• সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১, ০৭:৩৮ অপরাহ্ন
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত নিউজপোর্টাল
শিরোনাম :
ঝিনাইগাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত শেরপুর সদরে ১৩ ইউপির ৯টিতেই আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নকলায় ১৫ হাজার মিটার নিষিদ্ধ মাছ ধরার জাল জব্দ, ব্যবসায়ীকে জরিমানা ঝিনাইগাতী উপজেলা বিএনপির ৩১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন সালাহর হ্যাটট্রিকে ম্যানইউকে উড়িয়ে দিল লিভারপুল রিজভী-দুলুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা শেরপুরে রোটারি ক্লাবের উদ্যোগে বিশ্ব পোলিও দিবস পালিত ক্যাচ মিসেই বাংলাদেশের হতাশার হার গফরগাওয়ে নকল ইলেট্রনিক সামগ্রী বিক্রির অভিযোগে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা এবার পা দিয়ে লিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা দিলেন শেরপুরের ছুরাইয়া

আখেরি চাহার শোম্বা উদযাপন প্রাসঙ্গিকতা

প্রকাশকাল : বুধবার, ৬ অক্টোবর, ২০২১

পারস্যসহ পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানগণ কর্তৃক পালিত অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি স্মারক দিবস ‘আখেরি চাহার শোম্বা’। আরবি-ফারসি শব্দ-যুগলের সমষ্টি ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ এর আরবি অংশ আখেরি শব্দের অর্থ শেষ এবং ফারসি অংশ চাহার শোম্বা এর অর্থ হলো বুধবার। হিজরি বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় মাস সফরের শেষ বুধবারকে ইসলামি পরিভাষায় মুসলিম সমাজে ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে এবং এ দিনটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পালন করে থাকে।

Shamol Bangla Ads

‘আর রাহিকুল মাখতুম’ সিরাত গ্রন্থের ভাষ্য মতে, মহানবি (সা.)-এর জীবদ্দশায় তৎকালীন ইয়াহুদি চক্রান্তকারীরা নানা প্রকার যাদু-টোনা করেও প্রিয় নবির উপর কোনো প্রকার প্রভাব বিস্তার করতে না পেরে অবশেষে ৭ম হিজরীতে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর মুহাররম মাসে মদীনার ইয়াহুদি নেতৃবৃন্দ বিশিষ্ট যাদুকর লবিদ ইবনে আসমের শরণাপন্ন হয়। চতুর লবিদ কৌশলে মহানবি(সা.)-এর এক ইয়াহুদি গোলামের মাধ্যমে নবি (সা.)-এর ব্যবহৃত চিরুনীর ভাঙ্গা দাঁত ও চুল মোবারক সংগ্রহ করে তার সাথে সুঁচসহ যাদু-টোনা করার আরও আনুষাঙ্গিক দ্রব্যাদি একত্রিত করে একটি ছোট্ট মানব মূর্তির ভেতরে স্থাপন করে প্রবাহমান কূপের পানির ভিতর একটা পাথর চাপা দিয়ে রেখে দেয়। এরই প্রেক্ষিতে এই তন্ত্রমন্ত্র-যাদুর প্রভাবে নবি (সা.) সে সময় অসুস্থতাবোধ করছিলেন এবং ক্রমান্বয়ে শারীরিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছিলেন।

এহেন অবস্থায় মহান আল্লাহ্ হজরত জিব্রাইল (আ.) এর মাধ্যমে সূরা ফালাক্ব ও সূরা নাস এ দুটি সূরা প্রিয় নবির উপর অবতীর্ণ করলেন এবং মহান আল্লাহ্ রাসূল (সা.)কে ওহীর মাধ্যমে এই যাদুর বিষয়ে সতর্ক সংবাদ প্রদান করলেন। অতঃপর নবি (সা.) হজরত আলী (রা.)কে জিব্রাইল আমিনের দেয়া তথ্যানুযায়ী উক্ত কূপের সন্ধানে পাঠালেন। সে মতে আলী (রা.) কূপ খোঁজে বের করে তার ভেতরকার পানি সেচে যাদুর সব সামগ্রী পাথরের নীচ থেকে বের করে নিয়ে আসলেন। তারপর নবী (সা.) উদ্ধারকৃত ঐসব যাদু সামগ্রীতে সদ্য নাযিলকৃত সূরা দুটো পাঠ করে ফুঁক দিলেন। এর অব্যবহিত পড়েই নবি (সা.) শারীরিক সুস্থতা অনুভব করলেন এবং সাত কূপের সাত মশক পানি ব্যবহার করে গোসল করলেন। কোনো কোনো উলামায়ে কিরামদের মতে সেই দিনটি ছিল সফর মাসের শেষ বুধবার।

Shamol Bangla Ads

প্রখ্যাত সিরাতকার ইবনে ইসহাক তার ‘সিরাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, সফর মাসের শেষ কী রবিউল আউয়াল মাসের শুরুতে নবি (সা.)এর সম্ভাব্য মৃত্যু অসুখের লক্ষণ দেখা দেয়। যেহেতু প্রত্যেক নবি-রাসূলগণকেই মহান আল্লাহ্ জিব্রাইল আমিনের মাধ্যমে তাঁদের মৃত্যুর আগাম সংবাদ অবহিত করান। সেহেতু ওই সময়ে এক মধ্যরাতে তিনি গিয়েছিলেন বাকিউল গারকাদের কবরস্থানে। সেখানে মুত ব্যক্তিদের জন্য তিনি মোনাজাত করেন। ভোরে ঘরে ফিরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। নবি (সা.)-এর ওই অসুখ যে তার মৃত্যুযাত্রার সূচনা, তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর আযাদকৃত গোলাম আবু সওয়া হিবার কথোপকথন থেকে বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায়। নবি (সা.) যখন নিশুতিকালে বাকিউল গারকাদের গোরস্থানে যান, তখন গোলাম হিবাও সেখানে গিয়েছিলেন। হিবা বলেন, নবি (সা.) আমাকে দেখে বললেন, আমাকে দুটো বিকল্পের একটি পছন্দ করতে বলা হয়েছে- ‘দুনিয়ার দীর্ঘ জীবন, ধন-সম্পদ, ভোগবিলাস অথবা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আল্লাহর দিদার লাভ, তাৎক্ষণিক বেহেশতের স্বাদগ্রহণ।’ হিবা বলেন, আমি বললাম, আপনি কি প্রথমটি পছন্দ করেন? তিনি বললেন, ‘আমি দ্বিতীয়টি পছন্দ করেছি। অর্থাৎ নবি (সা.) মৃত্যুকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে আল্লাহর দিদার লাভকে বেছে নিয়েছেন। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে ওই অসুখে তার প্রাণসংহার ঘটবে, তা তাঁর অজানা ছিল না।

তবে প্রখ্যাত সিরাতকার ইবনে হিশাম তার ‘সিরাতুন নবি (সা.)’ গ্রন্থে বলেন, ৬৩২ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১১ হিজরির শুরুর দিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) গুরুতর শিরপীড়ায় আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে তিনি প্রচণ্ড মাথাব্যথা অনুভব করেন। ক্রমেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে, নামাজের ইমামতি পর্যন্ত করতে পারছিলেন না। তাঁর অন্তিম যাত্রার অধিকাংশ সময় অজ্ঞান ছিলেন এবং কোনো কোনো সময় একটু সুস্থ হলেও আবার জ্ঞান হারাতেন। সুদূর আবিসিনিয়া থেকে নিয়ে আসা ঔষধ খাওয়ানো হলেও অবস্থার তেমন কোনোও পরিবর্তন হয়নি। এ অবস্থায় নবি (সা.)-এর পরিবারের সদস্যগণ ও সাহাবিরা তাঁর বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দেন। ওই নিরাশার মধ্যেই একদিন নবি (সা.) আশার আলো জ্বালালেন। ২৮ সফর বুধবার প্রত্যুষে নবি করিম (সা.) কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। দিনটি ছিল সফর মাসের শেষ বুধবার।

সেদিন কিছুটা সুস্থবোধ করায় নবি (সা.) গোসল করেন এবং শেষবারের মত নামাজে ইমামতি করেন। নবি কন্যা ফাতিমা (রা.) এবং দুই দৌহিত্র ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনকে (রা.) সঙ্গে নিয়ে দুপরের আহার গ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারের সদস্য ও সাহাবিগণসহ মদীনাবাসী এই খবরে আনন্দ-খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন এবং দলে দলে এসে নবি (সা.)কে একনজর দেখে গেলেন। সকলে তাদের সাধ্যমত দান-সাদকাহ্ করলেন, শুকরিয়া স্বরূপ নফল নামাজ আদায় ও দুআ করলেন। নবি(সা.)-এর রোগমুক্তিতে তার অনুসারীরা এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, তাদের কেউ দাস মুক্ত করে দিলেন, কেউবা অর্থ বা উট দান করলেন। যেমন: হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ৫ হাজার দিরহাম, উমর (রা.) ৭ হাজার দিরহাম, উসমান (রা.) ১০ হাজার দিরহাম, আলী (রা.) ৩ হাজার দিরহাম এবং আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ১০০টি উট দান করেন।

কিন্তু উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনানুযায়ী জানা যায়, সফর মাসের শেষ বুধবার প্রত্যুষে নবি (সা.) হঠাৎ সুস্থ হয়ে ওঠলেও বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই নবি (সা.) আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এর প্রেক্ষিতে অবশেষে তিনি ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে ওফাত লাভ করেন।

পরিশেষে বলা যায় যে, কিছু সুনির্দিষ্ট বিধি-বিধানের আলোকে আখেরি চাহার শোম্বা পালন করা হয়; যদিও ধর্মতত্ত্ববিদগণের মধ্যে এই দিবসটি পালন করা নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। আর পৃথিবীর সব অঞ্চলের মুসলমানগণ যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে দিনটি পালন না করায় অনেকে এই দিনটি পালনের তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দিবসটি মূলতঃ শুকরিয়া দিবস হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানগণ পালন করে থাকেন এবং এদিন সাধারণতঃ সকাল সকাল গোসল করে দু’রাকাত শুকরানা নফল নামাজ আদায় শেষে রোগ থেকে মুক্তির দুআ ও দান-খয়রাত করে থাকেন; যা কোনো দোষণীয় নয়। তবে এসব আমল সফর মাসের জন্য বিশেষ বা বাধ্যতামূলক কোনো আমল নয় এবং কুরআন-হাদিসের স্পষ্ট দলীল দ্বারাও প্রমাণিত নয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।


এই বিভাগের আরও খবর
Shamol Bangla Ads

error: কপি হবে না!
error: কপি হবে না!