• শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৫০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
দেশের কৃষি এখন বাণিজ্যিকরণের দিকে যাচ্ছে : শেরপুরে খামারবাড়ির মহাপরিচালক আশ্রয়ণের ঘরের দরজা-জানালায় হাতুড়ি-শাবলের চিহ্ন পেয়েছি : প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ট্রেন থেকে মিসাইল ছুড়ে পরীক্ষা চালালো উত্তর কোরিয়া শ্রীবরদীতে পাগলা কুকুরের কামড়ে আহত ১৫ আমার সমর্থকরা শ্রেষ্ঠ সমর্থক : সাকিব আল হাসান আট জেলায় শনাক্তের হার ৫% এর নিচে: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১১ সাংবাদিক নেতার ব্যাংক হিসাব তলবে উদ্বেগের কিছু নেই : তথ্যমন্ত্রী দেশে করোনায় আরও ৫১ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ১ হাজার ৮৬২ ইভ্যালির সিইও রাসেল ও চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন গ্রেফতার

নজরুল সাহিত্যে ইসলামি ভাবধারা

প্রকাশকাল : শনিবার, ২৮ আগস্ট, ২০২১

   জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন বিরল প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব। তিনি তার ৭৭ বছরের দীর্ঘজীবনে (দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত) মাত্র ২৩ বছর সৃষ্টিশীল থেকে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দু’হাতে লিখে অমর হয়ে আছেন। তিনিই প্রথম ক্ষণজন্মা পুরুষ যিনি বাংলা সাহিত্যে এক নবরীতির প্রচলন করেন। তার রচনায় ফারসি, আরবি, উর্দু, ইংরেজি, তুর্কিসহ বিভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ উৎকলন করে বাংলা সাহিত্যে সংযোজন করেছেন এক নতুন দিগন্ত।
    তিনি জন্মসূত্রে একজন উদারপন্থী ও অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারের উত্তরাধিকার। তৎকালে চুরুলিয়ার কাজী পরিবার ছিল ইসলাম শিক্ষার জন্য একটি আদর্শ পরিবার। তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন একজন সূফি প্রকৃতির লোক। তিনি চুরুলিয়ার একটি মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় একটি মক্তবের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর পিতার মৃত্যুর পর ১৩১৬ বঙ্গাব্দে মাত্র ১০ বছর বয়সে সেই মসজিদের ইমামতি ও খেদমতদার এবং মক্তবের শিক্ষকতার দায়িত্ব অর্পিত হয় কবির উপর। মূলতঃ গ্রামের মক্তব থেকেই হাদিস-কুরআন, ইসলামি মূল্যবোধ ও ইসলামি তাহ্যিব-তামুদ্দুনের সাথে তার পরিচয় ঘটে এবং তখন থেকেই ইসলামের প্রতি তাঁর ভালো লাগা শুরু হয়। বাল্যকালের সেই ইসলামি কৃষ্টি-কালচারের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তার সাহিত্যকর্মে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
  কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’র প্রায় অর্ধেক কবিতাই হলো ইসলামি ভাবধারায় উজ্জ্বীবিত। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- খেয়াপাড়ের তরণী, মোহররম, আবির্ভাব, শাত-ইল-আরব, রণভেরী, আনোয়ার, কোরবানী, তিরোভাব, কামালপাশা প্রভৃতি ইসলামি কবিতা। এছাড়াও জিঞ্জির, সুবহে সাদেক, ঈদ মোবারক, আমানুল্লাহ্, আয় বেহেশতে কে যাবি আয়, চিরঞ্জীব জগলুল, বিষের বাঁশি, ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম প্রভৃতি কবিতায় ইসলামি জাগরণ, ইসলামি ঐতিহ্য ও ইসলামি ভাব-গাম্ভীর্যতাকে আরো প্রোজ্জ্বল করেছে।
  কবি কাজী নজরুল ইসলাম বরাবরই ইসলামি ভাবাপন্ন, ইসলামি চিন্তা-চেতনায় উজ্জ্বীবিত ও পুরোদস্তুর মানবতাবাদী একজন সাহিত্য সাধক ছিলেন; তবে ধর্মীয় গোঁড়ামী তার একদমই পছন্দের ছিল না। ইসলামি ভাবধারায় উজ্জ্বীবিত হয়ে তিনি প্রচুর কবিতা, হামদ-না’ত, ভক্তিমূলক সঙ্গীত, গজল, ইসলামি সঙ্গীত, কাওয়ালী ইত্যাদি রচনা করেন। নজরুলের ইসলামি কবিতার মূলে ছিল খোদাপ্রেম ও রাসূলপ্রেম। যেমন তিনি মহান আল্লাহর শানে লিখেছেন, ওরে কোকিল কে তোরে দিল এ সুর/ কোথা পেলি পাপিয়া এ কণ্ঠ মধুর?/ কহে কোকিল ও পাপিয়া ‘আল্লাহ গফুর’।/ তাঁর নাম গাহি ‘পিউ পিউ কুহুকুহু, আল্লাহু আল্লাহু’। তেমনিভাবে রাসূলের শানে তিনি লিখেছেন, ‘আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ/ সে পথ ধরে চলে যেতেন নূরনবি হযরত’ অথবা ‘মোহাম্মদ নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে/ তাই কিরে তোর কণ্ঠের গান এমন মধুর লাগে’।
   দুই বাংলায় তিনিই প্রথম ইসলামি সঙ্গীতের প্রসার ঘটান এবং যা পরবর্তীতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এক কথায় ইসলামি সঙ্গীত তথা বাংলা গজল রচনার পথিকৃৎ তিনি। তিনি প্রায় ৩ হাজার গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন। তাঁর রচিত অমর ইসলামি গান ‘ও মন রমযানের ঐ রোযার শেষে এলো খুশির ঈদ’ আজো বাঙালি মুসলমান সমাজে সমানভাবে অনুসঙ্গ। এ গান ছাড়া যেন বাঙালি মুসলমান সমাজে ঈদের পূর্ণতা পায় না। তিনি অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় হামদ-না’তও রচনা করেছেন।
   কবি নজরুল ইসলামের ইসলামি ভাবধারার বঃিপ্রকাশ ঘটে তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কয়েকটি ছত্রে- ‘খোদার আসন আরশ ছেদিয়া/ আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার/ স্বর্গীয় দূত জিব্রাঈলের আগুনের পাখা সাপটি/ আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি/ তাজি বোররাক আর উচ্ছৈঃশ্রবা বাহন আমার/ সপ্ত নরক হাবিয়া দোযখ’।
   মহান আল্লাহর প্রতি কবির ইমানকে আরো জোরালোভাবে প্রকাশ করেছেন তাঁর ‘মোবারকবাদ’ কবিতায়- ‘আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে কভু শির করিয়ো না নীচু/ এক আল্লা ছাড়া কাহারও বান্দা হবে না, বলো’।
   তিনি অপরাপর ধর্মের প্রতি যেমন বিনম্র শ্রদ্ধাবোধ পোষণ করতেন তেমনি নিজেকে ইসলামের একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করতেন না। তাই তো তিনি গেয়ে নির্বিঘ্নে উঠেছেন-‘ধর্মের পথে শহীদ যাহারা আমরা সেই সে জাতি/ সাম্য মৈত্রী এনেছি আমরা বিশ্বে করেছি জ্ঞাতি’।
  তিনি সব সময় নবি-সাহাবিদের সময়কালের মতো মানবতাবাদী ধর্ম ইসলামের জয়-জয়কারের স্বপ্ন দেখতেন। তিনি লিখেছেন তার ‘খালেদ’ নামক কবিতায়-‘খালেদ! খালেদ! ফজর হল যে, আজান দিতেছে কৌম/ ওই শোনো শোনো-‘আস্সালাতু খায়র মিনান্নৌম’।
   কবি পরকালের প্রত্যাশিত বিচারের ভয়ে আর্জি জানান খোদার রাহে। পূর্বের গুণাহ্রাশি ক্ষমা মাগেন প্রভুর দরবারে। যেমন-‘রোজ হাশরে আল্লাহ্ আমার করো না বিচার/ বিচার চাহি না আমি, দয়া চাহে এ গুণাহগার’।
    ইসলামের পুনর্জাগরণ বা মুসলিম ঐতিহ্য নজরুলের কবিতায় ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। ইসলামের মূলধারা থেকে ছিটকে পড়া তৎকালীন মুসলমানদের অধঃপতন দেখে তিনি মুসলমানদের পুনর্জাগরণের জন্য মহান আল্লাহর নিকট আর্জি জানিয়েছেন তাঁর কাব্যে এভাবে-‘তওফিক দাও খোদা ইসলামে/মুসলিম জাঁহা পুণ হোক আবাদ’। কিংবা তিনি অন্যত্র উচ্চারণ করেছেন- ‘বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা/শির উঁচু কর মুসলমান।/ দাওয়াত এসেছে নয়া জামানার/ভাঙা কিল্লায় ওড়ে নিশান।’
    ইসলামি ঐতিহ্য কাজী নজরুল ইসলামকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি আধ্যাত্মবাদ তথা সুফিবাদ দ্বারাও প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। নজরুল তার লেখা হামদে খোদার নিকট নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছেন। তাইতো তিনি কায়মনোবাক্যে আল্লাহর রাহে ক্ষমা ভিক্ষা করেছেন- ‘করিও ক্ষমা হে খোদা আমি গোনাহগার অসহায়।/ ইয়া আল্লাহ্, তোমার দয়া কত, তাই’।
      ইসলাম যে কোনো বর্ণবৈষম্য-শ্রেণিবৈষম্যকে বরদাশ্ত করে না তা তিনি জোরালো ভাষায় ব্যক্ত করেছেন তার এই কবিতায়- ‘কেবল মুসলমানের লাগিয়া আসেনি’ক ইসলাম/ সত্যে যে চায়, আল্লায় মানে, মুসলিম তা’রি নাম’।
  ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত তাঁর আরেক অমর সৃষ্টি ‘কাব্যে আমপারা’। পবিত্র কুরআনের শেষাংশের ছোট সূরাগুলোকে তিনি কাব্যাকারে অনুবাদ করেছে; যা বাংলা সাহিত্যে আরেক নতুন সংযোজন এবং পবিত্র আল কুরআনের প্রতি তার অগাধ সম্মানবোধ। যেমন তিনি সূরা ইখলাছের পদ্যানুবাদ করেন এভাবে- ‘শুরু করলাম পুত নামেতে আল্লার,/ শেষ নাই সীমা নাই যাঁর করুণার’।
   কবি নজরুল নবি মুহাম্মদ (স.)-এর আদর্শে সদা উজ্জ্বীবিত ছিলেন। তাইতো তিনি মহানবিকে ভালোবেসে কাব্যাকারে তাঁর জীবনীগ্রন্থ ‘মরুভাস্কর’ রচনা করেছেন। তিনি এই ধরাধামে নবি (স.)-এর শুভাগমনকে স্বাগত জানিয়ে রচনা করেন ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’, ‘ত্রিভূবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়’, ‘তৌহিদেরই মুর্শিদ আমার মুহাম্মদের নাম’ প্রভৃতি গান।
   পরকালের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের অধিকারী কবি মৃত্যুর বাস্তবতা ও মৃত্যুপরবর্তী জীবনের চিন্তায় বিভোর হয়ে উচ্চারণ করলেন- ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই/ যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই’।
  মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.) এর শাহাদত দিবসকে স্মরণ করে তিনি ‘মহররম’ কবিতায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উচ্চারণ করেছেন ‘নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া/ আম্মা লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া’। তাছাড়া ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা সুশাসক হযরত উমর (রা.)-এর তপ্ত বালুকাময় মরুভূমি পাড়ি দিয়ে ঐতিহাসিক জেরুজালেম নগরীতে গমনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তিনি ‘উমর ফারুক’ কবিতায় লিখেছেন’ আমির-উল-মুমেনিন/ তোমার স¥ৃতি যে আযানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন’।
   পরিশেষে বলা যায় যে, আমাদের প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এক বিষ্ময়কর কাব্য প্রতিভা। তিনি মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি ছিলেন। তার রচনায় সব সময় ফুটে উঠেছে উদারতা, মানবতাবাদ, সত্য ও ন্যায়ের জয়গান।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সহ. অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।


এই বিভাগের আরও খবর
error: কপি হবে না!
error: কপি হবে না!