‘বাংলাদেশের সীমানাতেই শুধু থাকি। পড়াশুনা, চিকিৎসা থেকে শুরু করে কোম সুযোগ সুবিধা পাই না। পুলাপানগুলার পড়াশুনা বাধ্য হইয়াই বন্ধ কইরা দিছি। বন্য হাতির আক্রমণ আর নানা দুঃখ কষ্টের সাথে যুদ্ধ কইরা প্রতিটা দিন পার করি। নিজের ২৫ শতাংশ জমি থাকলেও বন্য হাতির তাণ্ডবে কখনই ফসল ঘরে তুলতে পারি না। তাই এইবার আবাদই করি নাই।’ কথাগুলো বলছিলেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্বিক জনগোষ্ঠীর কোচ সম্প্রদায়ের সদস্য সতীশ কোচ (৬৭)।
আক্ষেপ করে নিজস্ব সম্প্রদায়ের ভাষায় তিনি আরও বলেন, ‘নিনে কায়ুআন তাল্লাচা’। যার অর্থ হচ্ছে, কেউ আমাদের খোঁজ খবর নেয় না। তিনি বলেন, বাপ দাদার ভিটা ছাইড়া কই যামু? তবে ভাল সুযোগ পাইলে এইহানে কষ্ট কইরা থাকতাম না। এই কষ্ট শুধু সতীশের নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই এমন দুঃখ দূর্দশায় জীবন কাটছে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের খলচান্দা গ্রামে বসবাসরত কোচ সম্প্রদায়ের প্রায় ৭০ টি পরিবারের।

আদিবাসীদের বিভিন্ন সংগঠন সূত্রে জানা যায়, শেরপুর জেলার সীমান্তঘেঁষা নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীসহ তিনটি উপজেলার ২৫ হাজার একর বনভূমির মধ্যে বেশীরভাগ বন ভূমি জুড়েই ক্ষুদ্র নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাস। জেলার মোট জনসংখ্যার মধ্যে সমতল ও বনভূমি মিলিয়ে ক্ষুদ্র নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর ৭টি সম্প্রদায়ের রয়েছে ২৫ হাজার ৬ শত ১৫ জন মানুষ। যার মধ্যে নালিতাবাড়ী উপজেলার খলচান্দা গ্রামে মানবেতর জীবন-যাপন করছে কোচ সম্প্রদায়ের প্রায় ৭০ টি পরিবার
উপজেলার পোঁড়াগাও ইউনিয়নের বারোমারি বাজার থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূর্গম পাহাড়ী পথ পেরিয়ে পৌছতে হয় ভারতের সীমানাঘেঁষা খলচান্দা কোচ পাড়ায়। এই কোচ পাড়ায় প্রায় ৭০ টি পরিবার বসবাস করছে। দেশ এগিয়েছে, উন্নতি হয়েছে জনজীবন। কিন্তু ভাগ্য বদল হয়নি এই ক্ষুদ্র নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠীর এই সম্প্রদায়ের মানুষগুলোর। শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ নানান সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই কোচ সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

স্থানীয় কোচ সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই কোচপাড়ায় ‘কারিতাস’ থেকে শিশু শ্রেণির পাঠদান দেওয়া হলেও নেই কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রায় ৪ কিলোমিটারের দূর্গম পাহাড়ী পথ পেরিয়ে যেতে হয় বিদ্যালয়ে। তাই এই পরিবারগুলোর অধিকাংশ ছেলেমেয়ের ভাগ্যে জুটছে না প্রাথমিক শিক্ষা। ফলে এই সম্প্রদায়ের প্রায় শতাধিক ছেলে মেয়ে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ থেকে। এদিকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যও নেই কোন কমিউনিটি ক্লিনিক। চিকিৎসা পেতে তাঁদের ছুটে যেতে হয় প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ফসলের মৌসুমে বন্যহাতির সাথে লড়াই করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজীব কোচ (৪৭) বলেন, ‘বাজারে এক দোকানে চাকুরি করি। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে খুব কষ্টেই দিন পার করতেছি। বাড়ির পাশে কারিতাসের শিশু শ্রেণিতে ছেলে মেয়ে গুলা পড়ছে ছেলেটারে তাও বাজারে স্কুলে ভর্তি করছিলাম। ক্লাস সিক্স অব্দি পড়ছে। সাইকেল ছাড়া স্কুলে যাইবার চায় না। কিন্তু সাইকেল কিন্না দেওয়ার তো সামর্থ্য নাই। অহন তাই পড়ালেহা বন্ধই হইয়া গেছে। আর মেয়েটারে তো এত দূর স্কুলে পাঠাইবার সাহসই পাই নাই।’ জীবন কোচ (২৭) বলেন, ‘এখানে কেউ অসুস্থ হলে ৪ কিলোমিটার দূরের বারোমারি বাজার থেকে ভ্যান বা অটো নিয়া আসা লাগে। তারপর অই গাড়ীতে কইরা ১৭ কিলো দূরের উপজেলা হাসপাতালে নিয়া যাই।’ পরিমল চন্দ্র কোচ (৪৪) বলেন, ‘আগে তাও কারিতাসের স্কুলটাতে তৃতীয় শ্রেণি অব্দি পড়াইতো। অহন তো শুধু শিশু শ্রেণি পর্যন্ত। নিজেই উদ্যোগ নিয়া তাই তৃতীয় শ্রেণির প্রায় ১৫ জন ছেলেমেয়ে পড়াইতাছি।’
ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন (টিডব্লিউএ) এর সভাপতি কোপেন্দ্র নকরেক বলেন, ‘শুধু অস্তিত্ব সংকটই নয় সর্বশেষ গণশুমারীতেও আদীবাসীদের সংখ্যা কমানো হয়েছে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই সাংবিধানিকভাবে আদিবাসী স্বীকৃতিসহ আলাদাভাবে ভুমি কমিশন গঠনের দাবি জানাই।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার ববি বলেন, ‘ইতোমধ্যে কোচ সম্প্রদায়ের সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আপনার মাধ্যমে কোচ সম্প্রদায়ের সমস্যার বিষয়ে বিস্তারিত জানলাম৷ সমস্যা সমাধানে দ্রুতই উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’




