জসীম উদ্দিন তালুকদার, বিলাইছড়ি (রাঙ্গামাটি) : পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির সৌন্দর্য বরাবরই পর্যটকদের আকর্ষণ করে থাকে। তবে রাঙ্গামাটির কিছু জায়গা রয়েছে যার সৌন্দর্য পর্যটকদের বিশেষভাবে কাছে টানে, বার বার সেখানে যেতে অনুপ্রাণিত করে। এমনই একটি এলাকা বিলাইছড়ি। বিলাইছড়ি বাংলাদেশের একমাত্র উপজেলা যার সাথে বার্মা ও ভারতের অভিন্ন সীমান্ত আছে। এর চতুর্দিক ঘিরে রয়েছে সবুজ অরণ্য আচ্ছাদিত উঁচু-নিচু পাহাড়, কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলরাশি, হ্রদের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো খাড়া পাহাড় থেকে প্রবাহিত ঝর্ণা ও ছড়া। এখানে পাখপাখালি ও ঝর্ণার কলতানে ছন্দমুখরিত প্রকৃতির মনমাতানো স্নিগ্ধরূপ যে কোন সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের হূদয়কে আলোড়িত করে তোলে।
অনিন্দ্য সুন্দর পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে রাঙ্গামাটির বিলাইছড়িতে। এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পর্যটন উপযোগী দুর্লভ প্রাকৃতিক ঝর্ণা ও সুন্দর স্থান। কিন্তু বিলাইছড়ির দর্শনীয় স্পটগুলো প্রশাসনের উদ্যোগে পর্যটনের উপযোগী না করায় দেশ বিদেশের অসংখ্য পর্যটক এই নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
কাপ্তাই হ্রদের দক্ষিণ পূর্বকোণ হয়ে বিলাইছড়ি আসলে মনে হবে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে শাপলা ফুলের ন্যায় ভাসমান বিলাইছড়ি উপজেলা সদর। যার চতুর্দিকে রয়েছে সবুজ অরণ্য আচ্ছাদিত উঁচু-নিচু পাহাড়,কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলরাশি, হ্রদের গা ঘেষে দাড়ানো খাড়া পাহাড় থেকে পানি প্রবাহিত ঝর্ণা ও ছড়া। এখানে পাখপাখালি ও ঝর্ণার কলতানে ছন্দমুখরিত প্রকৃতির মনমাতানো øিগ্ধরূপ যে কোন সৌন্দর্য্য পিপাসু মানুষের হৃদয়কে নাচিয়ে তোলে। এখানকার সবুজ পাহাড়ের উপর নীল আকাশের সান্নিধ্যে সূর্যাস্তের রক্তিম কিরণ গোধূলিলগ্নে রাইংখ্যং হ্রদের স্বচ্ছ জলের উপর প্রতিফলনের দৃশ্য দেখার মত। রাইংখ্যং নদীর উৎপত্তি হয়েছে রাইংখ্যং পুকুরের পাদদেশ থেকে। এই রাইংখ্যং পুকুরের পূর্বে ভারত, দক্ষিণে বার্মা, পশ্চিমে ও উত্তরে বাংলাদেশের অবস্থান। ষাটের দশকে কর্ণফুলী নদীর উপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে জলরাশির বিপুল সঞ্চিত ভান্ডার হিসেবে কাপ্তাই কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি। এই হ্রদে বিলাইছড়ি উপজেলার মধ্য দিয়ে রাইংখ্যং নদী প্রবাহিত। নদীর প্রবাহমান খালের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠে শুষ্ক মৌসুমে। বছরের অন্যান্য সময়ে নদী পানিতে একাকার হয়ে থাকে। হ্রদের পানির সাথে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য মোহিত বিলাইছড়িতে রয়েছে চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, এিপুরা, পাংখোয়া, মোরং, কিয়াং ও বম সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যময় জীবন প্রণালী, পাহাড়ি রমণীদের হাতে বোনা আকর্ষণীয় কাপড় ও পাহাড়ি পরিবারের আবাসস্থল মাচার বাড়ি এবং পাহাড়ের সন্নিকটে লেকের ধারে একাগ্রচিত্তে নির্মল হাওয়ায় প্রকৃতির শোভা উপভোগ করার জন্য বিলাইছড়ি মনকাড়া দর্শনীয় স্থান। যা স্বচক্ষে না দেখলে এর প্রকৃত রূপ সম্পর্কে কারো ধারণা জন্মাবে না ।
ইঞ্জিল চালিত বোটে কাপ্তাই হ্রদের রাইংখ্যং নদী হয়ে বিলাইছড়ি যেতে দেখা যাবে প্রকৃতির অপূর্ব রূপ। দুই ধারে পাহাড়,পাহাড়ের চূড়া ও সর্বাঙ্গ জুড়ে সবুজের সমারোহ। পাহাড়ের গায়ে কখনওবা ঝোপে ঝোপে কলাগাছ,কখনও বাঁশ ঝাড়,গাছের বাগান ও মাঝে মাঝে অন্যান্য বড় বৃক্ষ, লেকের ধার ঘেষে কাশের ঝোপ। দেখা যাবে হ্রদে চলা নৌকাগুলো কখনও মানুষ পারাপার করছে,কখনও বন থেকে আহরিত কাঠ বা লেক থেকে ধরা মাছ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বোট আমতলি মোড় ঘুরলে দূর থেকে বিলাইছড়ি উপজেলা সদরকে দেখে মনে হবে ছবির মত একটা অপূর্ব শহরের দিকে যেন বোট এগুচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মনলোভা বিলাইছড়ির দর্শনীয় স্থান হল নকাবা ছড়া ঝর্ণা। বিলাইছড়ি লঞ্চ ঘাট নতুবা নলছড়ি ঘাট থেকে ইঞ্চিন বোটে করে বিলাইছড়ি ডেবার মাথা নতুবা বাঙ্গালকাটা নামক স্থানে এসে ওখান থেকে পায়ে হেঁটে নকাবা ছড়া ঝর্ণায় আসতে হয়। প্রাকৃতিক এই ঝর্ণা অপরূপ সৌন্দর্য্যরে দৃষ্টিনন্দন অনন্য এক স্পট। বিলাইছড়ি সদরের ধুপ্যাচর ও দীঘলছড়ি দু’স্থানের দু’টি সেতু থেকে দর্শনার্থীরা লেকের স্বচ্ছ জলরাশি ও সবুজ পাহাড়ের দূরের দৃশ্যাবলী অবলোকন করে। এখানে আসলে পাহাড়ি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বাস্তবে দেখা ও জানা যায়। বিলাইছড়ি সদর থেকে পশ্চিমকোণে গাছকাঠাছড়া চাদেরী ছড়া ঝর্ণা সিলেটের জাফলং ও রাঙ্গামাটির সুভলং এর চেয়েও অনেক অনেক সুন্দর প্রাকৃতিক ঝর্ণা। এই স্থানে একসাথে ৩টি ঝর্ণা দেখার মত। একটি ঝর্ণা বৃহৎ আকারে ঢালু হয়ে পাথরের চাদরে ঢাকা এবং পাথরের উপর দিয়ে শৈল্পিকভাবে পানি পড়ার দৃশ্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। এটির উপরি অংশে পৃথক দু’টি ঝর্ণায় কয়েকশত ফুট পাহাড়ের চ’ড়া থেকে অবিরাম পানি গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য দেখলে যে কারও হৃদয়- মন সবুজ শ্যামল প্রকৃতির নিসর্গে হারিয়ে যাবে। চারদিক সবুজ অরণ্যে ঘেরা প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যরে আরেক দর্শনীয় স্থান হল বিলাইছড়ির পাংখোপাড়া। বিলাইছড়ি সদর থেকে সোয়া এক ঘন্টা সময়ে ইঞ্চিন চালিত বোটে করে পাংখোপাড়ায় যেতে হয়। সেখানে দেখা যাবে আঁকা-বাঁকা নদী পথে মনমুগ্ধকর সবুজের øিগ্ধতা, সুউচ্চ সিড়ি বেয়ে পাংখোয়া সম্প্রদায়ের আবাসস্থলে যাওয়া, হেলিপ্যাডে উঠে প্রকৃতির নিসর্গ উপভোগ করা। তাছড়া যদি ফারুয়ায় যাওয়া হয় তাহলে দেখা যাবে পাহাড়ের গায়ে কারুকাজ করা শৈল্পিক স্থাপত্যকীর্তির ন্যায় অপরূপ পাহাড়। মনে হবে যেন এগুলো বৃক্ষ আচছাদিত কোন মন্দিরের দেয়াল বা স্থাপত্যকীর্তি। ভ্রমণ যে কারও শরীরে প্রাণশক্তি ও প্রাণপ্রাচুর্য আনে। এই দেশটি ছোট হলেও প্রকৃতি অপার হাতে একে সৌন্দর্যের বৈচিত্র্য দিয়েছে। পাহাড়, নদী, হ্রদ, জঙ্গল,পাহাড়ি ঝর্ণার রিনিঝিনি আর পাহাড়ি সংস্কৃতি মিলে বিলাইছড়ি এমনই এক অপূর্ব সুন্দর ছোট্ট বাংলাদেশ। প্রকৃতির আদিম অকৃত্রিমতায় মনের খোরাক ও জীবনের গতি পেতে যে কারও দুটো দিন চমৎকার কাটবে বিলাইছড়িতে। তবে পর্যটকদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে হোটেল,মোটেল ও রেস্ট হাউস নির্মাণ এবং নকাবাছড়া ঝর্ণায় যাবার জন্য রাজধনছড়া খালে ব্রীজ ও নকাবাছড়া পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ অত্যাবশ্যক। তাছাড়া গাছকাটাছড়ি এলাকায় চাদেরীছড়া ঝর্ণায় যাবার পথে রাস্তা বা সড়ক নির্মাণ করে গাড়ি চলাচলের উপযোগী করা হলে দেশ-বিদেশের অসংখ্য নারী-পুরুষের আগমন ঘটবে বিলাইছড়িতে। তখন সুখী ও নব দম্পতি, যুগল প্রেমিক প্রেমিকা বা পরিবারের পদভারে মুখরিত হবে বিলাইছড়ি। এছাড়া সরকারি উদ্যোগে ব্যাপক পরিকল্পনার মাধ্যমে বিলাইছড়ি উপজেলাকে পর্যটন শিল্পের জন্য গড়ে তোলা হলে এই স্থানটি দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং সরকার নি:সন্দেহে বিশাল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারবে।




