খোরশেদ আলম, ঝিনাইগাতী (শেরপুর) : বন্যহাতি ও দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে বেঁচে আছেন শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার পাহাড়ী গ্রামবাসীরা। বর্তমানেও বন্যহাতির তান্ডব অব্যাহত রয়েছে। প্রায় প্রতি রাতেই বন্যহাতির দল তান্ডবলীলা চালিয়ে পাহাড়ী গ্রামবাসীদের ঘর-বাড়ী, ক্ষেতের ধান, বাগানের কাঁঠালসহ বিভিন্ন শাক-সবজির বাগান সাবার করে চলেছে। এসব এলাকার লোকজন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। গ্রামবাসীরা তাদের জান-মাল ও ক্ষেতের ফসল রক্ষার্থে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, মশাল জ্বালিয়ে, পটকা ফাটিয়ে হাতি তাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে আসছে। সনাতন পদ্ধতিতে হাতি তাড়াতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
বন-বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৬ সাল থেকে ঝিনাইগাতী উপজেলা পাহাড়ী গ্রামগুলোতে শুরু হয় বন্যহাতির তান্ডব। উপর্যপুরি বন্যহাতির তান্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে পাহাড়ী জনপদের লোকজন। বিপর্যস্ত এসব পাহাড়ী গ্রামগুলো হচ্ছে, উপজেলার তাওকুচা, গুরুচরণ দুধনই, পানবর, বাকাকুড়া, ছোট গজনী, গজনী, গান্ধিগাও, হালচাটি, নওকুচি, বানাইপাড়া, রাংটিয়া, সন্ধ্যাকুড়া, হলদিগ্রাম ও গোমড়া। গারো, হাজং কোচ বানাই, বর্মণ, হুদি, বংশি, হিন্দু ও মুসলমানসহ বিভিন্ন জাতিগোত্র মিলে সীমান্তবর্তী এসব পাহাড়ী গ্রাম গুলোতে প্রায় ২০ হাজার লোকের বসবাস। দারিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী গ্রামবাসীরা প্রতিনিয়ত বন্যহাতি আর দারিদ্রতদার সাথে লড়াই করে টিকে আছে। কৃষির উপর নির্ভরশীল আদিবাসী অধ্যূষিত এসব পাহাড়ী গ্রামবাসীরা যুগ যুগ ধরে তাদের জমি চাষাবাদের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল। কিন্তু হাতির দল তাদের জীবিকার পথে কাল হয়ে দাঁড়ায়। বন্যহাতির তান্ডবে এসব গ্রামের কৃষকরা তাদের জমিতে ফসল ফলাতে পারছে না। বেঁচে থাকার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ কেউ চাষাবাদ করলেও তাদের কষ্টার্জিত ক্ষেতের ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। বন্যহাতির দল দিনে গভীর অরণ্যে আশ্রয় নিচ্ছে এবং রাতে লোকালয়ে নেমে এসে তান্ডব লীলা চালাচ্ছে। প্রতি বছর মৌসুমী ফল ও ধান পাকা শুরু হওয়ার সাথে সাথে এখানে বন্যহাতির তান্ডব বৃদ্ধি পায়। গ্রামবাসীরা জানায়, হাতির দল কৃষকদের গোলা ও ক্ষেতের ধান শাক-সবজির বাগানসহ বিভিন্ন জাতের ফলমুল আম ,কাঠাল খেয়ে এবং পায়ে পিসে দুমড়ে-মুচরে একাকার করে চলছে। এসব এলাকার কৃষকরা জানমাল ও ক্ষেতের ফসল রক্ষার্থে রাত জেগে পাহাড়া দিচ্ছে। ঢাক-ঢোল পটকা ফাটিয়ে মশাল জ্বালিয়ে হাতি তাড়ানেরা ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু যতই হাতি তাড়ানোর চেষ্টা চলছে ততই বন্যহাতির দল তেড়ে আসছে লোকালয়ে। কিছুতেই হাতি তাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বন্যহাতির তান্ডবে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ পাহাড়ী গ্রামগুলোতে এ পর্যন্ত প্রায় ২০ জন নিহত এবং শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে শতশত ঘর-বাড়ী। বন্যহাতির তান্ডবে বিপর্যস্ত পাহাড়ী গ্রামগুলো দু’টি ইউনিয়নে বিভক্ত। নলকুড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান ও কাংশা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ সরকার জানান, পাহাড়ী গ্রামগুলোতে বন্যহাতির তান্ডবে শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে অন্যত্র চলে গেছে। তাদের মতে, পাহাড়ী গ্রামবাসীদের জীবিকার সন্ধানে দারিদ্রতার সাথে ও রাতে হাতির সাথে লড়াই করে বেঁচে আছে। রাত জেগে হাতি তাড়ানোর পর দিনে কাজের সন্ধানে বের হতে পারছে না তারা। নওকুচি গ্রামের প্রদীপ মারাক ও হালচাটি গ্রামের সুরেন্দ্র চন্দ্র কোচ জানান, পেটে ভাত না থাকলেও রাতে হাতি তাড়ানোর জন্যে মশাল জ্বালাতে ২/৩লিটার কেরোসিন তেল হাতের নাগালে রাখতে হচ্ছে। কিন্তু দরিদ্র লোকজনের পক্ষে তা সম্ভব নয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সরকারীভাবে হাতি তাড়ানোর ব্যবস্থা করা তো দূরের কথা, কেউ তাদের খোঁজ-খবরও নেন না। হাতির তান্ডবে বিপর্যস্ত পাহাড়ী গ্রামবাসীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন। ওয়ার্ল্ড ভিশন হাতি তাড়ানোর জন্য গণসচেতনতা বৃদ্ধি, পাহাড়ী এলাকায় টংঘর নির্মাণ ও গ্রামবাসীদের মধ্যে টর্চলাইট বিতরণ করে আসছে। এছাড়া সরকারীভাবে হাতি তাড়ানোর জন্য স্থায়ী কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। গ্রামবাসীদের দাবি, বন্যহাতির তান্ডবে বিপর্যস্ত শেরপুর সীমান্তের পাহাড়ী গ্রামগুলোতে বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা করা হলে হাতির তান্ডব থেকে রক্ষা পাবে তারা।
শেরপুর জেলা প্রশাসক ডাঃ এএম পারভেজ রহিম বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। উভয় দেশের সহযোগীতায় বন্যহাতির আবাস নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সীমান্তে অভয় আশ্রম তৈরী করা হবে। সংসদ সদস্য একেএম ফজলুল হক চাঁন বলেন, বন্যহাতির তান্ডবে বিপর্যস্ত কিছু এলাকায় ইতোমধ্যেই বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাকি এলাকাগুলোতে খুব শীঘ্রই ব্যবস্থা করা হবে।




