শ্যামলবাংলা ডেস্ক : আজ ২৮ সেপ্টেম্বর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জেষ্ঠ্য কন্যা, আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৬৯তম জন্মদিন। মধুমতি নদী বিধৌত গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত পল্লীতে ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান তিনি। শেখ লুৎফর রহমান এবং সাহেরা খাতুনের অতি আদরের নাতনি হাসু।
শৈশব কৈশোর কেটেছে দাদা-দাদির কোলে-পিঠে, বাইগার নদীর তীরে, টুঙ্গিপাড়ায়। বাবার দেখা পেতেন কদাচিৎ। বাবা শেখ মুজিবুর রহমান, জেল-জুলুম, রাজরোষ ছিল তার নিত্য সহচর। রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সংগঠন নিয়েই শেখ মুজিবুর রহমানের দিন-রাত্রি যাপিত জীবন। এ কারণে পুত্র-কণ্যারা বাবার সান্নিধ্য পেয়েছে খুবই কম। পাঁচ ভাই- বোন। কনিষ্ঠদের মধ্যে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা এবং শেখ রাসেল। শেখ হাসিনা গ্রামবাংলার ধূলোমাটি আর সাধারণ মানুষের সঙ্গে বেড়ে উঠেন। গ্রামের সঙ্গে তাই তাঁর নিবিড় সম্পর্ক।

শেখ হাসিনার শিক্ষাজীবন শুরু হয় টুঙ্গিপাড়ার এক পাঠশালায়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হওয়ার পর পরিবারকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। তিনি পুরানো ঢাকার মোগলটুলির রজনী বোস লেনে বসবাস শুরু করেন। পরে তিনি যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য হন। আবাস স্থানান্তরিত হয় ৩ নম্বর মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে। ১৯৫৬ সালে শেখ হাসিনা ভর্তি হন টিকাটুলির নারীশিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়ে। এভাবেই শুরু হয় তার শহরবাসের পালা। তার নাগরিক জীবন। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িটির দ্বারোদ্ঘাটন হয়। পঁচাত্তর সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবার নির্মমভাবে মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত এই বাড়িতেই অবস্থান করেন। ১৯৬৫ সালে শেখ হাসিনা আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন ঢাকার বকশী বাজারের পূর্বতন ইন্টারমিডিয়েট গভর্নমেন্ট গার্লস কলেজ (বর্তমান বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়) থেকে। সে বছরই তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি কলেজ ছাত্রী সংসদের সহ-সভানেত্রী পদে নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় কিশোর বয়স থেকেই রাজনীতিতে পদচারণা তার। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রলীগের নেত্রী হিসাবে তিনি আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন এবং ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু উত্থাপিত ৬ দফা দাবিতে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এক অভূতপূর্ব জাতীয় জাগরণ সৃষ্টি হয়। শাসকগোষ্ঠী ভীত-সন্ত্রস্ত্র হয়ে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। এই ঝড়ো দিনগুলিতেই, কারাবন্দি বাবা বঙ্গবন্ধুর আগ্রহে পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম. এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ে হয় ১৯৬৮ সালে। বিয়ের কিছুদিন পর শুরু হয় ১১-দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। শেখ হাসিনা ছাত্রলীগ নেত্রী হিসেবে তাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৮১ সালের ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন হয়। জাতির এক ক্রান্তিলগ্নে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন শেখ হাসিনা। এরপর দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে সামরিক জান্তা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে চলে তার একটানা অকুতোভয় সংগ্রাম।
১৯৯৬ সালের ১২ জুনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের ষড়যন্ত্র ও কারচুপির নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করে। ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট বিএনপি-জামায়াত জোটের মদদে আওয়ামী লীগের সমাবেশে পরিকল্পিতভাবে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা করা হয়। তিনি গুরুতর আহত হলেও সেদিন প্রাণে বেঁচে যান। তবে ওই হামলায় আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতা-কর্মী নিহত হন।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় একের পর এক মিথ্যা মামলা। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অর্জিত হয় ঐতিহাসিক বিজয়। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। তার জীবনের ওপর বার বার ঝুঁকি এসেছে। অন্তত ১৯ বার তাকে হত্যার অপচেষ্টা করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার অবদান আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ইতোমধ্যে তিনি শান্তি, গণতন্ত্র, স্বাস্থ্য ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার, দারিদ্র্য বিমোচন, উন্নয়ন এবং দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ভূষিত হয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ অসংখ্য পদক ও পুরস্কারে। অতি সম্প্রতি জাতিসংঘের ৭০ তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুটি পুরুস্কারে ভূষিত হন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভূমিকা এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ ও ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে যুগান্তকারী উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার প্রদান করা হয়।
আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের ৭০তম অধিবেশন উপলক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত শেখ হাসিনার জন্মদিনে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘজীবন কামনা করে ফুলের তোড়া উপহার দেয়া হয়। এছাড়াও বাদ জোহর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ দেশের বিভিন্ন মসজিদে মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বিকেল ৪টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মিলাদ, দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। দুপুর ১২টায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এবং প্যাগোডা, গির্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার ৬৯তম জন্মদিন পালন করার জন্য দলের সব শাখা, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।




