শ্যামলবাংলা ডেস্ক : পিলখানা ট্র্যাজেডির ৫ বছর পূর্তি হল আজ। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) সদর দফতর পিলখানায় বিদ্রোহী জওয়ানদের হাতে প্রাণ হারান ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন। ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের দরবার হল থেকে বিদ্রোহের সূচনা হয়। মুহূর্তেই খবরটি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী।

সেদিন যা ঘটেছিল : ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। এর একদিন আগেই পিলখানার তৎকালীন বিডিআর সদর দফতরে ৩ দিনব্যাপি রাইফেলস সপ্তাহের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সকাল ৯টায় দরবার হলে বসে বার্ষিক দরবার। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমদসহ বিডিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। হঠাৎ সিপাহি মাঈন নামে এক ঘাতক ডিজির সামনে বন্দুকের নল তাক করে। এরপর শুরু হয় হুড়োহুড়ি। বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে বিদ্রোহীরা। চারদিকে বিস্ফোরিত হতে থাকে গ্রেনেড। হত্যা করা হয় সেনা কর্মকর্তাদের। গাড়িতে লাশ বহন করে নেওয়া হয় গণকবর দেওয়ার উদ্দেশ্যে। সকাল ১০টার দিকে সাভার ও ঢাকা সেনানিবাস থেকে সাঁজোয়া যান এবং ভারী অস্ত্র নিয়ে পিলখানার দিকে রওনা হন সেনা সদস্যরা। ১১টার মধ্যেই তারা ধানমণ্ডি ও নীলক্ষেত মোড়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেন। এক পর্যায়ে বিদ্রোহীরা সদর গেট ও ৩ নম্বর গেট থেকে গুলি ছুড়তে থাকে সেনা সদস্যদের লক্ষ্য করে। বিডিআরের ১ নম্বর ও ৫ নম্বর গেটের আশপাশসহ বিভিন্ন পয়েন্টে আর্টিলারি গান ও সাঁজোয়া যান স্থাপন করা হয়। এতে বড় ধরনের রক্তপাতের আশঙ্কায় গোটা রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়ে চরম আতঙ্ক। তবে সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে অনিবার্য নতুন রক্তপাত থেকে রক্ষা পায় দেশ ও গোটা জাতি। সরকারি আলোচনার মাধ্যমে বিদ্রোহ দমনের পর একদিনেই গণকবর খুঁড়ে উদ্ধার করা হয় ৪২টি লাশ। এর মধ্যে দুটি গণকবর থেকেই ৩৮টি লাশ উদ্ধার করা হয়।
২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও স্যার সলিমুলাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে লাশের স্তূপ হয়। মর্গের ভেতরে জায়গা না হওয়ায় লাশ রাখা হয় খোলা ময়দানে। একসঙ্গে এত লাশ দেখে আঁতকে ওঠে পুরো জাতি। লাশ কাটাই যাদের কাজ, সেই ডোমরাও হতবিহবল হয়ে পড়ে।
বিডিআর থেকে বিজিবি : নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর পুনর্গঠনের দাবি উঠে বিভিন্ন মহল থেকে। সরকারের পক্ষ থেকে বিডিআর পুনর্গঠন করা হয়। বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। আগে বিডিআর আইনে সর্বোচ্চ সাজা ছিল ৭ বছর কারাদণ্ড। বর্তমান আইনে বিদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। আইনে সর্বনিম্ন শাস্তি ভর্ৎসনার বিধান রয়েছে। ২০১০ সালের ১ মার্চ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের খসড়া আইনটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০১০ সালের ১২ জুলাই ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন-২০১০’-এর খসড়া মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেয়। ২০ সেপ্টেম্বর ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিল-২০১০’ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয় ও ৮ ডিসেম্বর পাস হয়।

মামলা ও বিচার : ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক নবজ্যোতি খিসা। পরে মামলা দু’টি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তর হয়। ২০১০ সালের ১২ জুলাই পিলখানা হত্যা মামলায় ৮২৪ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেয় সিআইডি। পরে সম্পূরক চার্জশিটে আরও ২৬ জনকে আসামি করা হয়। পিলখানা হত্যা মামলার ২শ ৩৩তম কার্যদিবসে ৬শ ৫৪ জন সাক্ষী আদালতে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
বিদ্রোহের ৪ বছর ৮ মাস পর ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর পিলখানা হত্যা মামলায় ডিএডি তৌহিদসহ ১শ ৫২ আসামিকে ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। এ মামলার ৮শ ৪৬ জন জীবিত আসামির মধ্যে ১শ ৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় ২শ ৬২ জনের। বেকসুর খালাস দেওয়া হয় ২শ ৭১ জনকে। এছাড়াও বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় বিডিআরের নিজস্ব আইনে ৫৭ টি মামলার বিচারকার্য শেষ হয়েছে। ওইসব মামলায় সারাদেশে ৫ হাজার ৯শ ২৬ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। খালাস পেয়েছেন ১শ ১৫ জন।




