ads

মঙ্গলবার , ১৬ আগস্ট ২০২২ | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  1. ENGLISH
  2. অনিয়ম-দুর্নীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আমাদের ব্লগ
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. ইসলাম
  8. উন্নয়ন-অগ্রগতি
  9. এক্সক্লুসিভ
  10. কৃষি ও কৃষক
  11. ক্রাইম
  12. খেলাধুলা
  13. খেলার খবর
  14. চাকরির খবর
  15. জাতীয় সংবাদ

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: রাজনৈতিক অভিঘাত : ড. সৌমিত্র শেখর

শ্যামলবাংলা ডেস্ক
আগস্ট ১৬, ২০২২ ৫:০২ অপরাহ্ণ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের সদস্যসহ কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষের হত্যাকাণ্ড নিছক ব্যক্তিমাত্রের হত্যাকাণ্ড ছিল না। এটি ছিল একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং সুপরিকল্পিত। এই হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত ছিল জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি। বিশেষ করে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণকে অধিকার এবং এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ছিল এই হত্যাযজ্ঞের পেছনে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিশ্চয়ই একটি স্বাধীন দেশের জন্য হয়েছিল কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গেই যুক্ত ছিল মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। আর এই মুক্তি হলো অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে এই ‘সংগ্রাম’ ও ‘মুক্তি’ শব্দ দুটোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আর তার ভিত্তিতেই মূলত পরিচালিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

Shamol Bangla Ads

বিশ্বরাজনীতিতে তখন মুক্তি শব্দটি বহুমাত্রিকতা পেয়েছিল আর এই শব্দের পেছনে মূলত একটি বিশেষে রাজনীতির অনুসন্ধান করা হয়েছিল। যদিও ব্যাপারটি সে রকম করা উচিত ছিল না। কারণ, মুক্তির অধিকার প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে এবং সুন্দর করে বেঁচে থাকার ইচ্ছে প্রতিটি মানুষেরই জন্মগত হিসেবেই বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। বঙ্গবন্ধু এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন, যদিও প্রথম দিকে তিনি মূলত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পেছনে যুক্ত ছিলেন।

জাতীয়তাবাদী নেতা থেকে মুক্তিকামী নেতায় পরিণত হওয়ার ব্যাপারটি ঘটেছিল বঙ্গবন্ধুর ভেতরে ভেতরে এবং নানা অভিজ্ঞতা ও অধ্যয়নের কারণে। আর এটাই হয়ে ওঠে তাঁর মৃত্যুরও কারণ। কেননা, বিশ্বরাজনীতিতে মুক্তিকামী আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তখন খুবই জোটবদ্ধ ছিল এবং যে কোনোভাবেই হোক তারা বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে মুক্তিকামীদের হত্যায় মেতে উঠেছিল। এই হত্যার পেছনে তারা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কারণ দাঁড় করায়। বাংলাদেশেও ঠিক তেমনি খোঁড়া যুক্তি তারা দাঁড় করিয়েছিল, যে যুক্তিগুলো পরবর্তীকালের পর্যবেক্ষণে খুবই উদ্দেশ্যমূলক বলে প্রমাণিত হয়েছে। যেমন তারা বলেছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে মতপ্রকাশের অধিকার কমে গেছে, ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে, প্রতিবেশী দেশের খবরদারি বেড়েছে, গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে গেছে ইত্যাদি। কিন্তু এসবই ছিল আপেক্ষিক বিষয়। কোনো কিছুই সুনির্দিষ্ট করে তারা প্রমাণ করতে পারেনি, শুধুই বাগাড়ম্বর করেছে। আদতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়াটাই এই পক্ষের চক্ষুশূল ছিল, তার ওপর বঙ্গবন্ধু যখন মুক্তির ডাক দিলেন এবং স্বাধীনতার পর সে পথে ধাবিত হলেন তখন তো তারা কোনোভাবেই তা মেনে নিতে পারছিল না। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে, খুবই অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ একটি সংবিধান প্রণয়ন করার মধ্যেই শুধু কৃতিত্ব ছিল না। এর চেয়ে অনেক বেশি দূরদর্শিতা ছিল এই সংবিধানের প্রণীত চারটি মূলনীতির মধ্যে। জাতীয়তা, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র- এই চারটি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত দেশটি, বলা চলে, দক্ষিণ এশিয়াতে সবচেয়ে বিপ্লবী অভিযাত্রা শুরু করেছিল এবং এর নেতৃত্বে ছিল সদ্য সমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী অধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই অঞ্চলের আর কোনো দেশে এমন রসায়ন সেই সময় দেখা যায়নি। নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও বার্মা (তখনকার নাম) সহকারে কোনো দেশে বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা সে সময়ে ছিলেন না, যিনি একাধারে মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি দীর্ঘ সংগ্রামের সফল অধিনায়ক এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী। শুধু বঙ্গবন্ধু এককভাবে নন, তাঁর সম্পূর্ণ পরিবারই ছিল এই সংগ্রাম ও মুক্তির চেতনায় ঋদ্ধ এবং প্রত্যক্ষ সংগ্রামী। স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন নেছা, কন্যা শেখ হাসিনা, পুত্র শেখ কামাল ও শেখ জামাল, ভাগনে শেখ ফজলুল হক মনিসহ পরিবারের অনেক সদস্য ছিলেন সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বা মুক্তিযোদ্ধা। দেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকা এমন একটি রাজনৈতিক পরিবার সে সময় এই উপমহাদেশে কেন, বিশ্বজুড়েই ছিল বিরল। তাই ষড়যন্ত্রীদের লক্ষ্য শুধু ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু ছিল না, ছিল তাঁর পুরো পরিবারও। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সে কারণেই তারা সফল করে তাদের ষড়যন্ত্র এবং হত্যা করে বঙ্গবন্ধুকে শুধু নয়, তাঁর গোটা পরিবারকেও। রাসেলকেও তাদের ভয় ছিল। কেননা, শিশু হলেও তিনি তো বঙ্গবন্ধুরই সন্তান, এই পরিবারের সদস্য। ফলে তাঁকেও হত্যা করা হয়। শুধু বিদেশে ছিলেন বলে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেদিন বেঁচে যান। ঘাতকের হাত সেখান পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

Shamol Bangla Ads

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগে একটি প্রেক্ষাপট তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল এবং সে ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রকারীরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই, ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে বাধা, গণতন্ত্রের প্রয়োগ কম ইত্যাদির সঙ্গে অর্থনৈতিক বেসামাল ভাবতেও যুক্ত করে। অথচ সে সময় বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক মন্দা এবং বাংলাদেশের জন্য আরোপিত দুর্ভিক্ষ মূলত তাদের সৃষ্ট ছিল। রাজনৈতিকভাবে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি আহত সাপের মতোই প্রত্যাঘাত করার জন্য তৈরি ছিল, সর্বহারার রাজত্ব প্রতিষ্ঠার নামে একটি বড় গোষ্ঠী সে সময় অস্ত্র দিয়ে গ্রামীণ অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল। এই শক্তির পেছনে ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা না করা; বরং বলা চলে বিরোধিতা করা চীন দেশ। আরেকটি সক্রিয় শক্তি সে সময় প্রকাশ্যে বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছিল- তারা হলো মুক্তিযুদ্ধ থেকে আগত কিছু তরুণ, যারা মূলত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান তোলে। বেসামরিক এই শক্তিগুলোর পাশাপাশি সামরিক শক্তির মধ্যেও বঙ্গবন্ধুবিরোধী একটি চক্র দাঁড়িয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু সে সময় দেশ পুনর্গঠনে ব্যস্ত। তিনি বিভিন্ন স্থানে জনসভা করে সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করছেন এই বলে যে, দেশ গঠনে তাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক অভিঘাত বাঙালিদের জন্য ছিল খুবই বেদনাদায়ক। ১৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে রাতারাতি বাইরে আসে প্রাগুক্ত ষড়যন্ত্রকারীরা। সত্তরের দশকের ৫ বছর আর পুরো আশির দশক চলে মিথ্যের বেসাতি। জিয়াউর রহমান, বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচ এম এরশাদ সবাই মূলত একই রাজনীতির ধারা প্রবাহিত করে গেছেন এবং সেটি হলো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও আদর্শের একেবারে বিপরীত ধারা। ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তী ১৫ বছর ছিল বঙ্গবন্ধুর লালিত মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও আদর্শ ধ্বংসের জন্য তাদের যুগপৎ প্রত্যক্ষ চেষ্টা। এ সময় বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা। এই সময় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা ধারণাটি রীতিমতো ধর্মহীনতার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা আসলে ধর্মহীনতারই নামান্তর। অথচ বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল সর্বধর্ম ঠিকভাবে অনুসরণ করার একটি যুগপৎ ধারণা। বঙ্গবন্ধু নিজে ধর্ম পালন করতেন এবং অন্যদেরও ধর্ম পালনের ক্ষেত্র প্রসারিত করার জন্যই ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মূলত একটি বিশেষ ধর্মের নামে অপরাজনীতি করা হয়েছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর মাত্র ছয়/সাত বছরের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির এভাবে আত্মপ্রকাশ এবং প্রতিষ্ঠা, তা কল্পনা করা ছিল খুবই কষ্টকর। এ সময় পাঠ্যপুস্তকগুলোতে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী উপাদান ইতিহাস হিসেবে সন্নিবেশিত হয় এবং সেগুলোই পাঠ করে বাংলাদেশ একটি বিভ্রান্ত তরুণ সমাজ গড়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত চরিত্র এমনকি তাঁর পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের চরিত্র ও সম্পদ নিয়ে নানা মিথ্যা কাহিনি বা ডাকাতির গল্প প্রচার করা হয়। কারণ তারা মনে করেছিল, মৃত বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আদর্শিক শক্তি জীবিত অবস্থার থেকে কম নয়। তাদের এই মূল্যায়নটি যে সঠিক, তার প্রমাণ বঙ্গবন্ধুর আত্মজা শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ যে দৈহিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার নয়, অপপ্রচারের মধ্য দিয়েই স্তব্ধ হওয়ার নয়, আজ তা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

লেখক : উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

সর্বশেষ - ব্রেকিং নিউজ

error: কপি হবে না!