• শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ০১:৩৮ পূর্বাহ্ন

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন ও সরকারি স্বার্থ রক্ষায় স্বার্থান্বেষীদের যত ক্ষোভ ও বিশ্বাসে চিড়…

প্রতিবেদকের নাম / ৭৭৫ বার পঠিত
প্রকাশকাল : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সিভিল সার্ভিসে জয়েন করার অল্প কিছু দিন পরে ৬ মাসের বুনিয়াদী প্রশিক্ষণে যেতে হলো। একদিকে ঢাকায় বেড়ে ওঠা ২৫ বছরের অভ্যস্ত জীবন ও পরিচিত পরিবেশে, পরিবার, স্বজন, বন্ধুদের ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট, অন্যদিকে স্বাধীনচেতা, ভ্রমণপিপাসু ও কর্পোরেটের চাকরি ছেড়ে শীতের দিনে ভোর ৪.০০ টায় উঠে পিটি, দৌড়ঝাঁপ, সকাল ৭.৩০টায় নাস্তা, কঠিন নিয়ম কানুন, সারাদিন ক্লাশ-পরীক্ষায় মন খুব বিদ্রোহ করতো। নিজের সাথে, মনের যুদ্ধ চলত। মাঝে মাঝে মন বলতো, যা ভেগে যা। পরক্ষণেই ভেতর থেকে কেউ একজন বলতো “এ দেশ থেকে নিয়েছ অনেক, দিয়েছ কী কিছু???” প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যা পড়াশোনা করেছ, তোমার পেছনে সরকারের যে ব্যয়, তা সব এই দেশের ঘামেভেজা মেহনতি মানুষের টাকা। সময় এসেছে তাদের ঋণের কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দেওয়ার। কানে ভাসতো বাবা চলে যাওয়ার আগে বলা, “১ম শ্রেনীর সরকারি চাকরি পেলে কেউ বেসরকারি চাকরি করে না। (বাবা আমার সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করাটা কম পছন্দ করতেন)। তুমি আবার ভালো করে বিসিএস দাও, মানুষের জন্য কিছু করার জন্য প্রশাসনের চেয়ে বেশি সুযোগ আর কোনো চাকরিতে নেই”। এমন এলোমেলো ভাবনায় প্রশিক্ষণ শেষে প্রথম পোস্টিংয়ের জেলায় ফিরে আসা।

জেলায় ফিরে আসার আগেই জেনে গেছি এ সার্ভিসে থেকে নিজের জেলায় চাকরি করার সুযোগ নেই। যে জেলায় পদায়ন হবে সেটিকেই নিজের জেলা মনে করে কাজ করতে হবে। এখনো সেই জেলার কেউ ফোন দিলে বা মেসেজ করলে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধমের ইনবক্সে বার্তা দিলে মনে হয় আপনজন কেউ যোগাযোগ করছে। জাতীয় পর্যায় জেলা ব্র্যাডিং পুরষ্কার, বিভাগী পর্যায় বিজ্ঞান মেলায় পুরষ্কার, ইনভেশন পুরষ্কার আইসিটি প্রতিযোগিতাসহ বেশ কিছু প্রতিযোগিতায় জেলার প্রতিনিধিত্ব করে পুরষ্কার পেয়ে মনে হয়েছে নিজের জেলা বিজয়ী হয়েছে। কখনোই মনে হয়নি অন্য জেলা বিজয়ী হয়েছে। এখনো এ জেলার কোনো শিক্ষার্থী জাতীয় বা বিভাগীয় পর্যায় বিতর্কে, নাচে, গানে, পরীক্ষার ফলাফলে বা যেকোনো প্রতিযোগীতায় ভালো করলে গর্ব বোধ হয়। মনেহয় আমার নিজের কেউ ভালো কিছু করলো। এ জেলার বিতার্কিক, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, তরুণ সাংবাদিকগণ, শ্রদ্ধেয় মুক্তিযোদ্ধাগণের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হয়, কথা হয়, ভাবের আদান-প্রদান হয়। মনেহয় এখনো আমি তাদের মাঝেই আছি।
জেলা প্রশাসনে কাজের কোনো অন্ত নেই। ছোট্ট জেলা বলে অফিসার কম কিন্তু কাজ তো আর কম নয়। তাই এক এক জন অফিসারকেই অনেকগুলো শাখার দায়িত্ব নিতে হয়েছে তখন আমাদের। পিতৃতুল্য ডিসি স্যারসহ অসাধারণ সব সিনিয়র স্যার। তাই হাসিমুখেই কেটে যেত সকাল নয়টা থেকে রাত ৮ টা/৯টা পর্যন্ত। আবার কোনো কোনো দিন হয়তো এরও পরে অফিস শেষ হত। পরীক্ষার ডিউটি, মোবাইল কোর্ট, নিরাপত্তা দিয়ে প্রশ্নপত্র নিয়ে আসা, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান, নির্বাহী কোর্ট, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, প্রোটোকল ডিউটি, জেলা সমন্বয় মিটিং ও আইনশৃঙ্খলা মিটিং, রাজস্ব মিটিংসহ বিভিন্ন রকমের হাজারো কাজে কিভাবে যে দিন পেরিয়ে প্রায় মধ্য রাত হয়ে যেত তা বুঝতেই পারতাম না। জেলা প্রশাসনে এমন শত রকমের দায়িত্ব পালন ও সরকারি স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের থেকে অনেক চমৎকার কিছু শেখা যায় বলে ওদের নিয়ে কাজ করতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। এ জেলার বিতার্কিক, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, তরুণ সাংবাদিকগণ, শ্রদ্ধেয় মুক্তিযোদ্ধাগণ, শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ, বিভিন্ন সেবা নিতে আসা অতি সাধারণ মানুষটিকেও নিজের আপনজন মনে হয়। কারণ এদের কাছে যে ভালোবাসা পেয়েছি, তা ভোলার নয়। এদের জন্য আমার দরজা সব সময় থাকতো উন্মুক্ত। আক্ষরিক অর্থেই আমার দরজা সব সময় থাকতো উন্মুক্ত থাকতো। আমি অফিসে থাকা অবস্থায় কোনো দিন আমার অফিস কক্ষের দরজা বন্ধ করিনা। কারণ এখনো অনেক সহজ-সরল সাধারণ সেবাপ্রার্থী আছে যারা দরজা বন্ধ দেখলে সরকারি অফিসের দরজা খুলে ভেতরে এসে তাঁর প্রয়োজন বলতে ইতস্তবোধ করে। আমি বিশ্বাস করি যাদের করের টাকায় সরকার আমাকে বেতন দেয় তাদের সেবা করতে না পাড়াকে তো দূর্ভাগ্যই বলতে হবে। তবে জেলা প্রশাসনে কাজ করতে গিয়ে সকল অভিজ্ঞতাই আনন্দের ও সুখকর হয়েছে এমন নয়।
একবার কোনো এক উপজেলায়, উপজেলা সদর থেকে ৪০/৫০ মিনিটের দূরের এক স্কুলে এসএসসি পরীক্ষার ডিউটিতে গিয়ে দেখেছি নকল করতে শিক্ষার্থীদের চেয়ে অভিভাবকদের উৎসাহ বেশি। বলা যায় অভিভাবকগণ উৎসাহের সাথে নকল সরবরাহ করে এবং এটা করে উঠতি পাড়ার নেতা গোছের যুবাদের মধ্যে কেউ কেউ গর্ব বোধও করে!!! অবস্থা দেখে খুব কষ্ট লাগলো। ডিসি স্যারকে ১ম দিনের এ অভিজ্ঞতা জানিয়ে ২য় দিনেই পরীক্ষা কক্ষের জানালা পরীক্ষা শেষ হওয়ার দিন পর্যন্ত টিন দিয়ে অস্থায়ীভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হলো যাতে করে আর এসব কাজ না হতে পাড়ে। সেই একই উপজেলায় এইচএসসি পরীক্ষায় দেখেছি কলেজ ক্যাম্পাসের মাঠ যেন ছাগল-গরু থেকে উঠতি নেতা, জনপ্রতিনিধিদের অবাধ বিচারণ ভূমি! বিনয়ের সাথে তাদের জানিয়ে দিয়েছে এ নিয়ে আইনের কি বিধান ও এ আইন অমান্য করলে এর পরিণতি কি হতে পারে। মোবাইল কোর্ট, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান বা নির্বাহী কোর্টের রায় এমন অনেক কিছুই অনেকের পক্ষে যায়নি। তারা হয়তো তাদের বিপক্ষে যাওয়া অনেক কিছুই মেনে নিতে পারেনি, কিন্তু মনে ঠিকেই নিয়েছে। জেলা প্রশাসনে দায়িত্ব পালন ও সরকারি স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে এমন অনেক দুষ্ট লোক ও স্বার্থান্বেষীদের অপ্রিয় হয়েছি।
বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ শেষে জয়েন করার পরেই গিয়ে শুনলাম অনেকেই মজা করে বলে ৬৪ জেলার মধ্যে এই জেলা ৬৩তম। মজার ছলে তারা বল্লেও শুনতে খুব কষ্ট লাগতো। এ জেলার উন্নয়নে ডিসি স্যারকে দেখতাম সারাক্ষণ নতুন নতুন বিভিন্ন পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করতে সাথে সাথে লেগে যেতেন শুক্র-শনিবার অফডে বলে ডিসি স্যারের কাছে কিছু ছিলো না। আস্তে আস্তে এ জেলার সাধারণ মানুষ ডিসি স্যারকে এ জেলার পরিবর্তনের রূপকার ডাকতে শুরু করেন। ভাবতে খুব ভালো লাগতো যে সেই পরিবারের আমিও একজন সদস্য। আমরা চিন্তা করতাম কিভাবে এ জেলার পর্যটনে উন্নয়ন ঘটানো যায়? কিভাবে সাধারণ মানুষের কাছে সেবা সহজে পৌঁছে দেওয়া যায়? কিভাবে এ জেলা আরো গোছানো যায়? মানুষ জনের কষ্ট কিভাবে লাঘব করা যায়? জেলার উন্নয়ন’ই তখন হয়ে গিয়েছে আমাদের সকল চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু।
এরপর অল্প কিছু দিন কাজ করলাম অন্য এক জেলায়। নির্বাহী কোর্ট, মোবাইল কোর্ট ও আইসিটি নিয়ে সেখানে সবচেয়ে বেশি সময় নিয়ে কাজ করেছি। নির্বাহী কোর্টে সেবা প্রার্থী ও বিজ্ঞ লার্নেডদের থেকে যে পরিমানে শ্রদ্ধা ও সম্মান পেয়েছি তা আজীবন মনে থাকবে।
এখন প্রায় বছরের কাছাকাছি মেইনস্ট্রিম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কর্ম পরিবেশে আছি। এখানে কাজ করছি হোস্ট কমিউনিটি (স্থানীয় জনগণ), বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি ও আন্তর্জাতিক ও দেশীয় এনজিওদের সাথে। প্রতি মূহুর্তে চিন্তা থাকে কিভাবে স্থানীয় জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করা যাবে? কিভাবে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিশ্চিত করা যাবে? কিভাবে তাদেকে দ্রুত নিজ দেশে প্রত্যাবাসন করা যাবে? কিভাবে আমাদের স্থানীয় পরিবেশ সুন্দর করা যাবে? কিভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে বিভিন্ন অপরাধ থেকে দূরে রাখা যাবে সে চিন্তায়।
এভাবে কাজ করতে গিয়ে প্রায় নিজের পরিবার-পরিজন, আপনজন, বন্ধু-বান্ধব, আমার জন্মস্থান প্রায় সব’ই বাদ দিয়েছি। কর্মস্থল’ই এখন সব। গত ৬টি ইদের সবগুলো কাটিয়েছি কর্মস্থলে। একবার ভাবুন তো, আমাদের কি আপনজন, আত্মীয়স্বজন নেই? আমাদের কী মাটির টান নেই, আবেগ-অনুভূতি নেই? নিজের জেলা বাদ দিয়ে, আপনজন, আত্মীয়স্বজন, পরিবার-পরিজন বাদ দিয়ে দূর দুরন্তে পড়ে থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন ও সরকারি স্বার্থ রক্ষায় কাদের জন্য কাজ করি আমরা? সরকারি স্বার্থ সংরক্ষণ, নামকাওয়াস্তে কাজ শেষে বিল উত্তোলনে বাধা দেয়া, অবৈধ স্থাপনায় বাধা, নদী খাল রাস্তা বা চর দখলে বাধা দেওয়ার যদি হয় এই পরিণতি! নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার পরেও যদি এভাবে বিশ্বাসে চিড় ধরে, তাহলে কেউ কী আর আসতে চাইবে নিজের জীবন বিপন্ন করে এভাবে দায়িত্ব পালন করতে?
লেখক : মোস্তাফিজুর রহমান শাওন, সহকারী ক্যাম্প ইনচার্জ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়, কক্সবাজার।

Print Friendly, PDF & Email


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর