মো. মহসিন মাতুব্বর, আমতলী (বরগুনা) : সাগরে জলদস্যু বাহিনীর অত্যাচার আর ডাঙ্গায় মহাজনের দাদনের চাপে উপকূলীয় এলাকার জেলেদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। একে তো মৌসুমের শুরু থেকেই সাগরে ইলিশের দেখা নেই। তার উপর গত এক বছরে সাগরে প্রায় ৫ শতাধিক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এতে দেড় সহস্রাধিক জেলে অপহরণ এবং ৬ শতাধিক জেলে আহত হয়েছেন। অন্যদিকে মহাজনের দেনার ভয়ে অনেক জেলে এলাকা ত্যাগ করে চলে গেছেন। অনেকে ভিন্ন পেশা গ্রহণ করেছেন।
জানা গেছে, বরগুনা, পটুয়াখালীসহ উপকূলীয় এলাকায় প্রায় দেড় লক্ষাধিক জেলে রয়েছে। এদের অধিকাংশই ট্রলার মালিকদের সাথে মাসিক চুক্তিতে মাছ ধরার কাজ করেন। সাগরে মাছ ধরার আগে জেলেরা মহাজনের নিকট থেকে আগাম দাদন নিয়ে থাকেন। দাদনের টাকা মাছ বিক্রির মাধ্যমে শোধ করেন। কিন্তু এবার সাগরে মাছ না থাকায় জেলেরা পড়েছেন মহাবিপাকে। জুন থেকে শুরু হওয়া ইলিশের মৌসুম প্রায় শেষের দিকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাগরে জেলেদের জালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাছ পরেনি। মাছ না পড়ায় জেলে পাড়ায় এখন চলছে হাহাকার।
ফকিরহাটের জেলে জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘গত জুন থেকে এ পর্যন্ত মাছ ধরার জন্য প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, অথচ মাছ বিক্রি করে এ পর্যন্ত পেয়েছি মাত্র ৫০ হাজার টাকা। দুই লাখ টাকা দেনা আছি। এ টাকা কিভাবে পরিশোধ করবো সে চিন্তায় ঘুম আসে না।’ পাথরঘাটার জেলে রহিম বলেন, ‘মহাজনের দেনার ভয়ে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’ রহিমের মতো মহাজনের দেনার ভয়ে আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটাসহ উপকূলীয় এলাকার অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করে এখন এলাকা ত্যাগ করে শহরের বিভিন্ন বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছেন। এরা ভয়ে এলাকায় আসেন না। মহিপুরের জেলে জালাল বলেন, ‘মাছ ধইরা সংসার চলে না। তাই এহন ঢাকায় রিকশা চালাই।’
এদিকে সাগরে মাছ না পেলেও রয়েছে জলদস্যুদের উত্পাত। সাগরে সুন্দরবন কেন্দি ক রাজু বাহিনী, জুলফিকার বাহিনী ও ফেরাউন বাহিনী এ অঞ্চলের জেলেদের কাছে মূর্তিমান ত্রাস। এদের চাঁদা না দিয়ে কোনো জেলে সাগরে মাছ ধরতে পারেন না। মাছ ধরা মৌসুম শুরু হলেই এ বাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। ট্রলার প্রতি এ বাহিনীকে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে বিশেষ টোকেন সংগ্রহ করতে হয়। যারা টোকেন সংগ্রহ করেন না তাদের উপর হামলা চালিয়ে এ বাহিনী মাছ-জাল লুট করে নিয়ে যায়। মোটা অংকের টাকার দাবিতে অপহরণ করা হয় জেলেদের। এ বাহিনী সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৫শ’ কিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। এদের রয়েছে প্রশিক্ষিত ৪ থেকে ৫ শতাধিক সদস্য। ডাকাতির সময় এরা জেলেদের চেয়ে দ্বিগুণ অশ্বশক্তি ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রলার ব্যবহার করে। ফলে ডাকাতি শেষে অনায়াসেই পালিয়ে যেতে পারে। কোস্টগার্ডের চোখ ফাঁকি দিয়ে এরা সাগরে চলাচল ও ডাকাতি করে। এদের আস্তানা সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে।
অপহরণের শিকার কয়েকজন জেলে জানান, ডাকাতি শেষে এরা আস্তানায় গিয়ে আনন্দ-ফূর্তি করে। অপহরণ করা জেলেদের নির্যাতন করে তাদের স্বজনদের কান্না শুনিয়ে বেশি টাকা মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করে। একটি বেসরকারি সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে দেড় সহস্রাধিক জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন। অপহূতদের নিকট থেকে ওই তিন বাহিনী প্রায় ৫ কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার সাগরে আবারও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এসময় আরো ১০ জেলেকে অপহরণ করা হয়।
মহিপুর মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি দিদার উদ্দিন আহম্মেদ জানান, যে ভাবে সাগরে ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে তাতে আমাদের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মস্তফা চৌধুরী জানান, জেলেদের জানমাল রক্ষায় সাগরে কোস্টগার্ডের টহল বাড়াতে হবে। জেলা ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মন্নান মাঝি জানান, সাগরে ডাকাতি ও অপহরণের হাত থেকে জেলেদের বাঁচাতেই হবে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কোস্টগার্ডের স্থানীয় এক কর্মকর্তা জানান, সাগরে টহল আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে।




