শ্যামলবাংলা স্পোর্টস : নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৪০ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়ে কিউইদের সাথে টানা দুটি ওয়ানডে সিরিজ জিতল টাইগাররা। সেইসাথে গোটা দেশ দেখছে আরেকটি ‘বাংলাওয়াশের’ স্বপ্নও। ‘বাংলাওয়াশ’ শব্দটা শুনতে শুনতে বিরক্তি এসে যাওয়ার কথা এত দিনে মুশফিকুর রহিমের। যেখানেই যান, এই এক কথা। কিন্তু কালকের পর সম্ভবত বাংলাদেশ অধিনায়কের মস্তিষ্কেও ওই বাংলা-ইংরেজি মেশানো শব্দ সংগীতের মাধুর্য নিয়ে গুনগুনাচ্ছে।
ওই সিরিজ জয়ে উল্লাসটাও ছিল বাধভাঙ্গার মতই। ঝাঁকি খাওয়া অফ স্টাম্পটা তখনো পড়েনি। এক দৌড়ে সেটা তুলে নিয়ে মাশরাফির দিকে ছুটলেন মুশফিকুর রহিম। মাশরাফি ততক্ষণে ছুটতে ছুটতে প্রায় পয়েন্টের কাছাকাছি। মাঠের এখানে-ওখানে ছড়িয়ে থাকা ফিল্ডাররাও সব ছুটে যেতে থাকলেন মাশরাফির দিকে। শেষ দৃশ্যের নায়ক যে তিনিই!
কাকে দেবেন ওই কৃতিত্ব? তামিম ইকবাল, নিউজিল্যান্ডের সামনে ২৪৮ রানের লক্ষ্য দাঁড় করানোয় যাঁর সবচেয়ে বড় অবদান? মাশরাফি বিন মুর্তজা, যাঁর ৩ উইকেট আবারও লিখল দুর্দান্ত এক প্রত্যাবর্তনের গল্প? মুমিনুল হক, দুবার বল হাতে নিয়ে দুবারই যিনি ব্রেক থ্রু এনে দিলেন? নাকি ‘আসল’ ম্যান অব দ্য ম্যাচ সোহাগ গাজীকে? অ্যান্ডারসনের অমন দুর্দান্ত ক্যাচ নেওয়া মুশফিকুর রহিমকেই বা ভুলে যাবেন কীভাবে? কৃতিত্ব আসলে সবারই। পারফরম্যান্সে দলীয় সংহতির গান না বাজলে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ব্যাটিং উইকেটে ২৪৭ রান করেও জয়োৎসব সহজ ছিল না।
ম্যাচ জেতার আগে ভেতরে ভেতরে একটা উত্তেজনাকর অনুভূতি টের পাওয়ার দাবি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অনেক দিনের। এবার সেটা বলতে পারেন সিরিজ জয়ের ক্ষেত্রেও। নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশে পা রাখার আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল আরেকটি ‘বাংলাওয়াশের’ আলোচনা। টেস্ট সিরিজ ড্র করাজনিত আত্মবিশ্বাস ওয়ানডে সিরিজের আগে সেটাকে যেন বাংলাদেশ দলের কাছে দেশবাসীর একটা দাবিতেই পরিণত করল। অধিনায়ক মুশফিকও ‘সিরিজটা জিততে চাই’ বলেই শুরু করেছিলেন। এক ম্যাচ বাকি থাকতেই সে স্বপ্নপূরণ আরেকটি ‘বাংলাওয়াশের’ দাবিটাকে আরও জোরালো করল। ম্যাচ জয়ের পর কৃত্রিম আলোর নিচে বাংলাদেশ দলের ল্যাপ অব অনারকে স্বাগত জানিয়ে দেওয়া হাততালিতে কি সেই দাবিই জানাচ্ছিল দর্শকেরা? কিংবা উইকেটের ওপর গিয়ে মাশরাফি যে গ্রাউন্ডসম্যানদের সঙ্গে হাত মেলালেন, সেখানেও থাকতে পারে ‘বাংলাওয়াশের’ জন্য আশির্বাদ চাওয়ার কোনো কারণ।
প্রায় ১০ মাস পর খেলায় ফিরে প্রথম ম্যাচেই মাশরাফি জানিয়ে দিয়েছিলেন নিজের আগমনী ধ্বনি। কালও ইনিংসের তৃতীয় ওভারে হামিশ রাদারফোর্ডকে বোল্ড করে উৎসবের শুরুটা তাঁর হাত ধরেই। মাত্র ৫ রানেই উদ্বোধনী জুটিতে ভাঙন, এরপর ৪৫ রানের মাথায় আরেক ওপেনার ডেভচিচ আর এলিয়টকে ফেরত পাঠালেন দুই স্পিনার সোহাগ আর রাজ্জাক। ৪৫ রানের মধ্যে ৩ উইকেটের পতনে ২৪৭ রানের লক্ষ্যটাই যেন আরও বড় মনে থাকে নিউজিল্যান্ডের জন্য। রস টেলর-কোরি অ্যান্ডারসনের চতুর্থ উইকেট জুটিতে ৬১ রান এলেও বাংলাদেশের বোলাররা সেটিকে মরিয়া চেষ্টার বেশি হতে দিলেন না। টিম সাউদিকে বোল্ড করে মাশরাফিই দিলেন তুলির শেষ আঁচড়। মাশরাফির শুরুর পর সোহাগ গাজী ক্রমাগত অস্বস্তিতে রেখেছেন নিউজিল্যান্ডের মিডল অর্ডারকে। আর মুমিনুল তো দিনে দিনে বিস্ময় বালকই হয়ে উঠছেন। ব্যাট হাতে মাত্র ৩১ রান করলেও কাল আসল কাজটা করলেন বোলিংয়ে। ৩১তম ওভারে প্রথম বল হাতে নিয়ে ৩ ওভারের স্পেলে মাত্র ৪ রান দিয়ে নিলেন ব্রেন্ডন ম্যাককালামের উইকেটটা। টেলরের সঙ্গে ম্যাককালামের পঞ্চম উইকেটটা মোটামুটি দাঁডিয়েছে যাচ্ছিল ওই সময় ৪৬তম ওভারে আবারও বল হাতে নিয়ে আবারও ব্রেক থ্রু! এবার তাঁর বাঁহাতি স্পিনের শিকার আরেক (নাথান) ম্যাককালাম।
মুশফিক টসে জিতে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আগে ব্যাট করে প্রতিপক্ষকে বড়সড় একটা রানের নিচে চাপা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল সম্ভবত। কিন্তু বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের উচ্চাভিলাষী সব শট সেটা হতে দিল কই! এনামুলের বদলে কাল তামিমের সঙ্গে ওপেনিং জুটিতে শামসুরের শুরুটা খারাপ ছিল না। তামিম স্বভাবসুলভ বাজে বলে ব্যাট চালাচ্ছিলেন। অন্য পাশে একটু যেন ধরে খেলতে চাইলেন শামসুর। তাতে আগের ম্যাচের তুলনায় ওপেনিং জুটিতে রান এল বেশি, সেটা এমনকি হয়ে গেল বাংলাদেশ ইনিংসেরই সর্বোচ্চ জুটি। ৬৩ রানে নাথান ম্যাককালামকে ডাউন দ্য উইকেটে মারতে গিয়ে স্টাম্পড হলেন শামসুর। অবশ্য শুধু শামসুরকে দোষ দিলে হবে না, তিনি তো খেলতে নেমেছিলেন প্রথম ওয়ানডে! অভিজ্ঞ তামিম, মুশফিকুর, নাসিররাও উইকেট উপহার দিয়ে আসার বাংলাদেশি রীতি থেকে বের হতে পারেননি। অ্যান্ডারসনকে শামসুরের মতোই ডাউন দ্য উইকেটে গিয়ে ব্যাটের ভেতরের কানায় বল লেগে বোল্ড তামিম। তবে সান্ত্বনা ৪ ওয়ানডে পর একটা ফিফটির দেখা পেলেন বাঁহাতি এই ওপেনার। বাকিদের মধ্যে সর্বোচ্চ রান মুমিনুল আর মুশফিকের ৩১। কিন্তু অমন একটা জয়ের পর ওইসব সমালোচনা অপ্রাসঙ্গিক। বিজয়ের রাতে প্রাসঙ্গিক কেবল আরও বড় কোনো বিজয়ের প্রত্যাশাই। সেটা ‘বাংলাওয়াশ’ নয় কেন?

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ: ৪৯ ওভারে ২৪৭ (তামিম ৫৮, শামসুর ২৫, মুমিনুল ৩১, মুশফিক ৩১, নাঈম ১৬, মাহমুদুল্লাহ ২১, সোহাগ ২৬, মাশরাফি ১৪, অ্যান্ডারসন ৪/৪০, নিশাম ৪/৫৩, নাথান ১/৪২, মিলস ১/৪৭)
নিউ জিল্যান্ড: ৪৬.৪ ওভারে ২০৭ (ডেভসিচ ১৯, টেইলর ৪৫, অ্যান্ডারসন ৩৭, ব্রেন্ডন ১৪, নাথান ২৫, মিলস ২৭*, সোহাগ ৩/৩৪, মাশরাফি ৩/৪৩, মুমিনুল ২/১৩, রাজ্জাক ১/৩৫)
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: সোহাগ গাজী




