাতে কর্ম পরিবেশ নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত ২৪ ফেব্রুয়ারী ট্যারিফ সংশোধন আইন পাস করে যখন বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীদের দিয়ে তৈরি পোশাক অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পোশাক প্রবেশ নিষিদ্ধ করল ঠিক তখনি যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রি ডেসমণ্ড সোয়েইন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিষয়ে সে দেশের এক সাংসদের লিখিত প্রস্নের জবাবে বলেছেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশে অগ্রগতি হয়ছে এবং এ ক্ষেত্রে অ্যাকর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে (প্রথম আলো, ২৪.২.২০১৬)।
পোশাক শিল্প নিয়ে যেকোন দেশি বিদেশী পদক্ষেপ, লাল কার্ড, হলুদ কার্ড সব কিছুই সরকার যথেষ্ট সতর্কতার সাথেই বিবেচনা করবে বলেই প্রত্যাশা করি এবং এধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিদেশী প্রতিক্রিয়ার পিছনের অর্থ অনুসন্ধানের মাধ্যমে উৎঘাটন করাও জরুরী।
জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে আমাদের আন্তর্জাতিক নীতি ও নিয়মের সাথে সামঞ্জস্য করেই এগিয়ে যেতে হবে; বিশ্বায়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিদেশী বিনিয়োগ প্রক্রিয়াতেও উন্নয়নের স্বার্থে আমাদের সম্পৃক্ত থাকতে হবে, তবে তা হতে হবে অতি সাবধানী, সুনিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত। তবে সবকিছুই হতে হবে দেশের স্বার্থরক্ষা করে, নিজের শিল্পকে রক্ষা করে, ক্ষতিকর দিক পর্যালোচনা করে, পুঁজি ও শ্রম দুটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে। পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্ব ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে সরকারের যে সাহসী সিদ্ধান্ত এমনটা হতে হবে সকল জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রেও।
পুঁজিবাদীদের শক্তিশালী খেলয়ারদের যখন অতীত বর্তমান দুটি রুপী আমাদের জানা হল, তখন হইত খেলাটি আর বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা নেই, নিজের মত করে পক্ষ, প্রতিপক্ষ, রেফারি, নিয়ন্ত্রক নির্ধারণ করে খেলাটি সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতে থাকুন, আর সজাগ থাকুন দেশি বিদেশী সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকুন শুধুমাত্র একটি লাল সবুজের পতাকার নিচেই।
লেখক : সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস (লেবার পলিসি এন্ড গ্লোবালাইজেশন বিষয়ে গ্লোবাল লেবার ইউনিভার্সিটি, জার্মানিতে স্নাতকোত্তর অধ্যায়নরত শিক্ষার্থী), e-mail: aurongajeb@yahoo.com




