• সোমবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২২, ০৪:২৬ অপরাহ্ন
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত নিউজপোর্টাল

খ্রিস্টীয় নববর্ষের ইতিকথা

প্রকাশকাল : শনিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২২

পুরাতন বছরের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, জরা-জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে আবারও আমাদের মাঝে চলে এলো আরও একটি নতুন বছর। পুরাতনকে ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে নতুনকে স্বাগত জানানোর যে রীতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে তা-ই নববর্ষ হিসেবে পরিচিত। বর্তমান সময়ে অতিমারী করোনা ভাইরাসের প্রকোপ অনেকটা কমে যাওয়ায় এবার সারা বিশ্ব সাড়ম্বরে বরণ করে নিতে চলেছে নতুন বছর ২০২২ খ্রিস্টাব্দকে।

Shamol Bangla Ads

বাংলাদেশে সুদীর্ঘকাল থেকে তিনটি দিনগণনা বর্ষের প্রচলন রয়েছে, আর তা হলো- ইংরেজি, বাংলা ও হিজরি বর্ষ। আবার এসব বর্ষ প্রচলনের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, মানুষ প্রথমদিকে চাঁদের হিসেবেই নতুন বর্ষ গণনা শুরু করে। চাঁদের হিসেবে ১০ মাসে বছর হতো। সেখানে ঋতুর সাথে কোনও সম্পর্ক ছিল না। সূর্যের হিসাবে বা সৌর গণনার হিসাব আসে অনেক পরে। সৌর এবং চন্দ্র গণনায় আবার পার্থক্য রয়েছে। সৌর গণনায় ঋতুর সঙ্গে সম্পর্ক থাকে।

Shamol Bangla Ads

আমরা দৈনন্দিন জীবনে যে ইংরেজি সাল বা খ্রিস্টাব্দ অনুসরণ করি প্রকৃতঅর্থে তা হলো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। আর এই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মূলতঃ সৌর বছর। আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ও জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে জানুয়ারির ০১ তারিখ থেকে শুরু হয় নতুন বছর। তবে ইংরেজি নতুন বছর উদযাপনের ধারণাটি আসে প্রায় ৪০০০ বছর আগে অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে। তখন মেসোপটেমিয় (ইরাক) সভ্যতার জনগণ প্রথম নতুন বছর উদযাপন শুরু করে। মেসোপটেমিয়ান সভ্যতার আবার চারটি ভাগে বিভক্ত। যেমন- সুমেরীয় সভ্যতা, ব্যাবিলনীয় সভ্যতা, অ্যাসিরীয় সভ্যতা ও ক্যালডীয় সভ্যতা। এদের মধ্যে বর্ষবরণ উৎসব পালন করা শুরু হয় ব্যাবিলনীয় সভ্যতায়। সে সময় বেশ জাঁকজমকের সঙ্গেই পালন করা হতো এই বর্ষবরণ। তবে সেটা কিন্তু এখনকার মতো জানুয়ারির ১ তারিখে পালন করা হতো না। তখন নববর্ষ পালন করা হতো বসন্তের প্রথম দিনে। বসন্তকালে প্রকৃতির নতুন করে জেগে ওঠাকেই তারা নতুন বছরের শুরু বলে চিহ্নিত করেছিল। তখন তারা চাঁদ দেখেই বছর গণনা করতো। যেদিন বসন্তের প্রথম চাঁদ উঠত, শুরু হতো তাদের বর্ষবরণ উৎসব, চলতো টানা ১১ দিন। এই ১১ দিনের আবার আলাদা আলাদা তাৎপর্যও ছিল। ব্যাবিলনীয় সভ্যতার পর জাঁকজমক করে নববর্ষ পালন করা শুরু করে রোমানরা। প্রাচীন রোমের প্রথম সম্রাট রোমুলাসই ৭৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান ক্যালেন্ডার চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। আর সেই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ ছিল ১ মার্চ। সেই ক্যালেন্ডারে মাস ছিল মাত্র ১০টি। তাছাড়া তাদের ক্যালেন্ডারে তারিখও ছিল না। পরে সম্রাট নুমা পন্টিলাস জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারিকে ক্যালেন্ডারে যোগ করেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যে নতুন বছর পালনের প্রচলন শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৩ অব্দে। পরবর্তিতে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সম্রাট জুলিয়াস সিজার একটি নতুন বর্ষপঞ্জিকার প্রচলন করেন। যা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। সেই ক্যালেন্ডারে তিনি তারিখ সংযোজন করেন এবং ৩৬৫ দিনে বছর নির্ধারণ করেন। সম্রাট জুলিয়াস সিজার লিপইয়ার বছরেরও প্রচলন করেন। জুলিয়াস সিজার আলেকজান্দ্রিয়া থেকে গ্রিক জ্যোতির্বিদ মোসাজিনিসকে নিয়ে আসেন ক্যালেন্ডার সংস্কারের জন্য। মোসাজিনিস দেখতে পান পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টা। তার মতে, ৩৬৫ দিনে বছর হিসাব করা হলে এবং প্রতি চতুর্থ বছরে ৩৬৬ দিনে বছর হিসাব করলে হিসাবের কোনো গড়মিল হয় না। আর তাই মোসাজিনিস অতিরিক্ত একদিন যুক্ত করে এ বছরটির নাম করেন ‘লিপইয়ার’।

যেহেতু প্রাচীন রোমানদের হাতেই এই ক্যালেন্ডারের সৃষ্টি আর তাই খ্রিস্টীয় বছরের বারোটি মাসের বেশিরভাগই নামকরণ করা হয়েছে রোমান দেবতা বা সম্রাটের নামানুসারে। যেমন- জানুয়ারি হলো দেবতা জানুস এর নামানুসারে। জানুস হলেন প্রবেশপথ বা সূচনার দেবতা। ফেব্রুয়ারি- ল্যাটিন শব্দ ফেবরুয়া থেকে নেয়া হয়েছে, যার অর্থ পবিত্র। মার্চ- রোমানদের যুদ্ধ দেবতা মার্সের নামানুসারে, এপ্রিল- ল্যাটিন শব্দ এপ্রিলিস এর নামানুসারে, যার অর্থ খোলা। মে- বসন্তের দেবী মায়া’স নামানুসারে, জুন- বিবাহ এবং নারী কল্যাণের দেবী জুনো’র নামানুসারে, জুলাই- রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার এর নামানুসারে, সেপ্টেম্বর- ল্যাটিন সপ্তম সংখ্যা সেপ্টেম এর নামানুসারে, নভেম্বর- ল্যাটিন নবম সংখ্যা নভেম এর নামানুসারে এবং ডিসেম্বর- ল্যাটিন দশম সংখ্যা ডিসেম এর নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে।

খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে নির্ধারণ করা হয়েছিল নববর্ষ হিসেবে পালন করা হবে ২৬ মার্চ তারিখটি। কিন্তু সেটা সঠিকভাবে প্রতিপালন করা হচ্ছিল না। পরে সম্রাট নুমা পল্টিলাস যখন জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারিকে ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভূক্ত করেন, তবে নির্ধারণ করে দেন জানুয়ারির ১ তারিখ হলো বছরের প্রথম দিন; ওইদিনই হবে বর্ষবরণ।

মধ্যযুগে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে যখন জুলীয় বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করা হত, বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয়র উপর নির্ভর করে বিভিন্ন সময়ে নববর্ষ গণনা করা হত; যেমন ১ মার্চ, ২৫ মার্চ, ১ সেপ্টেম্বর, ২৫ ডিসেম্বর। পরবর্তীতে যিশুখ্রিষ্টের জন্মের পর তার জন্মের বছর গণনা করে ১৫৮২ সালে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণের পরামর্শ নিয়ে এই ক্যালেন্ডারের নতুন সংস্কার করেন এবং গ্রেগরিয় বর্ষপঞ্জী চালু করেন। তারই নামানুসারে যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিতি লাভ করে। যার ফলে পুরাতন পদ্ধতি ও নতুন পদ্ধতির তারিখগুলোতে যথেষ্ট পরিবর্তন সাধিত হয় যার ফলে নতুন বছরের জন্য বিভিন্ন স্থানীয় তারিখের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট তারিখ (১ জানুয়ারি) প্রবর্তিত হয়। এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখ লেখার শেষে যে এ.ডি লেখা হয় তা ল্যাটিন শব্দ অ্যানো ডোমিনি এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এই আ্যানো ডোমিনির অর্থ আমাদের প্রভুর বছর। ডাইওনিসিয়াম একমিগুয়াস নামক এক খ্রিস্টান পাদ্রী জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ৫৩২ অব্দে যিশুখ্রিস্টের জন্মবছর থেকে হিসাব করে এই খ্রিস্টাব্দ লিখনরীতি চালু করেন। বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই কার্যত দিনপঞ্জি হিসেবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়।

ঐতিহাসিক সূত্র মতে, আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন বছর পালন শুরু হয় ১৯ শতক থেকে। নতুন বছরের আগের দিন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর হচ্ছে নিউ ইয়ার ইভ। এদিন নতুন বছরের আগমনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ। বিভিন্ন দেশে নতুন বছরের প্রথম দিনটি পাবলিক হলিডে। প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা ১মিনিট থেকেই শুরু হয় নতুন বছর উদযাপনের উন্মাদনা। আকাশে ছড়িয়ে পড়ে আতশবাজির আলোকচ্ছটা। বিশ্বব্যাপী ‘নিউ ইয়ার ডে’ সর্বজনীন একটি উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে।

রীতি অনুযায়ী জানুয়ারির ১ তারিখে বাংলাদেশে নিউ ইয়ার উদযাপন করা হয়। ৩১ ডিসেম্বর দিন পেরিয়ে শুন্য ঘণ্টা থেকে শুরু হয় উৎসব। রাতের এ উৎসবকে বলা হয় ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’। রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরে এ উৎসবের জনপ্রিয়তা লক্ষণীয় হলেও গ্রামাঞ্চলে এ উৎসব উদযাপনের রেওয়াজ এখনও তেমন চালু হয়নি।

জানুয়ারির ১ তারিখে নববর্ষ উদযাপন করার রীতিটি এসেছে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার হতে যেখানে বছরের শুরু হয় জানুয়ারি মাসের ১ তারিখে। বিশ্বের যে সকল দেশ এই ক্যালেন্ডারকে সিভিল ক্যালেন্ডার হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারা সবাই ইংরেজি নববর্ষ পালন করে থাকে। তবে অনেক দেশই ক্যালেন্ডারটি গ্রহণ করার পূর্বে নববর্ষের রীতিটি গ্রহণ করেছে। যেমন, ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে স্কটল্যান্ড এবং ১৭৫২ সাল থেকে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এবং ব্রিটিশ কলোনিগুলো নববর্ষের রীতি অনুসরণ করতে শুরু করে। কিন্তু তারা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে পরিচিত হয় ঐ বছরের সেপ্টেম্বরে।

আধুনিক বিশ্বে নববর্ষ হিসেবে ১লা জানুয়ারিকে প্রচলিত করার ব্যাপারে ‘রিপাবলিক অব ভেনিস (বর্তমানে বিলুপ্ত) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ তারা ১৫২২ সাল হতে এ দিনকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে গণনা করতে শুরু করে। এরপর ১৫৫৬ সালে স্পেন, পর্তুগাল; ১৫৫৯ থেকে প্রুশিয়া, সুইডেন; ১৫৬৪ সালে ফ্রান্স; ১৭০০ সাল হতে রাশিয়া এই রীতি অনুসরণ শুরু করে।

অন্যদিকে ইংরেজি নতুনবর্ষ পালনে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন- ইসরায়েল। দেশটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে। তবে ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না। কারণ, সে দেশে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী এই রীতি পালনের বিরোধিতা করে থাকে। আবার মুষ্টিমেয় কয়েকটি দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে গ্রহণই করেনি। যেমন- সৌদি আরব, ইরান, আফগানিস্তান, ইথিওপিয়া ও নেপাল। এসব দেশও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না।

পরিশেষে নতুন বছরে কামনা একটাই, সহসাই যেন করোনা অতিমারি থেকে বিশ্ববাসী মুক্তি পায়। তারসাথে প্রত্যাশা রইলো নতুন বছর সবার জীবনে কল্যাণ বয়ে আনুক। শুভ নববর্ষ ২০২২ খ্রি.।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সহ. অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।

Shamol Bangla Ads

এই বিভাগের আরও খবর
Shamol Bangla Ads

error: কপি হবে না!
error: কপি হবে না!