আধুনিক জীবন ব্যবস্থায় যুগ-যন্ত্র-জ্বালার এই আপদকালে বিনোদন লাভের সুযোগ না থাকায় মানবকূল এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে, নিজ নিজ কর্মস্থল আর বাসা বাড়িতে সময় কাটানোর বাইরে কেউ যেন আর আগের মত উচ্ছ¡সিত নয়। আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধু-বান্ধবের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা বা আড্ডা দেওয়ার মানসিকতাও যেন উবে গেছে।

একটা তীব্রতম আকাঙ্খার নাম যেমন জীবন তেমনি নিছক বেঁচে থাকার নাম জীবন নয়। জীবনের মূল্য লক্ষ্য শুধু বিজয় নয়-সংগ্রামও বটে। কাজেই আমাদের চারপাশ, প্রকৃতির রকমফের বা ঋতু পরিবর্তন ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে প্রকৃতির স্বরূপ অনুসন্ধান এবং অবলোকনের মানসিকতাকে লালন করতে হবে। প্রকৃতির উপর মানুষের ধ্বংসাত্মক হস্তক্ষেপের কারণে বৈশ্বিক পরিবর্তন ঘটায় জীব-বৈচিত্র্য ও জল-বায়ুর উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বন-জঙ্গল উজার হওয়ায় আর পাহাড়-পর্বত ধ্বংস করার ফলে ভূ-পৃষ্ঠে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। খরা, দুর্ভিক্ষ, মহামারী ইত্যাদির বিস্তার ঘটছে। বাংলাদেশ-ভারতের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত ৫৫টি অভিন্ন বৃহৎ নদ-নদীর ভারতীয় অংশে সে দেশের সরকার বাঁধ নির্মাণ করায় সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলার বাংলাদেশ আজ মরু অঞ্চলে পরিণত হতে চলছে। তিস্তা ব্যারেজের উভয় পাশে এখন ধূ ধূ বালুচর!
প্রকৃতি কত সুন্দর, প্রকৃতি কত উদার, এবং প্রকৃতি কত আপন- প্রকৃতির মুখোমুখি না হলে তা বোঝা যায় না। বছরের শুরুতে আমাদের দেশে বনভোজনের ধুম পড়ে যায়। বিনোদনের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে পিকনিক স্পট। বাংলাদেশের সীমান্তকন্যা নামে খ্যাত গারোপাহাড়ের কোল ঘেষে গড়ে উঠেছে গজনী অবকাশ কেন্দ্র, মধুটিলা ইকোপার্ক এবং লাউচাপড়া পিকনিক স্পট। এসব বিনোদন ও পিকনিক স্পট বছরের নির্দিষ্ট সময়ে (ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্র“য়ারি মাসের মাঝামািঝ সময় পর্যন্ত) আনন্দ পিয়াসী মানুষের সমাগম ঘটে থাকে।
তবে সারাবছর আনন্দ পেতে চিড়িয়াখানা ছাড়া তেমন কোন বিনোদন কেন্দ্র নেই বললেই চলে। বৈকালিক বিহার বা প্রভাত ফেরীর জন্য সারাদেশে হাতে গোণা কয়েকটি পার্ক রয়েছে। তবে স¤প্রতিককালে বাংলাদেশে বেশকিছু আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ বিনোদন কেন্দ্রও গড়ে ওঠেছে। ফ্যান্টাসী কিংডম তার মাঝে উলেখযোগ্য একটি।
বক্ষমান আলেখ্যে এমন একটি শিক্ষনীয় ও বিনোদনমূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিতে চাই-যার অবস্থান অজপাড়া গাঁয়ের নিভৃত কোলে; এককালের প্রমত্তা যমুনার পাড়ে। যার বুকে তৎকালে পাল তুলে হাজারমণী নৌকা চলতো। সেখানে এখন সবুজ ফসলের মাঠ, ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়Ñযেন নিরাপদ মাতৃক্রোড়ে ঘুমন্ত শিশু নড়েচড়ে উঠে দমকা বাতাসে। চলুন না যাই- ঘুরে আসি, নৈসর্গিক অবগাহন সেরে হৃদয়-মন সতেজ করি।
সেবা ও প্রকৃতি প্রেমের মনোভাব নিয়ে গড়ে ওঠা জামালপুর জেলার একমাত্র বেসরকারি বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র ‘যমুনা গার্ডেন সিটি’র কথা এখন মানুষের মুখে মুখে। সরিষাবাড়ি উপজেলার পোগলদিঘা ইউনিয়নের চরপোগলদিঘা গ্রামে ‘যমুনা গার্ডেন সিটি’র অবস্থান। স্থাপিত হয় ১৯৮৬ সালে। তখন থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এটি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিক্ষা বিষয়ক গবেষক এবং সমাজ সেবক সরকার আবুল হোসেনের বাগানবাড়ি হিসেবেই পরিচিত ছিল। সেই সময় সরকার আবুল হোসেন বাগানবাড়িতে বসবাস করতেন। তখন থেকেই বিভিন্ন প্রজাতির বনজ, ফলদ ও অষুধি গাছ লাগিয়ে বাগানের পরিপূর্ণতা এনেছেন। বর্তমানে দেশী-বিদেশি প্রায় চার’শ প্রজাতির গাছ রয়েছে এই বাগানবাড়িতে। বিভিন্ন বৃক্ষপ্রেমী ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসে এসব গাছ সর্ম্পকে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে।
বাগানবাড়ির পরিচিতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে লোক সমাগম দিনদিন বাড়তে থাকে। বাগানবাড়ীতে আশপাশের লোকজনের অবাধ যাতায়াত বেড়ে যায় এবং বহিরাগত দর্শকদেরও আগমন বৃদ্ধি পেতে থাকে। তখন সরকার আবুল হোসেন বাগানবাড়িতে বসবাস বন্ধ করেন দেন এবং তার পরিবারের সদস্যদের সরিষাবাড়িতে স্থানান্তর করেন। এরপর থেকে তিনি বাগানবাড়িতে শিশু পার্ক, মিনি চিরিয়াখানা, শুটিং স্পট, লেক, উন্মুক্ত অডিটরিয়াম নির্মাণ করার নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও শুরু করেন্। সরকার আবুল হোসেন ২০১৩ সালে তার বাগানবাড়ির নামকরণ করেন ‘যমুনা গার্ডেন সিটি’। ছুটির দিনে জমজমাট লোক সমাগমে মুখরিত হয় ‘যমুনা গার্ডেন সিটি’ বিভিন্ন এলাকা থেকে শতশত মানুষ আসে পিকনিক, শুটিং ও বিনোদনের জন্য।

‘যমুনা গার্ডেন সিটি’ দুটি পর্বে গড়ে ওঠেছে। একটি পর্বে আছে শিশু স্বর্গ, ভ্রমণ বিলাস, লাইলী-মজনুর চত্বর, পিকনিক স্পট, ফুল ও ফলের বাগান, মিনি চিরিয়াখানা, হানি সুইং। অপর পর্বে আছে জলে ভাসা পদ্ম পুকুর, স্বপ্নীল, জলডাঙ্গা সেতু, সুজন বাধিয়ার ঘাট, সুজন বাধিয়ার ঘর, শান্তিনীড়,অচিনপুরী, মনিপুরী ঘর, সাধারণ বৈঠকখানা, পেডেল বোট, উন্মুক্ত অডিটরিয়াম, মাছ নিয়ে খেলা, মানষী কর্ণার, তাপসী কর্ণার, বাঁধন স্কয়ার, আঙ্গুর, কমলা, ন্যাসপাতি, আরবীয় খেজুর, পামওয়েল আরও নানা জাতের গাছগাছালিতে ভরপুর ‘যমুনা গার্ডেন সিটি’।
‘যমুনা গার্ডেন সিটি’র প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সরকার আবুল হোসেন। তার বড় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ কলিম উদ্দিন মাষ্টার গার্ডেন সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সায়মা আক্তার মলি পরিচালক। সরকার আবুল হোসেন ‘যমুনা গার্ডেন সিটি’র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স¤পর্কে বলেন, মানুষের কর্ম-চাঞ্চল্যের ভীড়ে একটু আনন্দ ও বিনোদনের মাধ্যমে মনকে প্রফুল রাখতে যথাসাধ্য সহায়তা করাই আমাদের লক্ষ্য। প্রাকৃতিক জীব-বৈচিত্র্যের সাথে পরিচিত হওয়া এবং প্রকৃতির মাঝে নিজেকে চিনতে ও জানতে পারা; উদার প্রকৃতির প্রেম ও ভালবাসায় অবগাহন করা। এসব উদ্দেশ্য নিয়েই আমাদের এই সামাজিক অগ্রযাত্রাÑবললেন সরকার আবুল হোসেন।
জামালপুর জেলা শহর থেকে সরিষাবাড়ি হয়ে মাত্র এক ঘন্টার পথ। পিচঢালা আঁকাবাঁকা পথে ‘যমুনা গার্ডেন সিটি’তে গেলে আপনার সত্যি ভাল লাগবে। আমরা কক্সবাজার যাই, রাঙ্গামাটি যাই, ফ্যান্টাসী কিংডমে যাই, গজনী অবকাশ, মধুটিলা ইকোপার্ক ও লাউচাপড়া যাইÑ তাতে যে টাকা খরচ হয়। ‘যমুনা গার্ডেন সিটি’কে দু’চোখ মেলে দেখতে অতটাকা খরচ হবার নয়। ঘুরে আসুন একটু সময়। সবসময়Ñবছরের ১২ মাস। পলীকবি জসিম উদ্দিনের ভাষায়Ñ তুমি যাবে ভাই/যাবে মোর সাথে/আমাদের ছোট গাঁয়……….।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।




