• শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ০১:২৮ পূর্বাহ্ন

শহীদ বুদ্ধিজীবীরা আমাদের আদর্শ ও চেতনা : ড. আবদুল আলীম তালুকদার

প্রতিবেদকের নাম / ৪৫৮ বার পঠিত
প্রকাশকাল : সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২০

আমরা এমন এক সময়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উদ্যাপন করছি যখন সারাবিশ্বে করোনা মহামারীর (কোভিড-১৯) দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ছে। যেসব রাষ্ট্র নিজেদেরকে মহাশক্তিশালী মনে করে থাকে তারাও এই মহামারীর কবলে পড়ে রীতিমত বেসামাল হয়ে পড়ছে, পর্যুদস্ত হয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত। কিছুতেই মৃত্যুহার ও সংক্রমণের হার বৃদ্ধি ঠেকাতে পারছেনা। এর সাথে আমাদের দেশে নতুন করে যোগ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। ‘কোনটি ভাস্কর্য কোনটি মূর্তি’ এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বিতর্ক-বাহাছ-মিটিং-মিছিল তো দেশব্যাপী চলছেই। ইদানিংকালে পত্রিকান্তরে অরেকটি খবর গুরুত্বের সাথে চাউর হচ্ছে তাহলো- জামুকার ভাষ্য অনুযায়ী,গেজেটভূক্ত প্রায় ৫৫ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার সব ধরনের তথ্য ফের যাচাই-বাছাই করা হবে। এজন্য প্রতি উপজেলায় ৪ সদস্যের যাচাই-বাছাই কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এসব মুক্তিযোদ্ধা ২০০২-২০১৪ সালে তালিকাভূক্ত হন। কিন্তু সেইসময় ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০০২’ অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। এসব বীর মুক্তিযোদ্ধা যাচাই কমিটির কাছে নিজেদের সপক্ষে তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারলে তাদের গেজেট বহাল থাকবে। অন্যথায় গেজেট সনদ বাতিলের পাশাপাশি ভাতাও বন্ধ হবে। স্বাধীনতা অর্জনের পর অর্ধশতাব্দীকাল পেরিয়ে গেলেও আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন না হওয়ার কারণে এরকম একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা আজও একটা সুরাহায় আসতে পারিনি; এটা জাতির জন্য মোটেও ভালো সংবাদ নয়। যাহোক এবার মূল আলোচনায় আসাযাক-

১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস বাংলাদেশে পালিত একটি বিশেষ দিবস। এই দিনটি বাঙালি জাতির জীবনে একটি স্মরণীয় ও কলঙ্কের দিন। প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর দিনটিকে আমরা শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করে থাকি। ১৯৭১ এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাতেই পাকিস্তানি হানাদার সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর কর্তৃক পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের জ্ঞানী-গুণী ও মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন সূর্যসন্তান বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করে। ১৯৭১ এর ডিসেম্বর মাসে স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন বুঝতে শুরু করে যে তাদের পক্ষে যুদ্ধে জেতা সম্ভব নয় এবং বাঙালি জাতি যাতে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে এজন্য তারা নবগঠিত দেশকে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে দুর্বল এবং পঙ্গু করে দেয়ার পরিকল্পনা ও নীলনকশা করতে থাকে। সেই ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিজয়ের ঊষালগ্নে ১৪ ডিসেম্বর রাতে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসরদের সহায়তায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিজ নিজ গৃহ হতে তুলে এনে নির্মম নির্যাতনের পর ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে। এই পরিকল্পিত গণহত্যাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। বন্দী অবস্থায় বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন বধ্য ভূমিতে হত্যা করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের ক্ষত-বিক্ষত ও বিকৃত লাশ রায়ের বাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে পাওয়া যায়। অনেকের লাশ শনাক্ত ও করা যায়নি, পাওয়া যায়নি বহু লাশ। ১৯৭১ এর ১৪ ডিসেম্বরের নির্মম হত্যা কাণ্ডের কথা স্মরণ করে প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশে পালিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস। নাগরিক কবি শামসুর রাহমান শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যা কারীদের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আজ এই ঘোর রক্ত গোধুলিতে দাঁড়িয়ে/ যারা আমার কলিজায় সেঁটে দিয়েছে/একখানা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ।’
কোনো জাতির অগ্রগতি ও উন্নতির পেছনে থাকে তাদের বুদ্ধিজীবিদের অবদান। জ্ঞান, মেধা, মননে এবং সংস্কৃতিতে উন্নত জাতি হিসেবে কাজ করেন বুদ্ধিজীবীরা। জাতি গঠনের কারিগর বলা হয় বুদ্ধিজীবীদের। জাতীর সেই মেধাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল বর্বর পাকিস্তানিরা।
দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করার জন্য এদেশের শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, চলচ্চিত্রশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী, চিত্রশিল্পীসহ বুদ্ধিজীবিদের ভূমিকা ছিল অনন্য। তাদের ভূমিকা শুধু যুদ্ধের নয় মাসেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্রিটিশ আমলে পরাধীনতার বিরুদ্ধে পরবর্তীকালে বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের প্রতিটি সংগ্রামে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্বশাসন আন্দোলন এবং ’৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানে তারা ছিলেন অনুপ্রেরণা দানকারী। কেউ কেউ ছিলেন সামনের কাতারে। বাঙালি জাতির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ, অত্যাচারের বিষয় সাধারণ মানুষকে অবগত করেছিলেন তারা। বাংলাদেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাচ্ছিলো একথা সবাই জানতো। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন সারণীর মাধ্যমে সে সত্যটা জনগণের সামনে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে ছিলেন। তারাই সর্ব প্রথম পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে দুটি স্বতন্ত্র অর্থনীতি চালুর কথা বলেছিলেন। বাঙালি সাংবাদিকরা তুলে ধরেছেন আন্দোলনের প্রতিটি খবর শিল্পী-সাহিত্যিকরা গল্প-উপন্যাস, নাটক, গানসহ লেখনীর মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক মৌলিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের প্রতি সচেতন করে তুলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা কখনো স্বতন্ত্র, কখনো একই সঙ্গে করেছেন আন্দোলন। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছেন বুদ্ধিজীবীরা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নয়াদিল্লীতে ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর নাগাদ এক আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। বিশ্বের ২৪টি দেশের ১৫০ জনের মতো বুদ্ধিজীবী এই সম্মেলনে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন। প্রখ্যাত ফরাসী মনীষী আঁন্দ্রে মারোকে এই সম্মেলনের জন্য আমন্ত্রণ পত্র পাঠানো হয়েছিল। তিনি অপারগতার কথা জানিয়ে এক চমৎকার জবাব দিয়েছিলেন। তিনি এই মর্মে জানিয়েছিলেন যে, তাঁর বয়স এখন সত্তরের ঊর্ধ্বে। এসময় প্যারিস থেকে বিমানে দিল্লী আসার ধকল সহ্য করার মতো যদি তাঁর শারীরিক সামর্থ্য থাকতো, তাহলে তিনি আরও কিছুদূর এগিয়ে অস্ত্র হাতে বাংলাদেশের রণাঙ্গনে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই-এ অংশ গ্রহণ করতেন। এতে অন্তত: এই বয়সেও তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতায় একটা নতুন অধ্যায় সংযোজিত হতো।
বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও গবেষণায় দেখা যায়, ভারতে আশ্রয় নেয়া বুদ্ধিজীবীরা গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’ যার সভাপতি ছিলেন ড. আজিজুর রহমান মল্লিক (এ আর মল্লিক)। যিনি পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন। এছাড়া তাকে সভাপতি এবং সাংবাদিক ও সাহিত্যিক জহির রায়হানকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম পরিষদ। বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন মুজিবনগর সরকারের অধীনে পরিকল্পনা সেল গঠন করেন। বিশ্বের বুদ্ধিজীবিদের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সরবরাহ ও বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় সংসদীয় দলের সাথে সাক্ষাৎ ও সাহায্যের আবেদন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য প্রদান, শরণার্থীদের উৎসাহ প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে তারা ভূমিকা রাখেন। শরণার্থী শিবির শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে পঞ্চাশোর্ধ স্কুল খুলে শরণার্থীদের বাচ্চাদের শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করে। বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা কামীদের প্রেরণার উৎস ছিল। এভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেন।
স্বাধীনতা বিরোধী চক্র বুঝতে পেরেছিল, তাদের পরাজয় অনিবার্য। তারা আরও মনে করেছিল যে, বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা বেঁচে থাকলে এ মাটিতে তারা বসবাস করতে পারবেনা। তাই পরিকল্পিত ভাবে জাতিকে মেধাহীন ও পঙ্গু করতে দেশের বুদ্ধিজীবীদের বাসা এবং কর্মস্থল থেকে রাতের অন্ধকারে পৈশাচিক কায়দায় চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে হত্যা করে। অনেকে ভাগ্যবশত মৃত্যু এড়াতে পেরেছিলেন। পরে বীরত্বের সাথে যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন কিংবা মুজিবনগর সরকারের পক্ষে বিদেশে জনমত গঠনে কাজ করেছেন। দিল্লী ও কোলকাতার লেখক বুদ্ধিজীবিরাও সে সময় বাংলাদেশের পক্ষে কলম ধরেছিলেন। জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন।
পরিশেষে, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা দেশ ও জাতির উন্নয়ন এবং অগ্রগতির রূপকার। তাঁদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, উদার ও গণতান্ত্রিক চিন্তা চেতনা জাতীয় অগ্রগতির সহায়ক। জাতীর বিবেক হিসেবে খ্যাত দেশের বুদ্ধিজীবীরা তাদের ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি, যুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারকে পরামর্শ প্রদানসহ বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিতে ব্যাপক অবদান রাখেন। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রেখে যাওয়া আদর্শ ও পথকে অনুসরণ করে কল্যাণকর ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিত্তিক সমাজ গড়তে পারলেই তাঁদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সহ.অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।

Print Friendly, PDF & Email


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর