নব্বই দশকের একজন নিভৃত হলেও শক্তিমান কবি ও সম্পাদক। তিনি জন্মজেলা শেরপুর ও ঢাকার সাহিত্য অঙ্গনের অন্যতম পরিচিত মুখ। তাঁর কবিতার শৈলী বা প্রকরণ বেশ স্বতন্ত্র ও জীবনমুখী।তিনি মূলত মাটি ও মানুষের কবি। তাঁর কবিতার প্রকরণ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে এভাবে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যায়-
১. শব্দচয়ন ও ভাষা: কবি আরিফ হাসানের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সহজবোধ্যতা। তিনি খুব জটিল বা দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার না করে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে কবিতার ভাষায় রূপান্তর করতে পছন্দ করেন। তবে এ সারল্যের ভেতরেও একটি গভীর দার্শনিক বোধ লুকিয়ে থাকে।
২. বিষয়বস্তু ও প্রেক্ষাপট: তাঁর কবিতায় শেরপুর তথা উত্তরবঙ্গের জনজীবন, প্রকৃতি এবং প্রান্তিক মানুষের সুখ-দুঃখের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। শেরপুরের লোকজ ঐতিহ্য ও মাটির গন্ধ তাঁর কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকে। মানুসিক আবেগ এবং রোমান্টিকতা তাঁর কবিতার একটি বড় অংশ। এছাড়া সমসাময়িক রাজনীতি, অস্থিরতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর কলম বেশ ধারালো।
৩. ছন্দ ও অলঙ্কার: তিনি ছন্দের বাঁধনে কবিতা লিখতে যেমন পটু, তেমনি গদ্য ছন্দেও তাঁর দখল প্রশংসনীয়। তিনি খুব সুকৌশলে কবিতায় উপমা ও রূপক ব্যবহার করেন, যা তাঁর কবিতাকে সাধারণ বর্ণনা থেকে উচ্চতর শিল্পমানে উন্নীত করে। তাঁর অলঙ্কার প্রয়োগে কোনো কৃত্রিমতা থাকে না, বরং তা খুবই প্রাবন্ধিক ও সাবলীল।
৪. মানবিকতা ও দ্রোহ: আরিফ হাসানের কবিতায় মানবিক মূল্যবোধের জয়গান শোনা যায়। শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলা এবং জীবনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কবিতার প্রকরণের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
৫. সম্পাদক : তিনি ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয় কেন্দ্রিক সাহিত্য কাগজ ‘সাহিত্যোলোক’ এর সম্পাদনার সাথে যুক্ত ছিলেন।
নব্বইয়ের দশকের লিটলম্যাগ আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ‘সাহিত্যোলোক’ সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি তরুণ কবি-লেখকদের একটি শক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছিলেন।
নব্বই দশকের কবি হিসেবে তাঁর কবিতার প্রকরণ ও শৈলী বিশ্লেষণ করলে কিছু সুনির্দিষ্ট দিক ফুটে উঠে।
নব্বইয়ের দশকের কবিরা মূলত আশির দশকের অতি-রোমান্টিকতা থেকে বেরিয়ে এসে এক ধরণের নিরীক্ষাধর্মী ও মননশীল কবিতার চর্চা শুরু করেন। আরিফ হাসান এই ধারারই একজন অগ্রগণ্য কবি। তাঁর কবিতায় শব্দের পরিমিতি এবং লিটলম্যাগ আন্দোলনের সেই বিদ্রোহী ও প্রথাভাঙ্গা মেজাজ স্পষ্ট।
সম্পাদকের দৃষ্টিভঙ্গি ও কবিতার বুনন
একজন সফল সম্পাদক হওয়ার কারণে তাঁর কবিতার কাঠামোগত বুনন খুব আঁটসাঁট। বাড়তি শব্দের মেদ তাঁর কবিতায় খুব একটা দেখা যায় না।
‘সাহিত্যোলোক’ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য কাগজ)।
কবিতার ভাষা মননশীল, পরিমিত এবং কিছুটা বিমূর্ত।মূল সুর নাগরিক দহন, প্রেম এবং অস্তিত্বের অনুসন্ধান।
নব্বই দশকের কবি হওয়ার পরও এ নিভৃত ও শক্তিমান কবির আজোবধি কোন কাব্যগ্রন্থ নেই। এটি সত্যিই বিস্ময়কর এবং একই সাথে নব্বই দশকের অনেক নিষ্ঠাবান লিটলম্যাগ কর্মীর এক পরম ট্র্যাজেডি। কারন তাঁর মতো একজন শক্তিমান কবি, যিনি ‘সাহিত্যোলোক’-এর মতো কাগজ সম্পাদনা করেছেন এবং যার কবিতায় নব্বইয়ের দশকের সেই বিশেষ সংবেদনা ও আধুনিকতা স্পষ্ট ছিল, তাঁর আজ অবধি কোনো একক কাব্যগ্রন্থ না থাকাটা আমাদের সাহিত্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। লিটলম্যাগ ও পাণ্ডুলিপির আড়াল নব্বইয়ের দশকের অনেক কবিই মনে করতেন কবিতা হলো একটি নিরবচ্ছিন্ন সাধনা। তাঁরা বই প্রকাশের চেয়ে ভালো কবিতা লেখা এবং লিটলম্যাগ আন্দোলনের মাধ্যমে রুচি পরিবর্তনের দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন। কবি আরিফ হাসান সম্ভবত সেই ঘরানারই মানুষ, যারা মনে করেন— ‘কবিতা বেঁচে থাকে পাঠকের মগজে, বইয়ের পাতায় নয়।’ প্রকরণ ও নির্জনতা
গ্রন্থ প্রকাশ না করার কারণে তাঁর কবিতার প্রকরণে এক ধরণের ‘অনিবন্ধিত স্বাধীনতা’ লক্ষ্য করা যায়। তাঁর কবিতা কোনো বাণিজ্যিক ছাঁচে বন্দি হয়নি। তাঁর লেখায় যে নির্জনতা এবং দ্রোহ ছিল, তা সম্ভবত বই প্রকাশের চাকচিক্য থেকে তাঁকে দূরে রেখেছে। সংকলিত না হওয়ার ঝুঁকি একজন কবির যখন কোনো গ্রন্থ থাকে না, তখন তাঁর কবিতাগুলো বিভিন্ন পুরনো লিটলম্যাগ বা সাময়িকীর পাতায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। এতে তাঁর কবিতার শৈলী বা বিবর্তন নিয়ে সামগ্রিক গবেষণা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এখন যা প্রয়োজন: নব্বই দশকের লিটলম্যাগগুলো (বিশেষ করে ‘সাহিত্যোলোক’ বা সমসাময়িক অন্যান্য পত্রিকা) থেকে তাঁর কবিতাগুলো সংগ্রহ করে একটি অগ্রন্থিত কাব্যসংগ্রহ প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবি।তাই মূল্যায়নের স্বার্থে তাঁর কবিতার প্রকরণ—যেখানে মেদহীন ভাষা এবং নাগরিক বোধের তীব্রতা ছিল—তা নিয়ে নতুন প্রজন্মের কবি ও সমালোচকদের আলোচনা করা প্রয়োজন।

নব্বই দশকের কবি আরিফ হাসানের চারটি কবিতার পাঠ অনুভূতি:
১. নিসর্গ-পথিক –
শৈশব থেকে একটা পাখির সন্ধানে—
চষে বেড়াচ্ছি নির্জন মাঠ, বন-উপবন।
খুঁজে ফিরছি—
পরিত্যক্ত বিরান বসতি, উত্তাল নদীর ধারে,
আগুনঝরা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়ার শাখায়…
খুঁজে ফিরছি—
রক্তিম ফুলে ভরা শিমুল, পলাশের ভিড়ে
দিগন্তজোড়া হলুদ সর্ষে খেতে…
সফেদ পালকে মোড়া পাখির শরীর—
সিঁদুররাঙা ঠোঁট; চোখ দুটো কৃষ্ণকালো;
সেই পাখিটাই আমি খুঁজে ফিরি।
নিসর্গ-পথিক আমি, পথভোলা নই;
আমার গন্তব্য সুনির্দিষ্ট—
কাঙ্ক্ষিত পাখিটা ঠিক খুঁজে পাবো
ভর সন্ধ্যেবেলা!
পাঠ অনুভূতি:
এই কবিতাটি মূলত একটি রূপক যাত্রা। এখানে ‘পাখি’ কেবল কোনো ডানাওয়ালা প্রাণী নয়, বরং এটি মানুষের আজন্ম লালিত কোনো স্বপ্ন বা আত্মিক প্রশান্তির প্রতীক।
অনুপ্রেরণা: শৈশব থেকে শুরু হওয়া এই অনুসন্ধান জীবনের শেষবেলা অর্থাৎ ‘ভর সন্ধ্যেবেলা’ পর্যন্ত বিস্তৃত।
চিত্রকল্প: কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, শিমুল আর সর্ষে ক্ষেতের যে বর্ণনা কবি দিয়েছেন, তা পাঠককে শেকড়ের কাছে নিয়ে যায়। পথভোলা না হয়েও গন্তব্যে পৌঁছানোর এক দৃঢ় প্রত্যয় এখানে ফুটে উঠেছে।

২. হেমন্তের ফসল
রাতের আঁধারে বসে একমনে এঁকে যাই
সোনারঙা সকালের স্বপ্ন।
চারপাশে দেখি শুধু অকাল বোধন;
শুনি ঝরাপাতাদের সকরুণ আর্তনাদ;
আমার প্রতীক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়।
তবু নিশ্চিত বিশ্বাস,
এই প্রতীক্ষার অবসান হবে একদিন—
জানি, নদী খরস্রোতা হলে মোহনায় মেশে…
মহাবিজয়ের শেষলগ্নে
বুকের ভেতর খেলা করে রক্তজল:
দরোজার পাশে অপেক্ষায় সুসময়।
এই হেম ঝরা হেমন্তের প্রথম প্রহরে
তোমাদের হাতে হৃষ্টচিত্তে তুলে দেবো
ঘুমহীন রাতের ফসল।
পাঠ অনুভূতি:
এই কবিতাটি এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং গভীর আশাবাদের দলিল। রাতের আঁধারে বসে ‘সোনারঙা সকালের স্বপ্ন’ দেখা একজন সৃষ্টিশীল মানুষের ধৈর্যকে নির্দেশ করে।
মূল সুর: চারপাশের অবক্ষয় বা ‘অকাল বোধন’ কবির মনে হতাশা তৈরি করলেও তিনি বিশ্বাস হারাননি।
তাৎপর্য: ‘ঘুমহীন রাতের ফসল’ বলতে কবি তাঁর সাধনা বা সৃজনশীলতাকে বুঝিয়েছেন, যা তিনি হেমন্তের নবান্নের মতো মানুষের হাতে তুলে দিতে চান। এটি কষ্টের বিনিময়ে অর্জিত এক পরম প্রাপ্তির ইঙ্গিত।
৩. বাজেয়াপ্ত দিনরাত্রি : ওরা হরণ করেছে সমুদয় অধিকার
বাজেয়াপ্ত হয়েছে আমার দিনরাত্রি
আমিও অন্য সবার মতো ভালোবাসি
সূর্যের উত্তাপ আর জোছনার আলো
ভালোবাসি চেনা পথ ধরে হেঁটে যেতে
ফুলে ফুলে দেখি প্রজাপতির নাচন
বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেই অলস বিকেলে
বিছানায় শুয়ে রাত জেগে বই পড়ি
ওরা এক লহমায় ছিনিয়ে নিলো তাবৎ সুখ
আগুনে পুড়িয়ে দিলো জীবন তোরঙ্গ ;
তবু নিশুতি রাতের মৃত্যুভয় মুছে ফেলে
রৌদ্ররথে ছুটে চলে দিন…
পাঠ অনুভূতি:
এটি এই গুচ্ছের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং কিছুটা রাজনৈতিক বা সামাজিক বাস্তবতার কবিতা। অধিকার হরণের যাতনা এখানে স্পষ্ট। দ্বন্দ্ব: একদিকে সাধারণ জীবনের অতি সাধারণ চাওয়া (রোদ, জোছনা, আড্ডা, বই পড়া), অন্যদিকে ‘ওরা’ নামক এক অদৃশ্য বা দৃশ্যমান শক্তির দ্বারা সব কেড়ে নেওয়ার নিষ্ঠুরতা।উত্তরণ: জীবনের ‘তোরঙ্গ’ বা সঞ্চয় পুড়িয়ে দিলেও কবি পরাজয় স্বীকার করেননি। ‘রৌদ্ররথে ছুটে চলা দিন’—এই পঙ্ক্তিটি জীবনের অদম্য গতির কথা বলে, যা মৃত্যুভয়কে জয় করতে জানে।
৪. এই বসন্তে
এই বসন্তেও বেশ আছি বিপন্ন শয্যায়
হাওয়ায় ভরা বুকের বেলুন
অদূরে কোথাও ফুটেছে সুগন্ধি ফুল
ভেসে আসে পরিচিত ঘ্রাণ
অমলিন জোছনায় বুঁদ হয়ে থাকি
প্রাকৃত নিয়মে পৃথিবীর সবকিছু পাকে
পেকে পেকে হয়ে ওঠে রসাল সুস্বাদু
মধুলোভী নই, পান করি না অমৃতসুধা
কেবল জলতরঙ্গে তুলি ঢেউ
দেখি জলের নাচন
রাতের আঁধারে লেখা হয় চুপিসারে
গাঢ় অন্তরঙ্গ অনুভব
ফুল-পাতা-গাছ ঘুমে ঢলে পড়ে চুপচাপ
প্রকৃতিতে মিশে যায় তাদের লাবণ্য…
তুমিও ঘুমিয়ে পড়ো
চুপিচুপি কাছে যাবো ঘুমের সময়।
পাঠ অনুভূতি:
কবিতাটি বিষাদ আর রোমান্টিকতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। বসন্ত মানেই যেখানে উল্লাস আর নতুনের আবাহন, কবির কাছে এই ঋতুটি ধরা দিয়েছে একটু ভিন্নভাবে। কবিতার শুরুতেই কবি নিজেকে ‘বিপন্ন শয্যায়’ বসিয়ে দিয়েছেন। বসন্তের দখিনা বাতাস যখন সবার মনে দোলা দেয়, কবির কাছে তা যেন কেবল বুকের ভেতর আটকে থাকা এক হাহাকার বা ‘বেলুন’। বাইরে সুগন্ধি ফুল ফুটলেও তিনি সেখান থেকে দূরে, কেবল ঘ্রাণটুকু অনুভব করছেন। এটি একজন সংবেদনশীল মানুষের একাকীত্বের এক চমৎকার প্রতিচ্ছবি।
প্রকৃতিতে সব কিছু যখন পূর্ণতা পায় (পেকে রসাল হওয়া), তখন কবি নিজেকে সেই ভোগের বৃত্ত থেকে আলাদা করে রাখেন। তিনি নিজেকে ‘মধুলোভী’ বা অমৃত পানের প্রত্যাশী হিসেবে দেখান না। বরং তিনি কেবল জলের ঢেউ আর সময়ের ছন্দ দেখে যেতে পছন্দ করেন। জীবনের মোহ থেকে এক ধরণের সুন্দর নির্লিপ্ততা এখানে ফুটে উঠেছে।
কবিতার শেষাংশটি সবচেয়ে মায়াবী। রাতের আঁধারে যখন প্রকৃতি নিঝুম হয়ে যায়, তখন শুরু হয় কবির একান্ত সৃজনশীল ও আবেগীয় কাজ। প্রিয়তমার প্রতি তার যে টান, তা সরব নয়, বরং অত্যন্ত ‘চুপিসারে’ ও গভীর। ঘুমের ঘোরে প্রিয়তমার কাছে যাওয়ার যে ইচ্ছা, তা প্রেমের এক অতিশয় পবিত্র ও স্নিগ্ধ রূপকে তুলে ধরে। এ কবিতাটি বসন্তের রঙিন আবেশের চেয়ে বেশি ধারণ করেছে বসন্তের নিঃশব্দ আর করুণ সৌন্দর্যকে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রেমের সবচেয়ে গভীর মুহূর্তগুলো কোলাহলে নয়, বরং নিস্তব্ধতায় আর দূরত্বের অনুভবেই বেশি জীবন্ত থাকে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন:
আরিফ হাসানের এ কবিতাগুলোতে নব্বইয়ের দশকের কবিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়—তা হলো ব্যক্তিগত বিষণ্ণতাকে সামষ্টিক শক্তিতে রূপান্তর করা। তাঁর শব্দচয়ন খুব সহজ কিন্তু মেজাজ আধুনিক। তিনি নিসর্গের মধ্য দিয়ে দ্রোহ এবং সুসময়ের প্রতি এক অটুট আস্থা প্রকাশ করেছেন।
লেখক : কবি, গীতিকার ও সাংবাদিক, শেরপুর।




