ads

শনিবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  1. ENGLISH
  2. অনিয়ম-দুর্নীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আমাদের ব্লগ
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. ইসলাম
  8. উন্নয়ন-অগ্রগতি
  9. এক্সক্লুসিভ
  10. কৃষি ও কৃষক
  11. ক্রাইম
  12. খেলাধুলা
  13. খেলার খবর
  14. চাকরির খবর
  15. জাতীয় সংবাদ

শেরপুরের প্রাচীন রাজধানী গড়জরিপা : আবদুস সামাদ ফারুক

শ্যামলবাংলা ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২২ ৯:২৯ অপরাহ্ণ

গড় শব্দটির আভিধানিক অর্থ কেল্লা, দুর্গ, পরিখা, খাত। অতীতে সম্রাট, রাজা, বাদশা ও শাসকরা কেল্লা কিংবা নিরাপত্তার জন্য সেনানিবাসে বসবাস করতেন। সেনানিবাস থেকে নিরাপদে রাজকার্য পরিচালনা করতেন। দিল্লির লালকেল্লা সম্রাট আকবরের স্মৃতি বহন করে। ঢাকার লালবাগের কেল্লা মীর জুমলার স্মৃতিকে লালন করে। মহাস্থানগড় আড়াই হাজার বছরের আগের রাজধানী এবং সেনানিবাস। গড়জরিপা বর্তমান শেরপুর শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে পশ্চিম-উত্তর দিকে অবস্থিত এক প্রাচীন জনপদ। যার অনেক সৌকর্য ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও এসব পুরাকীর্তি উদ্ধার করে এবং সংরক্ষণ করে গড়জরিপার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা যায়। গড়জরিপা শেরপুরের শাসকদের প্রাচীন রাজধানী এবং সেনানিবাস।

Shamol Bangla Ads

বর্তমান শেরপুর জেলা ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর পাড়ে অবস্থিত। একশ বছর আগেও জামালপুর শহর ও শেরপুর শহরের মধ্যবর্তী ১৬ কিলোমিটারজুড়েই ছিল ব্রহ্মপুত্র নদ। জামালপুর শহরের নদীঘাট থেকে শেরপুর শহরে পৌঁছতে নৌকা যাত্রীদের দশকাহন খরচ করতে হতো বলে শেরপুরের আরেক নাম দশকাহনিয়া বাজু। প্রাচীনকালে ব্রহ্মপুত্র নদ পদ্মার চেয়ে তিনগুণ প্রশস্ত ছিল। দক্ষিণ দিকে ব্রহ্মপুত্র এবং উত্তর দিকে গারো পাহাড় শেরপুর জনপথকে শত শত বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখে। যোগাযোগ বিছিন্নতার জন্য শেরপুর অঞ্চল কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল।

১৯০৬ সালে শ্রী কেদারনাথ মজুমদারের ‘ময়মনসিংহের বিবরণ’ গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ে কামরূপে মুসলিম শাসন মজলিস খাঁ হুমায়ুন ও গড়জরিপা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর আলোচনার সারমর্ম নিম্নে উল্লেখ করা হলো: ১৪৯১ খ্রিষ্টাব্দে ফিরোজ শাহ বাংলার সিংহাসনে আরোহন করেন এবং ব্রহ্মপুত্রের অপর পাড়ে বিজয়ের চেষ্টা করেন। তিনি তাঁর সেনাপতি মজলিস খাঁ হুমায়ুনকে সেনাবাহিনীসহ প্রেরণ করেন। মজলিস খাঁ শেরপুর আক্রমণ করেন। গড়জরিপায় তখন দলিপ সামন্ত নামক কোচ রাজা রাজত্ব করতেন। যুদ্ধে দলিপ পরাজিত ও নিহত হন। এরপর থেকেই ময়মনসিংহ অঞ্চলে মুসলিম শাসনের শুভ সূচনা হয়।
১৪৯০ সালে হাবসী সিদি বদর শামসুদ্দিন আবু নসর মুজাফফর শাহ উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে আরোহন করেন। ১৪৯৩ সালে কারারুদ্ধ অবস্থায় সিদি বদরের মৃত্যু হলে আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ১৪৯৩ সালে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন।

Shamol Bangla Ads

গড়জরিপার শিলালিপি: শিলালিপি ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। মজলিস খাঁ হুমায়ুনের মৃত্যু হলে দূর্গের ভেতর তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। সমাধিগাত্রে আরবি ভাষায় শিলালিপি পাওয়া যায়। ১৮৭৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি কলকাতা থেকে শিলালিপিটির ইংরেজি অনুবাদ করা হয়:

“In the name of God, the merciful, the element! There is no God but Allah,
Mahammed is Allah’s prophet ** there is no God but Allah** Mahammad is Allah’s prophet **
God bless Mahammed the pure Hussan Hossain ** built ** king of the age and period of Saifudduya uddin Abdul Mazaffar Foroz Shah the king, may God perpetuate his Kingdom and his rule. This (vault?) was completed is blessed Ramjan 8**

শেরপুরের বিদ্যোৎসাহী জমিদার হরচন্দ্র চৌধুরী ১৮৭১ সালে শিলালিপিটি এশিয়াটিক সোসাইটি কলকাতায় প্রেরণ করেন। ১৯৭৪ সালে অধ্যাপক ব্ল্যাকম্যান আরবি ভাষায় লেখা শিলালিপিটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। যার ভাবানুবাদ নিম্নরূপ: পরম করুণাময় আল্লাহর নামে। আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই। মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর পয়গম্বর। হে আল্লাহ মুহাম্মদ (সা.), হযরত আলী (রা.), হযরত হাসান এবং হযরত হোসেনকে রহম কর।
নির্মাণকাল: সাইফদ্দিন আবদুল মোজাফফর ফিরোজ শাহ তাঁর সময়কাল এবং সাম্রাজ্যকে চিরস্থায়ী করেন। রমজান মাসের ৮ তারিখে নির্মিত।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও গড়জরিপার বিভিন্ন স্থাপনা
জরিপ শাহের মাজার: কিংবদন্তি আছে, সেনানায়ক হুমায়ুন শাহ গড়জরিপায় প্রবেশ করে দেখতে পান যে জরিপ শাহ নামের এক দরবেশ শরীরের অর্ধাংশ মাটিতে পুতে অবস্থান করছেন। তাঁকে স্থান ত্যাগ করতে বলা হলে তিনি কিছুতেই স্থান ত্যাগ করতে রাজী নন। শর্ত প্রদান করেন যে, যদি তার নামে গড় নির্মাণ করা হয় তবে তিনি স্থান ত্যাগ করতে পারেন। হুমায়ুন শাহ তাঁর নাম অনুসারে ‘গড়জরিপা’ নামকরণ করেন।
জরিপ শাহের মৃত্যুর পর কালীদহ সাগরের পূর্ব তীরে ১৯০ ফুট দৈর্ঘ এবং ৬৫ ফুট প্রস্থ এক খণ্ড জমির উপর তাঁকে কবরস্থ করা হয়, যা জরিপ শাহ মাজার নামে পরিচিত।

হুমায়ুন খাঁ মজলিস রাজধানী সুরক্ষার জন্য প্রায় ১১০০ একর জমির উপর দুর্গ বা গড় নির্মাণ করেন। মাটির জাঙ্গাল দিয়ে দুর্গ প্রাচীর নির্মিত হয়। জমির পরিমাণ দৈর্ঘ-প্রস্থে ১৫ মাইল। দুর্গটি সাতটি প্রাচীর দ্বারা বৃত্তাকারে পরিবেষ্টিত। প্রাচীরগুলো ছয়টি পরিখা দ্বারা পৃথককৃত। পরিখাগুলো আনুমানিক ৯০ ফুট প্রশস্ত এবং ৪০ ফুট উঁচু। বর্তমানে একটি পরিখা রয়েছে, যা কালিদহ সাগর নামে পরিচিত।
কিংবদন্তি আছে, কোনো বিবাহ অনুষ্ঠান বা কোনো বড় আয়োজনে হাঁড়ি, পাতিল, ডেগ দরকার হলে কালিদহ সাগরে চাওয়া হতো এবং এগুলো ভেসে আসতো। রান্না করে শিরনি খাওয়ানো শেষে আবার ডেগ পাতিল কালিদহ সাগরে ফেরত দেওয়া হতো।
পরিখার দুই পাড়ে দুটি মাটির জাঙ্গাল এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুর্গ প্রাচীরের চারদিকে ৪টি তোরণ ছিল। পূর্বপাশের তোরণকে বলা হতো কুমুদুয়ারী; পশ্চিম পাশের তোরণকে বলা হতো পানিদুয়ারী; দক্ষিণ পাশের তোরণকে বলা হতো শ্যামুদুয়ারী; উত্তর পাশের তোরণকে বলা হতো খিরকিদুয়ারী।
দক্ষিণ তোরণ সংলগ্ন পূর্ব পার্শ্বে ছিল উচ্চ টাওয়ার। দুর্গের মধ্যে অনেকগুলো পাথর ছিল। দুর্গ প্রাচীরের ভেতরে পানিদুয়ারীর কাছেই হুমায়ুন শাহের কবর অবস্থিত। কবরের দুইটি পাথরের ফলক পাওয়া যায়। তার মধ্যে একটি পাথর ভেঙে দুই খণ্ড হয়ে গেছে।

কাদির পীর দরগাহ:
গরজরিপার ঘোনাপাড়ায় একটি দরগাহ রয়েছে, যা কাদির পীরের দরগাহ নামে পরিচিত। দরগাহ থেকে প্রাচীন মসজিদ ছিল যার ধ্বংসাবশেষ এখনো বিদ্যমান। দরগার কাছে ৩টি পুকুর ছিল। পুকুর ৩টির নাম: রাজা মায়ের পুকুর, সাহেবের পুকুর, আলম পুকুর। পুকুরের পশ্চিম পার্শ্বে একটি পাথর এবং টিলা প্রাচীন স্মৃতি লালন করছে। পীর সাহেবের কবরের কাছে দাখিল মাদ্রসা ঘর উত্তোলন করা হয়েছে। অসচেতনতার কারণে কবরটি হারিয়ে গেছে।

কালিদহ সাগর:
গড়জরিপা গ্রামে এখনো শোভা বর্ধন করছে বর্গাকার কালিদহ সাগর। এর দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে দুটি উঁচু জাঙ্গাল। সাগরে এখনো চাষ হয় শাপলা, শালুক। তাছাড়া পাল তোলা নৌকায় চলে মাছ শিকার। ভ্রমণপিপাসু বহু মানুষ এখনো এখানে বেড়াতে আসে। এখানে প্রতিবছর দুই-তিন দিনব্যাপী মেলা বা উৎসব হয়। যার নাম বরমীস্নান এবং অষ্টমী মেলা।
ডিঙ্গি: কালিদহ সাগরের দক্ষিণ পশ্চিমাংশে একটি লম্বা উঁচু স্থান আছে যার দৈর্ঘ প্রায় ২০০ ফুট, প্রস্থ ১৮ ফুট থেকে ৯ ফুট বা ৫ ফুট। সবাই বলে এটি চাঁদ সওদাগরের ডিঙ্গি। জায়গাটি উঁচু এবং দেখতে ডিঙ্গির মতো। যদিও মনসামঙ্গল কাব্যের চাঁদ সওদাগরের ডিঙ্গি বগুড়ায় অবস্থিত।
ডিঙ্গির অনেক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কালিদহ সাগরে যতই পানি বৃদ্ধি হোক না কেন ডিঙ্গি কখনো ডোবে না। জনৈক সৈয়দুর রহমান কোদাল দিয়ে ডিঙ্গির একাংশ কেটে ফেলার চেষ্টা করলে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডিঙ্গির পাশে যে ছাদের গুড়ি আছে, তা কেউ উঠাতে পারেন না। গুড়িটি কেউ উঠাতে গেলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
কোদালঝাড়া পাহাড়: গড়জরিপার দুর্গের কাছে কালীগলু ও মোবারকপুর গ্রামের মাঝে আখেরী বাজারের কাছে একটি অনুচ্চ টিলা (পাহাড়) আছে। এটি কোদালঝাড়া পাহাড় নামে খ্যাত। দু’ধরনের জনশ্রুতি আছে এ টিলা নিয়ে।
প্রথম ধারণা হচ্ছে কালিদহ সাগর ও অন্যান্য পরিখা খনন করে শ্রমিকরা বিশ্রাম নিতো এখানে। সে সময় কোদাল পরিষ্কার করতো। কোদাল ঝাড়ার মাটি জমে টিলা সৃষ্টি হয়।
অন্য ধারণাটি হলো ১৮০৭ সালে কালিগঞ্জে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এবং সেনানিবাস স্থাপন করা হয়। প্রধাণত ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ দমন করার জন্য। সৈনিকদের প্রশিক্ষণের জন্য পুকুর কেটে এটি সৃষ্টি করা হয়।

বারোদুয়ারী শাহী মসজিদ:
বারোদুয়ারী শাহী মসজিদটি অনুমান করা হয় মজলিস খাঁ হুমায়ুনের সময় নির্মিত। গড়জরিপার একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। কিন্তু কালের প্রবাহে মসজিদটি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। জামালপুরের মাওলানা আজিজুল হক ১৯৬১ সালে মসজিদটির সন্ধানে প্রচেষ্টা চালিয়ে ১৯৬৩ সালে মসজিদটির সন্ধান পান। মসজিদটির উপর বিশাল বড় বট গাছ ছিল। আশেপাশে ঘন জঙ্গল। প্রচণ্ড ঝড়ে এক সময় বট গাছটি উপড়ে পড়লে মসজিদের এক কোণ দৃষ্টিগোচর হয়। আজিজুল হকের নেতৃত্বে মাটি খনন করে মসজিদটির ভাঙা দেওয়াল দেখতে পাওয়া যায়। দেওয়ালে বিভিন্ন নকশা খচিত। দরজা চিহ্নিত করে গণনা করা হলে দেখা যায় বারোটি দরজা। প্রকৌশলীদের পরামর্শে পুরোনো ভিত্তি ও দরজার অবস্থান এবং কাঠামো ঠিক রেখে নতুন দেওয়াল ও ছাউনির কাজ সম্পন্ন করা হয়। পাঞ্জেগানা নামাজ শুরু করা হয়। ১৯৬৪ সালে মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। মসজিদটির দৈর্ঘ প্রায় ১০০ ফুট, প্রস্থতায় ৪০ ফুট। একটি একতলা মসজিদ। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের সামনে ৯টি দরজা, দক্ষিণ পার্শ্বে ২টি দরজা, উত্তর পার্শ্বে ১টি দরজাসহ মোট ১২টি দরজা।

লেখক : চেয়ারম্যান, সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এসডিএফ) ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব।

তথ্যসূত্র:
১. ময়মনসিংহের ইতিহাস: দেজ পাবলিশিং, কলকাতা-০০০৩
২. ময়মনসিংহের বিবরণ: শ্রী কেদারনাথ মজুমদার
৩. ময়মনসিংহের সাহিত্য ও সংস্কৃতি: ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ
৪. শেরপুর জেলার অতীত ও বর্তমান: আলহাজ্ব পণ্ডিত ফছিহুর রহমান
৫. ইতিহাস ও ঐতিহ্যে গড়জরিপা: প্রকৌশলী এম. আহসান আলী ও মো. আকরাম আলী
৬. শেরপুরের ইতিকথা: অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন

সর্বশেষ - ব্রেকিং নিউজ

error: কপি হবে না!